ফন্ট সাইজ:
থিম:
মাফিয়া বাঁধন দ্যা সিআইডি অফিসার

৫০তম পর্ব

লেখক: Ahmed Badhon
​কলমে: আহমেদ বাঁধন
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
​[৫০তম খণ্ড —
​হাসপাতালের কেবিনের নরম বেডে নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে নূর। আর তার পাশে পাহাড়ের মতো শক্ত হয়ে বসে আছে স্বয়ং মাফিয়া কিং বাঁধন মির্জা!
​নিজের হিংস্র রাগ আর প্রতি হিংসাকে থানায় নীলিমার রক্তের বন্যায় মিটিয়ে সে ফিরে এসেছে তার একমাত্র জীবনের সুরক্ষার কাছে। রাত তখন প্রায় শেষ হয়ে আসছে। বাঁধনের চোখে এক ফোঁটা ঘুমও নেই। আট বছর আগের করুণ অতীতে সে আর ফিরে যেতে চায় না। অতীত যাই হোক, নূরের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শুধুই তার—এটাই বাঁধন মির্জার একমাত্র শেষ কথা!
​হঠাৎ করে নূরের চোখের পাতা দুটো সামান্য কেঁপে উঠে খুলে গেল।
​বাঁধন নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করে নূরের দিকে তাকাল। নূর সকালেও এই মানুষটাকে গম্ভীর ও রক্তচক্ষু নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছিল, এখনও দেখছে। তার কচি মনে এক অদ্ভুত কৌতুহল জেগে উঠল—এই অচেনা লোকটা সারাক্ষণ এভাবে তার দিকে চেয়ে থাকে কেন?!
​যদিও স্মৃতির আঘাতে নূরের জীবন থেকে 'মাফিয়া বাঁধন মির্জা' নামটা সম্পূর্ণ মুছে গেছে, কিন্তু ছোটবেলার সেই অভিমানী স্মৃতির এক আবছা প্রতিচ্ছবি তার মনে হালকা আলো ছড়াতে লাগল। ছোটবেলায় যে ভাই তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে চলে গিয়েছিল, এই লোকটার সুঠাম চেহারা আর গম্ভীর চোখের সাথে সেই স্মৃতি হুবহু মিলে যাচ্ছে!
​নূর বেড থেকে আধশোয়া হয়ে হালকা ও মিহি গলায় ডেকে উঠল—
​"বাঁধন ভাই...!"
​শব্দটি শোনামাত্রই বাঁধন মির্জার পুরো কান ও মস্তিষ্ক যেন স্তব্ধ হয়ে গেল! সে কিছুটা ঘোরের মধ্যে নূরের দিকে তাকাল। নূর তার নিচু গলায় আবার বলল—
​"কী হয়েছে আপনার?! কিছু লাগবে আপনার?!"
​নূর এবার মাথা নিচু করে মুখ ছোট করে বলে উঠল—
"বাঁধন ভাই... আপনি কি আমাকে চিনতে পেরেছেন?!"
​'ভাই'—এই একটা শব্দ শোনামাত্রই বাঁধন মির্জার মাথায় যেন লক্ষ ভোল্টের বজ্রপাত ঘটল!
​যে মেয়েটির জন্য সে নিজের দেশ ছেড়ে বিদেশের মাটিতে রক্ত ঝরিয়েছে, যার জন্য সে দুনিয়ার সব নিয়ম ধূলিসাৎ করে বিশ্বকাঁপানো মাফিয়া কিং হয়েছে, যে মেয়েটিকে সে নিজের অর্ধাঙ্গিনী ও জীবনের একমাত্র নিঃশ্বাস হিসেবে পূজো করে—সেই মেয়েটির মুখে নিজের জন্য 'ভাই' ডাক শুনে বাঁধন মির্জার মস্তিষ্কের প্রতিটি রগ চরম যন্ত্রণায় টনটন করে উঠল!
​বাঁধানের চোখ দুটো হিংস্র ও অদ্ভুত এক রূপ ধারণ করল। সে দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর গলায় গর্জে উঠে বলল—
​"হোয়াট দ্য ফাক ইজ ভাই?!!!"
​নূর নির্দোষ গলায় আমতা আমতা করে বলল—
"আপনাকে না দেখতে ঠিক আমার সেই পুরোনো ভাইটার মতো লাগে! সেই পচা ভাইটা, যে ছোটবেলায় আমাকে ধাক্কা দিয়ে একা ফেলে কোথাও চলে গিয়েছিল... তারপর থেকে আর কখনো ফিরে আসেনি! আপনিই কি সেই বাঁধন ভাই?!"
​বাঁধনের বুকের ভেতরটা ক্ষতে ভরা আগ্নেয়গিরির মতো ছাই হয়ে যেতে লাগল। নূরের স্মৃতির গোলকধাঁধায় আজ সে কেবল একজন 'ভাই' হয়ে আটকে গেছে—
এই সত্য মাফিয়া বাঁধন মির্জার ইগো ও ভালোবাসার চরম অপমান!
​বাঁধন মাথায় হাত দিয়ে আকুল কণ্ঠে বিড়বিড় করে উঠল—
"আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম! প্লিজ নূর... তুই আমাকে এই 'ভাই' শব্দটা আর কোনোদিন বলবি না!"
​নূর চরম অবাক হয়ে বলল—
"কেন বলব না?! আপনি তো দেখতে আমার সেই ভাইটার মতোই! তাহলে আমি আপনাকে কী বলে ডাকব?!"
​বাঁধনের মানসিক সহ্যের সীমা এবার চূড়ান্তভাবে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল! জীবনের চরম মানসিক আঘাত আর রাগের চাপে তার মাথার ভেতর সবকিছু ঘুরতে শুরু করল।
​কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যালবার্ট ও জোসেফ দরজার ফাঁক দিয়ে দেখার চেষ্টা করছিল। আচমকা কেবিনের ভেতর থেকে বাঁধনের এক হৃদয়বিদারক ও বিকট আর্তচিৎকার ভেসে এলো—
​"ইন্নালিল্লাহ! দিস ইজ দ্য লাস্ট ওয়ার্নিং! 'ভাই' ওয়ার্ড ইজ নট অ্যালাউড ইন মাই লাইফ!!"
​চিৎকারটি দেওয়ার সাথে সাথেই বাঁধন মির্জার বিশাল শরীরটা ধপাস করে মেঝের ওপর আছড়ে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল!
​বাইরে থেকে অ্যালবার্ট আর জোসেফ এক মুহূর্ত দেরি না করে দরজা ধাক্কিয়ে ভেতরে ঢুকল। তারা সোজা গিয়ে বাঁধনের অচেতন শরীরটা কোলে তুলে ধরল। বেডে শুয়ে থাকা নূর তো পুরো হাঁ করে তাকিয়ে রইল—মাত্র একটা 'ভাই' শব্দ শোনার কারণে একটা ৬ফুট ৫ ইঞ্চির সুঠাম দেহের সিংহমত মানুষ এভাবে ধপাস করে অজ্ঞান হয়ে নিচে পড়ে যেতে পারে?!
​নূর অবাক চোখে অ্যালবার্টের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—
"আচ্ছা... উনি এভাবে আচমকা অজ্ঞান হয়ে গেলেন কেন?!"
​অ্যালবার্ট প্রচণ্ড ব্যস্ত ও আতঙ্কিত হয়ে জোসেফকে বাঁধনকে ধরার ইশারা দিয়ে নূরের দিকে তাকিয়ে বলল—
"ম্যাডাম! আপনি স্যারকে এমন কী বলেছিলেন যে উনি এত বড় শক খেলেন?!"
​নূর তো সম্পূর্ণ ভালো হয়ে গেছে, শুধু মানসিক ট্রমার কারণে মেমোরি লস আর প্রচণ্ড জেদি-রাগী স্বভাবের হয়ে গেছে। নূর মুখ বাঁকিয়ে জবাব দিল—
"আমি তো বেশি কিছু বলিনি! শুধু জিজ্ঞেস করেছি উনি আমার সেই পুরোনো বাঁধন ভাই কি না!"
​'ভাই' শব্দটা শোনামাত্র অ্যালবার্টের কলিজা যেন শুকিয়ে গেল! সে বুঝে গেল—তাদের বস নূরের মুখে নিজেকে 'স্বামীর' বদলে 'ভাই' হিসেবে মেনে নিতে না পেরেই মানসিকভাবে কোলাপ্স করেছে!
​এদিকে জোসেফ এক দৌড়ে গিয়ে করিডোর থেকে সেই চম্পট দেওয়া ডাক্তারকে সোজা শার্টের কলার ধরে টেনে নিয়ে এলো!
​ডাক্তার ভয়ে হাত-পা কাঁপিয়ে বলতে লাগল—
"ম-আমাকে ছাড়ুন! আমি আর কোনো ভুল করিনি!"
​জোসেফ এক চরম ধমক দিয়ে বলল—
"চুপ কর হারামজাদা! তুই কিসের ডাক্তার রে?! তোকে এখনই জ্যান্ত কেটে কুকুরের সামনে ফেলে দেব যদি ভাইয়ের কিছু হয়! জলদি মেডিকেল টিম ডাক!"
​জোসেফের হুংকারে এবং হাসপাতালে মাফিয়া বসের জরুরি বার্তা ছড়াতেই গভীর রাতে শহরের নামীদামী সব বিদেশি ও দেশি স্পেশালিস্ট সার্জন ও চিকিৎসকদের ফোনে এনাউন্স করে হাসপাতালে উড়িয়ে আনা হলো।
​এদিকে নূর কেবিনের বেডে শুয়ে পুরো ডrama দেখে বিরক্ত হয়ে রাগে গজ গজ করতে করতে বলল—
"শালা! এই লোকের আবার কী হলো?! একটা সাধারণ 'ভাই' ডাক শুনে নাটক শুরু করছে! আমি কি তাকে জামাই ডাকব নাকি?! ফালতু টাইমপাস! আমি এখন ঘুমাব, ডিস্টার্ব করবে না কেউ!"
​নূর নিজের মতো উল্টো দিকে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। সে তো মাফিয়া বাঁধন মির্জাকে সম্পূর্ণ ভুলে গেছে, তাই তার মন-প্রাণে কোনো অপরাধবোধ নেই!
​কয়েক মিনিটের মধ্যে সেরা ডাক্তারদের টিম এসে অচেতন বাঁধন মির্জাকে ইমার্জেন্সি অপারেশন থিয়েটার (ICU)-তে নিয়ে গেল।
​বাইরে দরজায় হাত দিয়ে চরম টেনশনে দাঁড়িয়ে রইল অ্যালবার্ট ও জোসেফ। তারা বাঁধনকে শুধু বস হিসেবে দেখে না, নিজের আপন ভাইয়ের চেয়েও বেশি ভক্তি ও সম্মান করে। বাঁধন মির্জার রক্তে তাদের জীবন চলে, বাঁধনের কিছু হওয়া মানে তাদের অস্তিত্ব ধ্বংস হওয়া!
​দীর্ঘ সময় পর আইসিইউ-এর লাল বাতিটা নিভে গেল।
​প্রধান সার্জন মাথা নিচু করে বের হয়ে এলেন। তা দেখে অ্যালবার্ট একপ্রকার দৌড়ে গিয়ে ডাক্তারের কলারের কাছে হাত বাড়িয়ে বলল—
"বলুন! আমার ভাইয়ের কী হয়েছে?! স্পিক আউট!!"
​ডাক্তার এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচু কণ্ঠে বলল—
"আই অ্যাম সরি স্যার... তীব্র মেন্টাল শক আর ট্রমার কারণে মিস্টার বাঁধন মির্জা 'কোমা'-তে চলে গেছেন!"
​"কীউউউ?!.
"—অ্যালবার্ট ও জোসেফ দুজনেই যেন মাটির ওপর ধপাস করে বসে পড়ল!
​একটি মাত্র 'ভাই' শব্দ শুনে পুরো বিশ্বকে কাঁপানো মাফিয়া কিং আজ গভীর কোমায় ঢলে পড়েছে!
​জোসেফ মাথায় হাত দিয়ে করুণ স্বরে বলল—
"এটা কী হয়ে গেল অ্যালবার্ট?! ভাই কোমায় চলে গেল! এখন আমাদের কী হবে?! পুরো মাফিয়া সাম্রাজ্য কে সামলাবে?!"
​ডাক্তার ভীতি ভরা গলায় বলল—
"উনি কমা থেকে একদিনেও ফিরতে পারেন, আবার এক মাস বা দু মাসও লাগতে পারে... আমরা কিছুই নিশ্চিত বলতে পারছি না!"
​জোসেফ আর অ্যালবার্ট হতাশ হয়ে করিডোরের বেঞ্চে বসে পড়ল। বাঁধন ছাড়া তারা পুরো অনাথ! একটি মেয়েকে বাঁধন মির্জা কতটা সাইকোর মতো গভীরভাবে ভালোবাসলে তার মুখে এমন একটা শব্দ শুনে সরাসরি কোমাতে চলে যেতে পারে—তা ভেবে তারা শিহরিত হলো।
​হঠাৎ অ্যালবার্টের ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, মারাত্মক ও রহস্যময় বাঁকা হাসি ফুটে উঠল!
​জোসেফ অ্যালবার্টের মুখের সেই রহস্যময় হাসি দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—
"কী রে অ্যালবার্ট?! ভাই এদিকে কোমায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, আর তুই এভাবে রহস্যময় হাসি হাসছিস কেন?!"
​অ্যালবার্ট তার তীক্ষ্ণ ও চালাক চোখে জোসেফের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল—
"সময়ের অপেক্ষা কর জোসেফ! ভাই কোমায় গেছে তো কী হয়েছে?! ভাবি তো এখনো বাঁধন মির্জার নামেই আছে! ভাই যত দিন কমা থেকে না ফিরছে, তত দিন মিসেস নূর বাঁধন মির্জাকে নিয়ে আমি আমার নিজের স্টাইলে এক খেলা খেলব... দেখিস, ভাইকে খুব দ্রুতই কমা থেকে ফিরতে হবে!"
​অ্যালবার্টের এই অতিরিক্ত চালাক চালের রহস্য জোসেফ পুরোটা বুঝতে না পারলেও, সে জানে অ্যালবার্ট কোনো বড়সড় ধামাকা সাজাচ্ছে!
​অপরদিকে — কানাডার টরন্টো শহর:
​কনকনে ঠাণ্ডা রাতে নিজের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে তরুণ রিশাদ।
​কানাডার নামীদামী ইউনিভার্সিটিতে এখন সে একজন সফল ও জনপ্রিয় লেকচারার হওয়ার দৌড়ে কঠোর পরিশ্রম করছে। পড়াশোনা আর ক্যারিয়ারই এখন তার দিনরাত্রির একমাত্র সঙ্গী।
​কিন্তু রিশাদের অবচেতন মনে আজও কেবল একটি নামই গভীরভাবে খোদাই করা—'নূর'! নূর বিবাহিতা জেনেও তার মন মানতে চায় না।
​হঠাৎ রিশাদের দামি আইফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল এক অচেনা আন্তর্জাতিক নাম্বার (Unknown Number)!
​রিশাদ ফোনটা হাতে নিয়ে বারান্দার রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়াল। বিগত কয়েকদিন ধরে কানাডার মাঝরাতে তার ব্যালকনি থেকে এক রহস্যময়ী মেয়েকে আবছা দেখতে পায় সে, যে রিশাদের অতীত-বর্তমান সবকিছু সম্পর্কে অদ্ভুতভাবে জানে! অথচ রিশাদ নিজে সেই মিষ্টি মেয়েটির পরিচয় জানে না!
​রিশাদ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল—
​"নূর... আমি হয়তো কোনোদিন তোর সেই মাফিয়া স্বামীর মতো ক্ষমতাবান বা কোটিপতি হতে পারব না, কিন্তু আমি প্রমাণ করে দেব—সৎ পথে থেকেও একজন সফল মানুষ হওয়া যায়! তোর সামনে আমি একদিন ঠিকই একজন বিজয়ী হয়ে দাঁড়াব..."
​ফোনের রিংটোনটা শেষ রাতে ক্যানাডার কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসে বাজতেই লাগল...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন