ফন্ট সাইজ:
থিম:
কাজল্লাতার মেঘ

৯ম পর্ব

লেখক: Rahmatunnesa

কাজললতার মেঘ ☁️

লেখিকা: রহমাতুন্নেছা
পর্ব ৯
বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার ঠিক পাশ ঘেঁষে যে ছোট মফস্বল গ্রামটি রয়েছে, সেখানকার মেঠো পথঘাটগুলো বরাবরই একটু অন্যরকম। এখানকার বাতাসে মাটির সোঁদা গন্ধের সাথে মিশে থাকে চিরচেনা গ্রামীণ এক স্নিগ্ধতা। সেই মেঠো পথ ধরে সেদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় জান্নাতুলের মনে হচ্ছিল পুরো পৃথিবীটাই যেন হঠাৎ করে পাল্টে গেছে। বুকের ভেতরটা তখন অদ্ভুত এক খুশিতে ডুকরে ডুকরে উঠছিল, অথচ বাইরে সে এমন ভাব করে হাঁটছিল যেন কিছুই হয়নি! তার পরনে সেই পরিচিত কালো বোরখা, আর মুখে নেকআপ চোখ দুটো কাজল টানা টানা বের হয়ে রয়েছে, সেই চোখের দিকে তাকালে বোঝা যাচ্ছে জান্নাতুল কতটা নার্ভাস, চোখের চারপাশে বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোঁটা,
বান্ধবীরা তো জান্নাতুলের হাবভাব দেখে শুরু থেকেই ফাজলামো শুরু করে দিয়েছিল। 
রিয়া চোখ টিপে হেসে বলে উঠল, "কিরে জানু! তোর চালচলন তো আজ পুরো বদলে গেছে রে! সকালে যাওয়ার সময় যে লঙ্কা বাটা মূর্তিটা দেখেছিলাম, এখন দেখি একেবারে পাকা ফলের মতো নরম হয়ে গেছিস! কবি সাহেবের ওই কাগজের গোলাপ ফুলটা পাওয়ার পর থেকে তোর তো দেখছি পা আর মাটিতে পড়ছে না!"
প্রিয়া খিলখিল করে হেসে খাতার পাতা দিয়ে বাতাস করতে করতে বলল, "আরে ছাড় না! আমাদের কাজললতা তো এখন স্বর্গের রানি! ওই কবি সাহেব তোকে কী জানি ফুঁ দিয়েছে রে ভাই, না হলে যে মেয়ে ছেলেদের সামনে পেলে আস্ত চিবিয়ে খেত, সে আজ ওই একটা কবিতার লাইনেই পুরো গলে জল হয়ে গেল!"
মিম তখন দুই হাত দিয়ে নিজের গাল দুটো ধরে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, "উফ! আমার তো ভাবলেই হিংসে হচ্ছে! আমাদের জানু এত সহজে পটে গেল! আচ্ছা জানু, ওই কবি সাহেব যখন তোকে গোলাপটা দিচ্ছিল, তখন কি তোর পেটে প্রজাপতি উড়ছিল, নাকি অন্য কিছু?"
বান্ধবীদের এমন চোটপাট আর দুষ্টুমি ভরা কথা শুনে জান্নাতুল আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে রাগে লাল হয়ে একটা হালকা ধমক দিয়ে বলল, 
"চুপ করবি তোরা, নাকি রাস্তায় ফেলে রেখে দেবো? তোদের খালি আজেবাজে কথা! আর ওই বাঁদরটার কথা আমার সামনে আর একবারও বলবি না বলছি!" 
মুখে মানা করলেও জান্নাতুলের গালের লাল আভা কিন্তু অন্য কথাই বলছিল। বান্ধবীরা তখন আরও জোরে হেসে উঠলে জান্নাতুল লজ্জায় হনহন করে বাড়ির পথ ধরলো।
বান্ধবীরা সব একসাথে হই হই করে উঠে চিল্লিয়ে বলল,, জানু তুই ফাইসা গেছিস মানকির চিপায়, এবার কি হবে তোর জানু, বলে সবাই খিল খিল করে হাসতে থাকলো।
চলুন ওদিকে আমাদের ভীত নায়ক, কাজল লতার কবি সাহেবের অবস্থা কি একটু দেখে আসি চলুন একটু দেখে নেওয়া যাক!
স্কুল মাঠের সেই চাতালটার একটু দূরে দাঁড়িয়ে ইমনের অবস্থা তখন বেহাল। সে তখনো ওই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে বোকার মতো হাসছে, আর তার হাতে ধরা আছে সেই ডায়েরিটা। তার চার বাঁদর বন্ধু—রাফসান, সজল, ফাহিম আর তুষার—একটু দূর থেকে তাকে দেখছিল আর নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে নানা রকম পিনিক মার্কা ফাজলামো শুরু করে দিয়েছিল।
সজল ইমনের পিঠে একটা বিশাল থাপ্পড় মেরে খিলখিল করে হেসে বলে উঠল, "কিরে দোস্ত ইমন? এত ভাব মারিস যে তুই আস্ত এক রোমান্টিক হিরো, আর তোর কাণ্ডকারখানা দেখলে তো মনে হয় তুই আস্ত একটা ভেজা বিড়াল! আমরা তো ভেবেছিলাম আজ তুই গিয়ে সোজা ওই কাজললতাকে জড়িয়ে ধরে একটা কিস-টিস করে দিবি! কিন্তু তোর যা আক্কেল, তুই তো শেষমেশ একটা কাগজের গোলাপ ফুল আর কিছু ভাঙা চোরা কবিতা দিয়েই কাজ সারলি! ভাই তোর দ্বারা কিচ্ছু হবে না শালা! তোর এই রোমান্টিকতা দেখে তো আমার নিজেরই লজ্জা লাগছে!"
রাফসান তখন হাত জোড় করে গম্ভীর গলায় বলল, "দোস্ত ইমন! তোর এই ভীরু প্রেমের গতিবিধি দেখে আমার তো মনে হচ্ছে, আগামী কুড়ি বছর ধরে তোকে এই প্রেম টিকিয়ে রাখতে গেলে তোকে তসবিহ জপতে হবে! তুই নাকি আবার কবি! একটা মেয়ের সামনে গিয়ে হাত-পা থরথর করে কাঁপছিল, সেটা কি আমরা দূর থেকে দেখতে পাইনি নাকি? মাইরি বলছি, তুই যদি সেদিন আমাদের বুদ্ধি মতো না চলতিস, তাহলে তুই আজ সারাজীবন ব্যাচেলর হয়েই মরতিস!"
ফাহিম দাঁত কেলিয়ে ইমনের কলারটা একটু ধরে বলল, "ঠিক বলেছিস! ভাই, তুই আমাদের বস হোস, কিন্তু ওই কাজললতার সামনে গেলেই তোর সব বাহাদুরি কোথায় যেন কর্পূরের মতো উড়ে যায়! আচ্ছা বল তো ভাই, ধাক্কা খাওয়ার সময় তুই যে বলিস—'সব সময় তো আর ধাক্কা খাওয়ার জন্য এই কবি সাহেবকে পাবেন না'—সেটা তো বেশ জোরালো ছিল! কিন্তু আজকে অমন মিনমিন করে কথা বলছিলি কেন রে?"
বন্ধুদের মুখে এমন পিচ্ছিল ও পিনিক মার্কা ফাজলামো শুনে ইমন আর রাগ ধরে রাখতে পারল না। সে হাতে থাকা ডায়েরিটা দিয়ে সজলের মাথার ওপর একটা হালকা বাড়ি বসিয়ে দিয়ে চোখ পাকিয়ে বলল, 
"দূর হ' হারামজাদারা! তোদের এই ফাতরামি আর পিনিক মার্কা কথার চক্করেই তো আমার আজ এই অবস্থা! তোরা যদি সেদিন ওইভাবে আমাকে ঠেলে না দিসতিস, তাহলে হয়তো আমার এই কাজললতার দেখাটাই পেতাম না! এখন বেশি বকবক না করে চুপচাপ লাইনঘাট সোজা কর, নতুবা তোদের সবার গোপন কথা কিন্তু আমি একদিন ফাঁস করে দেবো!"
তুষার তখন একপাশে দাঁড়িয়ে চরম অ্যাটিটিউড নিয়ে বলল, "ভাই, আমি তো শুরু থেকেই বলছিলাম যে এই প্রেম-ট্রেম আমাদের ধাতে সয় না! তাও তোরা জোর করে আমাকে এই নাটকের দর্শক বানিয়ে দিলি।"
ভাই তোরা থামবে, 
 কোথায় আমি সুন্দর একটি মহৎ কাজ করলাম আমাকে সবাই একটু সান্তনা দিবি আমাকে সবাই একটু, দূর ভালো লাগেনা সব দূর হ,
বন্ধুরা তখন হো হো করে হেসে উঠল। ইমনের সেই লাজুক মুখ আর বন্ধুদের সেই হাসাহাসি মফস্বল শহরের দুপুরটাকে বেশ জমজমাট করে তুলেছিল।
ওদিকে বাড়ি ফিরে জান্নাতুল দেখল বাড়ির উঠোনে বেশ সুন্দর একটা শান্ত পরিবেশ। মা ফাতেমা বেগম তখন রান্নাঘরে বসে শাক বাছছেন। জান্নাতুল বোরকাটা খুলে রেখে ধীর পায়ে মায়ের কাছে গিয়ে বসল। মায়ের মুখের দিকে তাকাতেই তার মনটা কেমন যেন নরম হয়ে এল। সে মনে মনে ভাবল, 
"মা যদি একবার টের পায় যে আমি ওই কবি সাহেবের প্রেমে পড়ে গেছি, তাহলে কী যে হবে!"
ঠিক সেই মুহূর্তেই উঠোনের একপাশে এসে দাঁড়াল জান্নাতুলের বড় ভাই আরিফ। সে কাজের ফাঁকে একটু দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য বাড়ি এসেছে। আরিফ বেশ হাসিখুশি স্বভাবের একটা ছেলে। সে উঠোনে এসে নিজের জুতোটা একপাশে রেখে চাদরটা ঝেড়ে ফেলল। তারপর জান্নাতুলের দিকে মুচকি হেসে বলল, 
"কিরে বোন? আজ স্কুল থেকে ফিরতে এত দেরি হলো যে বড়? রাস্তাঘাটে কি কোনো নতুন কোনো কাহিনী ঘটে নাকি আজ?"
ভাইয়ের মুখে এমন প্রশ্ন শুনে জান্নাতুলের বুকটা একবার কেঁপে উঠল। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে একটু জিভ কেটে বলল,
 "না তো ভাইয়া! কিসের আবার কাহিনী! আজ ক্লাসে একটু নোট লেখা বাকি ছিল তো, তাই আসতে একটু দেরি হয়ে গেছে।"
আরিফ তখন ঠোঁটে দুষ্টু একটা হাসি ঝুলিয়ে জান্নাতুলের মাথার চুলে একটা হালকা টোকা দিয়ে বলল, "নোট লেখা বাকি ছিল, নাকি অন্য কিছু বাকি ছিল কে জানে! আজকাল তো তোদের মুখে সারাক্ষণ এক অদ্ভুত লাজুক ভাব দেখি! সাবধানে থাকিস তোরা, মফস্বল শহর হলেও আজকাল বখাটে ছেলেদের উৎপাদ বাড়সে!"
ভাইয়ের এমন কথায় মা ফাতেমা বেগম ভেতর থেকে হাতা নাড়তে নাড়তে বেরিয়ে এসে ধমকের সুরে বললেন, "এই আরিফ! সারাক্ষণ তোর শুধু বোনটার পেছনে লেগেই থাকা স্বভাব হয়েছে! পড়াশোনা করছে মেয়েটা, তুই খালি সবসময় ফাজলামো করিস কেন?"
আরিফ মায়ের কথা শুনে খিলখিল করে হেসে মায়ের কাঁধে হাত রেখে আদুরে গলায় বলল,
 "আরে মা! একটু মজা করলাম আর কি! আমার এই বোনটাকে কি আমি একটুও ভালোবাসতে পারব না নাকি? আচ্ছা মা, আজ রান্নায় কী ভালো জিনিস করেছ বলো তো? পেটে যে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে!"
ফাতেমা বেগম ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে ভালোবাসার সুরে বললেন, 
"সবই আছে বাবা, হাত-মুখ ধুয়ে আয়, খেতে দিচ্ছি।"
ভাই-বোনের এই মিষ্টি মুহূর্তটা আর মায়ের সেই স্নিগ্ধ আঁচলের ছায়া জান্নাতুলের সারাটা বিকেল জুড়ে এক অন্যরকম শান্তির আমেজ তৈরি করে দিল। সে তখনো তার ঘরের টেবিলে বসা অবস্থায় ড্রয়ারের ভেতর অতি যত্নে লুকিয়ে রেখেছে ইমনের দেওয়া সেই লাল কাগজের গোলাপ ফুলটি আর সেই চিরকুটটি।
রাতের বেলা খাওয়া-দাওয়া সেরে যখন চারপাশটা একদম নিঝুম হয়ে এল, তখন জান্নাতুল তার সেই পুরোনো কাঠের জানালাটা আবার খুলে বসল। বাইরে তখন ফালगुনের শেষ রাতের সেই মায়াবী জোছনা। ঝিরিঝিরি বাতাসে তার চুলগুলো অবিন্যস্ত হয়ে উড়ছিল। সে হাত বাড়িয়ে সেই চিঠিটা বের করে মৃদু আলোয় পড়তে লাগল, আর মনে মনে ফিসফিস করে বলল—
"সত্যি বলছি কবি সাহেব, আপনার এই পাগলামিগুলো আমার বড্ড ভালো লাগে।"
মফস্বল শহরের এই ছোট একটা কুঁড়েঘরের জানালার পাশে বসে এক গরিব ঘরের রাজকন্যা তখন তার রঙিন স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছে—যেখানে কোনো অভাব নেই, আছে শুধু এক ফালি বিশুদ্ধ ভালোবাসা আর এক কবি সাহেবের অবুঝ মন।
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন