#পর্ব_১৩
#হৃদয়_প্রনয়সক্তি
#লেখিকা_আরিফা_বিনতে_মায়া
সকাল ৯টা।
পুরো বাড়ি যেন সকালের আলোয় ঝলমল করছে।
বারান্দা দিয়ে ভেতরে আসছে রোদ্দুর, পাখির কলকাকলি আর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে খাবারের সুঘ্রাণ। বিশাল বাড়িটা নীরব হলেও চারদিকে একটা অদ্ভুত কোলাহল জমে আছে।
আদিবা আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল। চোখ ঘুরিয়ে একবারেই বাড়িটার ভেতরটা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করল।
দেয়ালে সাজানো দামি পেইন্টিং, বিশাল ঝাড়বাতি, লম্বা
কাচের জানালা দিয়ে ভেতরে ঢোকা আলো –সবকিছু মিলিয়ে একবারে ডুপ্লিকেট সিনেমার রাজপ্রাসাদের মতো মনে হলো।
সে একচিলতে হেসে মনে মনে বলল –
"বাড়ি দেখতে যতই সুন্দর হোক, ভেতরের মানুষের সাথে মানিয়ে চলাটাই আসল কঠিন ব্যাপার।
ঠিক তখনই সিড়ি দিয়ে নামছে রেহানা বেগম, সোজা গিয়ে ডাইনিং টেবিলের বরাদ্দ কৃত চেয়ারে বসে পড়লেন, কারন তিনি বর্তমানে এবাড়িতে কিছুদিন থাকবে, আলতাফ চৌধুরী পরশু দিন বিকেল বেলা বিজনেসের কিছু কাজের জন্য বাহিরে দেশে গেছে, তাই সকলের সাথে বসে খেতেন না, ৮টা বাজলে উনি চলে যেতেন উনার কাজে, আর ব্রেকফাস্ট করতেন বাহিরে।
চেয়ারে বসে তিনি আদিবার দিকে খেয়াল কররে দেখে' গায়ে তার কালো রঙের ৩প্রী, মাথায় ঘোমটা দেওয়ায় মুখ ওতটাও বুঝাযায় না। কাল রাতে যখন নিজের রুমে নিয়ে গিয়েছিল, তখন দেখছিল মেয়েটা গায়ের রং বরফের থেকেও সাদা, মুখটা একদম পুতুলের মত ধরলে শুধু আদর করতে ইচ্ছে করে, মেয়েটা দেখতে যেমন মিষ্টি -তেমনি লাগে অদ্ভুত, কারনটা তার জানার নেই। মেয়েটা যতটা শক্ত শবল দেখায়- ততটা কিন্তু নয়।
ভিতর থেকে একদম ভাঙা কাচ। "
এগুলো ভাবার পর, চোখে দৃঢ়তা আর কন্ঠে মায়া নিয়ে আদিবাকে কাছে ডাকলেন -
"আদিবা মা, এদিকে আয়। "
হঠাৎ এমন ডাকায় হকচকিয়ে গেল, আর ভাবলো আসলে কি উনি ওতটা ভালো ভাবে কথা বলে, নাকি... আর কিছু না ভেবে একটু সংকোচ নিয়ে ডাইনিং টেবিল গিয়ে বসল।
রেহানা বেগম সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন –
" এবাড়িতে থাকতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো?
মানিয়ে নিতে কষ্ট লাগছে না তো মা? "
আদিবা ছোট্ট করে হাসল। আর বলল-
"" না মা, আসলে নতুন জায়গা বলে একটু অচেনা লাগছে। তবে আমি চেষ্টা করছি। সময় লাগবে হয়তো।
এর মধ্যে একে একে সবাই ডাইনিং টেবিল এসে বসল।
আর রাহি আর চোখে একবার আদিবার দিকে তাকাল, তার কোন মতে এ মেয়ে কে পছন্দ হলো না কারন তার ভাবির জায়গাটা ভাইয়া অন্য কাউকে রেখেছে, আচ্ছা কোন প্রকার "এলিনা ভাবি জানতে পারে তার ভাই বিয়ে করে নতুন কাউকে এনেছে তখন কি হবে, oh my god, plz hlep me.
কোন কিছু জানি উল্টা -পাল্টা না হয়। আর কিছু না ভেবে নিজের মত করে নিয়ে খেতে লাগলো।
রোহান পরিপটি হয়ে একবারে আদিবার মুখোমুখি বসে পড়ল। তার ঠোঁটে একটু বাকা হাসি। মনে মনে নিল -
" এই মেয়েটা বাইরে থেকে শান্ত, ভেতরে কিন্তু পুরো চালাক। দেখতে ভদ্র, কিন্তু ধান্দা বাজ তো বটেই। "
তখনই রোহানের চাচী হাসতে হাসতে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন -
"আরে রোহু, তুই আমাদের কিছুই বললি না। হঠাৎ করেই বিয়ে করে ফেললি, কিভাবে হলো রে? "
রোহান কিছু বলতে মুখ খুললে, তখনই আদিবা আগ বাড়িয়ে উওর দিল -
"আসলে..... আমাদের বিয়েটা যেন এক দূর্ঘটনা।
না চাইতেও সব কিছু ঘটে গেল। "
মুহূর্তে রোহানের চোখ লাল হয়ে উঠল। ভেতরে ভেতরে সে গজরালো -
"বাহ! কাজটা নিজেই করে, এখন উল্টো সবার সামনে আমাকে দোষী প্রমাণ করছে এ্যাংরি বার্ড, কি জিনিয়াসরে বাবা!
চাচী আবার মজা করে বললেন -
" দূঘর্টনা হোক বা যাই হোক, তোর বউ কিন্তু একদম মানিয়েছে তোর সাথে, দেখনা চেহারা কেমন পুতুলের মত,
রোহান ঠোঁট কামড়ে বসে রইল, কারন তার যে আর কিছু বলার ভাষা নেই।
ঠিক তখনই রেহানা বেগম দৃঢ় কন্ঠে বললেন -
"আবরার, তোমার সাথে আদিবাকে নিয়ে শপিং করতে যাবে এখনই, ওর অনেক প্রয়োজনই জিনিস লাগতে পারে। আর বাড়িতে মেহমান আসবে ওর কিছু শাড়ি কিনি দিবি, এটাই আমার আদেশ।
রোহান সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে উওর দিল -
" না মম, আজ আমার অনেক কাজ আছে। "
ডাইনিং টেবিল মুহূর্তেই নীরবতা নেমে এল। তারপর মা ছেলের কথাকাটি শুরু হলো।
"মম, আপনি সবসময় আমার বিপক্ষে থাকেন।"
"আবরার! সংসার মানে শুধু নিজের কাজ নয়, সংসার মানে দায়িত্ব ভাগাভাগি নতুন বউকে অবহেলা করলে সংসার টিকবে না। আজকেই নিয়ে যাবি, আমি শেষ কথা কথা বলে দিলাম। "
রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল, আর আদিবার দিকে অগ্নি দৃষ্টি দিয়ে চেয়ে মনে মনে বলল-
"আজ তোমার কারনে মমের থেকে শুধু শুধু সংসার নিয়ে কথা শুনতে হলো, যেখানে আমি নিজের ইচ্ছে কিছু করি নি, সেখানে ব্ল্যাকমেল করে করেছো, আমি যে তোমার কি হাল করি শুধু দেখ! এখন রোহান চৌধুরী কে চিননি, সে কি জিনিস?
কিছু একটা ভেবে বাকা হেসে, চেয়ার থেকে উঠল আর বলল-
" ok mom.তুমি বলছ, আমি নিয়ে যাচ্ছি। সময় কিন্তু মাএ ৩০মিনিট, আর যদি সময় মতো রেডি না হয়ে আসে, তাহলে তখন আর কিছু বলতে পারবে না। ok.
সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলেও আদিবা তো আরও বেশি অবাক। মনে মনে বলল -
"আরেহ!এত তাড়াতাড়ি রাজি হয়ে গেলো? এ তো দেখছি বিলিতি বিলাইটা অন্য কিছু ভেবেছে । ডাল মে কুচ কালা হ্যায়।আদিবা তোকে চোখ খোলা রাখতে হবে, যেকোনো সময় বিপদের সম্মুখীন হতে হবে, সাবধান!
আর কিছু না ভেবে উপরে চলে গেল, আর ছটপট রেডি হয়ে সোজা বাহিরে গেল, দেখল রোহান গাড়ির ডিকির সাথে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে মোবাইল স্ক্রল করছে, আদিবাকে দেখে সোজা মোবাইল পকেটে ঢুকিয়ে গাড়ির দরজা খুলে দিল, এতে আদিবার কেমন ঘটকা লাগলো, মনে ভাবলো -
" বাহ!এত উন্নতি, নিজের হাতে দরজা...না সাবধান আদিবা, চোখ খোলা রাখিস, যে কোন সময় কিছু ঘটাতে পারে এই বিলিতি বিলাই।
আর কিছু না ভেবে সিট বেল্ট লাগিয়ে নিল, তার মধ্যে গাড়ি স্টাট করে নিজের গন্তব্যে চলে গেল।
-------------------------------------
মার্সার্সি শহরটা এক অদ্ভুত মিশ্রণ - পুরোনো দিনের সৌন্দর্য আর আধুনিকতার ঝলক। শহরের প্রবেশমূখেই দেখা যায় উঁচু গেট, সেখানেই খোদাই করা আছে লোহার কারুকাজ। ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে লম্বা প্রশস্ত রাস্তা, দু'পাশে সারি সারি গাছ যেন সবুজ টানেল তৈরি করছে।
সন্ধ্যা পর শহরটা যতই ঝলমল করুক, পুরানো অংশে তখনও ভয়াবহ নীরবতা।
তখনই অন্ধকার ঘরে একা দাড়িয়ে আছে এক রহস্যময় মানুষটা। চারপাশে কেবল নিস্তব্ধতা, দেয়ালে ঝুলানো পুরানো এক চোখের ছবি, সে চোখ দেখতে পুরোটা রেড ওয়াইনের মত লাল, যে কারো দেখলে নেশা হয়ে যাবে।
হঠাৎ সেই অদৃশ্য মানবের মুখ থেকে ভেসে আসে এক গভীর আর্তনাদ -
"রেড আই....! তুই কোথায়? আমি জানি তুই বেচে আছিস...!
তার চোখ জ্বলছে আগুন, কন্ঠস্বর ছিড়ে যাচ্ছে শূন্যতা ভেদ করে।
" তোকে মুছে দিতে চেয়েছিল অনেকে, মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে...কিন্তু আমি জানি, তোকে মৃত্যু স্পর্শ করতে পারি নি। তুই এখনও আছিস... কোথাও....এই পৃথিবীর ভিড়ে। "
সে আরো ও কাপা কন্ঠে চিৎকার করে উঠল-
"যদি তোকে কেউ আঘাত করে, যদি তোকে শেষ করে দিতে চায় - আমি শপথ করছি, আমি তার শ্বাস ছিনিয়ে নেবো!কারন "রেড আই " তুই শুধু নাম না... তুই আমার বেচে থাকার প্রতীক! "
ছবির একবারে সামনে এসে বলল-
"রেড আই....! তুই শুধু আমার না, তুই আমার প্রতিশোধ, আমার জীবন, আমার আগুন। কেউ যদি তোর শান্তি ভাঙতে চায়, আমি তার অস্তিত্ব শেষ করে দেবো –আর কেউ যদি বাধা দেয় পুরো দুনিয়া ধ্বংস করে দেব।
ছবি সাথে নিজের ঠোট এগিয়ে, ফিসফিস করে গান ধরে গেয়ে উঠল—
"প্রতি নিঃশ্বাসে- নাম তোমার
লেখা আমার–মনের ভেতরে
পুরো দুনিয়া জ্বালিয়ে দিব
করবো ছারখার, তোমায় না পেলে
পাগল হয়েছি আমি অনেক আগেই
হেরে গেছি আজ আমায় নিজের কাছে
কিছু বোঝেনা দুচোখ তুমি ছাড়া
সব হারাতেও রাজি পেতে তোমাকে
ঝড় হয়ে দিলে ' সব ধ্বংস করে করে
ক্ষত দেখাবো কাকে...
পারবেনা থামাতে... কেউ আমাকে
সবশেষ করবো নিজের হাতেই
"প্রতি নিঃশ্বাসে নাম তোমার
লেখা আমার -মনের ভেতরে
পুরো দুনিয়া জ্বালিয়ে দিব
করবো ছারখার, তোমায় না পেলে!
গান শেষ করে পাগলের মত জোরে জোরে হাসতে লাগলো"ব্লাডশেড" নামক রহস্যমানব। তার হাসির আওয়াজে প্রতিটা কোনায় বাড়ি খেয়ে কাচ ভেঙে চূর্ণ বিচুর্ণ করে দিল।
কে এই ব্লাডশেড? আর "রেড আই" এর জন্য কেন এত আহাজারি আর্তনাদ। সেকি আসলে রেড আইকে ভালো বাসে নাকি অন্য কোন রহস্য লুকিয়ে আছে তার ভিতরে , তা যদি দেখতে হয় তাহলে সামনে অপেক্ষা করতে হবে জানার জন্য।
--------------------------------------------
শপিং মলে শপিং শেষ করে সোজা গাড়ি নিয়ে রওনা হলো বাড়ির পথে। এরমধ্যে আদিবা রোহানকে ড্যাশ মেরে বলল-
"ইও কেউ আমায় বলেছিল যে, আমার জীবন কে নাকি নরকে পরিণত করবে, অথচ দেখ সে আমাকে শপিং করাচ্ছে, আবার লং ড্রাইফে নিয়েও যাচ্ছে।যাক অবশেষে মাথা একটু সুবুদ্ধি হলো, আগে বুঝতে পারিনি, যে কাউকে কোনো কিছু নিয়ে কথা শুনালে এমন হবে।আবার বলে ধ্বংস করবে, আগে তো কাজের কাজ করে দেখাক তার পর বড় ডায়লোগ দিবে।
" মুখকে ব্যঙ্গ করে বলো
আর রোহান দাতে দাত চেপে সব কথা সহ্য করে নিল, তবে সে তো আর ধমে যাওয়ার পাও না। তাই ফুল স্পিডে গাড়ি চালিয়ে এক পরিত্যাক্ত বিলের সামনে নিয়ে আসলো, যেখানে মানুষ জন আশে পাশে দাড়িয়ে বিভিন্ন শাক সবজি বিক্রি করে।
আর এক মিনিট সময় নষ্ট না করে আদিবাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগলো। আদিবা অনবরত হাত মুচরে মুচরে বলল -
"ছাড়ুন বিলিতি বিলাই! ছাড়ুন, কি করছেন, এভাবে কেউ হাত ধরে গাড়ি থেকে নামায়। ছাড়ুন বলছি!
আর কিছু বলতে না দিয়ে সোজা আদিবাকে ধাক্কা মেরে বিলের ময়লা পানিতে ফেলে দিলো। আর হাতের ঘড়ি দেখে গুনে গুনে ৪০মিনিট চুবিয়ে রাখল, মনে হল মনে ক্ষোপ মিনাটানোটাই এখন সব থেকে তার ইমপর্টেন্ট
কাজ। গুনা শেষ হলে আদিবা কে পানি থেকে উঠায়, আর তাকিয়ে দেখে আদিবা হাঁপাচ্ছে, আর অনবরত কাপছে
মুখে কিছু বলতে পারছে না
আর জনগণ তো আছিই, ফ্রি টিপি সিরিয়াল দেখার জন্য। অথচ কেউ সাহায্য করার মত নেই।
আদিবা অনবরত কাপছে দেখে, ঠোটে বাকা হাসি দিয়ে নিজের কোট টা ছুড়ে দিয়ে বলল -
" হ্যালো মেডাম! আপনি না এতক্ষণে আমার কান জ্বলা পালা করলেন। আমার নাকি কিছু করার ক্ষমতা নাই, তাহলে এটা কি? পানি টা নিশ্চয়ই অনেক মজা ছিল তাই না।
যাইহোক বাদ দিলাম, আজ থেকে এই আমার পিছনে লাগবেন তো, আপনার জীবন নরকে থেকেও বেশি হবে বুঝেন, আর রোহান চৌধুরীর সাথে যে কাজটা করলেন তার হিসেব তো প্রতিদিন নিব।
আর সকালে আমাকে এক মগ পানি দিয়ে ভিজালেন
আমিও আপনাকে ১০মন "না না soryy এর থেকে ও বেশি পানিতে ভিজালাম। আবার এটা যেই সেই পানি না মানুষের আবর্জনা, যেখানে সবাই রোজ ময়লা ফালায়। নিশ্চয়ই আপনার খুব পছন্দ হয়েছে তাই না।
okkk আর কথা বললাম না, ঐ জে কোট দিলাম। ওটা পরে একা একা পায়ে বাড়ি তে যাবেন এটাই আপনার শাস্তি আমাকে বিয়ে করার ফলে,খুব সখ না রোহান আবরার চৌধুরী কে ফাসানো, এখন মজা বুঝ।
"কত ধানে কত চাল ".
সামনে দেখ আর কি হয়?
এই বলে চোখের সানগ্লাস পড়ে গাড়িতে উঠে ড্রাইফ করে চলে গেল
আর আদিবা পানির মধ্যে থেকে রাগে দুঃখে দিল এক চিৎকার, আর মনে মনে বলল -
" বিলিতি বিলাই! কাজটা মোটও ঠিক করলি না। দেখ কি করি আমি! যদি এর বদলা না নিতে পারি তাহলে আমার নাম "নুসরাত জাহান আদিবা না। Min did.
আরো অনেক কিছু কল্পনা আর বিড়বিড় করে কোট টা পড়ে উঠে গেল। আর রাস্তা দিয়ে হাটতে হাটতে তার প্ল্যান সাজিয়ে নিল।
এরপরে কি করবে একমাত্র আদিবা জানে? রোহান কি তার জন্য প্রস্তুত তো!
চলবে......