পুতুল বউ
পর্ব—৫
সকালের শুরু
কুমিল্লার বাড়িতে তখন সকাল হয়ে গেছে।
জানালার ফাঁক দিয়ে মিষ্টি রোদ ঘরে ঢুকছে। রাতের বৃষ্টির পর চারপাশটা বেশ শান্ত। দূরে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে।
ফারিয়ার ঘুম ভাঙল একটু দেরিতে।
গতকালের জ্বরের কারণে শরীরটা এখনও কিছুটা দুর্বল। তবে আজ আগের চেয়ে অনেকটাই ভালো লাগছে।
পাশেই গোল হয়ে ঘুমিয়ে আছে তার আদরের বিড়াল মিষ্টি।
ফারিয়া মিষ্টির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
—“মিষ্টি, ওঠো। সকাল হয়ে গেছে।”
মিষ্টি চোখ খুলে একবার ফারিয়ার দিকে তাকাল। তারপর আবার চোখ বন্ধ করে দিল।
ফারিয়া মুচকি হেসে বলল,
—“তুমি তো আমার থেকেও বেশি ঘুমাও!”
তারপর ফারিয়া ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে ওযু করল।
জায়নামাজ বিছিয়ে ফজরের নামাজ পড়ে নিল।
নামাজ শেষে জায়নামাজটা গুছিয়ে রেখে আবার বিছানায় এসে বসল।
কিছুক্ষণ পর মিষ্টি ঘুম থেকে উঠে ফারিয়ার পায়ের কাছে এসে বসে পড়ল।
ফারিয়া তাকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,
—“আজকে কিন্তু আমার অনেক ভালো লাগছে।”
মিষ্টি মিউ করে উঠল।
ফারিয়া হেসে বলল,
—“হ্যাঁ, বুঝেছি। তুমিও খুশি।”
ছোট মেডামের নাস্তা
কিছুক্ষণ পর দরজায় টোকা পড়ল।
—“ছোট মেডাম, আসব?”
ফারিয়া বলল,
—“আসেন।”
করিমের মা হাতে নাস্তার প্লেট নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।
প্লেটটা টেবিলের ওপর রেখে বললেন,
—“ছোট মেডাম, আপনে একটু নাস্তা কইরা নেন।”
ফারিয়া প্লেটের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকা করে বলল,
—“আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।”
করিমের মা বললেন,
—“খেতে ইচ্ছে করে না ক্যান ছোট মেডাম? আপনে কাল থেইকা ঠিকমতো কিছু খান নাই।”
—“পরে খাব।”
—“না ছোট মেডাম, এখনই একটু খাইয়া নেন। আপনের শরীর এখনও দুর্বল।”
ফারিয়া মাথা নাড়ল।
—“সত্যি বলছি, আমার একদম ইচ্ছে করছে না।”
করিমের মা মমতা নিয়ে বললেন,
—“ছোট মেডাম, খালি পেটে থাকলে আপনের শরীর আরও খারাপ হইয়া যাবে।”
পাশে বসে থাকা নিলিমা বলল,
—“খালা, আপনি দেন। আমি ফারিয়াকে খাইয়ে দিচ্ছি।”
করিমের মা বললেন,
—“আচ্ছা মা, আপনে খাওয়াইয়া দেন। আমি পরে আবার আইতেছি।”
তিনি বেরিয়ে গেলেন।
নিলিমা প্লেটটা হাতে নিয়ে ফারিয়ার দিকে তাকাল।
—“চল, মুখ খোলো।”
ফারিয়া মুখ ঘুরিয়ে বলল,
—“আমি খাব না।”
—“কেন?”
—“ইচ্ছে করছে না।”
—“ইচ্ছে না করলেও খেতে হবে।”
ফারিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
—“তুমিও শুরু করলে?”
নিলিমা হেসে বলল,
—“হ্যাঁ, কারণ তুমি অসুস্থ। এখন তোমার কথা শুনতেই হবে।”
নিহা হেসে বলল,
—“ফারিয়া, খেয়ে নে। আন্টি জানলে কিন্তু বকবে।”
অনামিকা বলল,
—“হ্যাঁ, আগে খেয়ে নে। তারপর যত খুশি গল্প করিস।”
ফারিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—“তোমরা সবাই মিলে আমাকে জ্বালাচ্ছো।”
নিলিমা এক চামচ খাবার তুলে বলল,
—“আচ্ছা, এত কথা না বলে মুখ খোলো।”
ফারিয়া অনিচ্ছায় মুখ খুলল।
নিলিমা ধীরে ধীরে তাকে নাস্তা খাইয়ে দিতে লাগল।
এক চামচ...
দুই চামচ...
কিছুক্ষণ পর ফারিয়া বলল,
—“আর পারছি না।”
নিলিমা বলল,
—“আর মাত্র দুই চামচ।”
—“এক চামচ।”
—“দুই চামচ।”
নিহা হেসে বলল,
—“তুই আবার দরদাম করছিস?”
অনামিকা বলল,
—“জ্বর হয়েছে, কিন্তু বুদ্ধি ঠিকই আছে!”
সবাই হেসে ফেলল।
শেষ পর্যন্ত নিলিমা ফারিয়াকে নাস্তাটা খাইয়ে দিল।
ওষুধ
কিছুক্ষণ পর করিমের মা আবার ঘরে ঢুকলেন।
হাতে ওষুধ আর এক গ্লাস পানি।
তিনি ফারিয়ার দিকে এগিয়ে এসে বললেন,
—“ছোট মেডাম, নাস্তা করা হইছে?”
নিলিমা বলল,
—“হ্যাঁ, আমি খাইয়ে দিয়েছি।”
করিমের মা স্বস্তির হাসি দিয়ে বললেন,
—“আলহামদুলিল্লাহ। এইবার ছোট মেডাম, ওষুধটা খাইয়া নেন।”
ফারিয়া ওষুধ হাতে নিল।
—“আচ্ছা।”
ওষুধ খেয়ে পানি পান করল।
করিমের মা বললেন,
—“ভালো। আপনে এখন একটু বিশ্রাম নেন ছোট মেডাম। বেশি দৌড়াদৌড়ি করবেন না।”
—“আচ্ছা।”
করিমের মা বেরিয়ে গেলেন।
নিলিমার ফোনে সালমার কল
কিছুক্ষণ পর নিলিমার ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
সালমা কলিং...
নিলিমা ফোনটা ধরল।
—“হ্যালো সালমা?”
ওপাশ থেকে সালমা বললেন,
—“নিলিমা, ফারিয়া কেমন আছে?”
—“এখন অনেক ভালো। নাস্তা করেছে, ওষুধও খেয়েছে।”
—“আলহামদুলিল্লাহ।”
ফারিয়া মায়ের কণ্ঠ শুনে বলল,
—“আম্মু!”
নিলিমা ফোনটা ফারিয়ার হাতে দিয়ে বলল,
—“নাও, তোমার আম্মুর সঙ্গে কথা বলো।”
ফারিয়া ফোন হাতে নিয়ে বলল,
—“আম্মু, তুমি কেমন আছো?”
—“আমি ভালো আছি মা। তুমি কেমন আছো?”
—“ভালো।”
—“নাস্তা করেছিস?”
ফারিয়া একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
—“হ্যাঁ।”
নিলিমা পাশে থেকে হেসে বলল,
—“নিজে খেতে চায়নি। আমাকে খাইয়ে দিতে হয়েছে।”
সালমা হেসে বললেন,
—“আমার মেয়েটা ছোটবেলা থেকেই এমন।”
ফারিয়া বলল,
—“আম্মু!”
সালমা হেসে বললেন,
—“আচ্ছা আচ্ছা, আর বলব না।”
তারপর বললেন,
—“শোন, নানু-নানু তোর সঙ্গে কথা বলবে।”
নানুর সঙ্গে কথা
প্রথমে নানা ফোনটা নিলেন।
—“ফারিয়া মা?”
—“নানু!”
—“কেমন আছিস?”
—“ভালো আছি।”
—“জ্বর কমেছে?”
—“হ্যাঁ।”
—“তুই না আসায় আমার খুব খারাপ লাগছে।”
ফারিয়া মিষ্টি করে বলল,
—“আমি ভালো হলেই আসব নানু।”
—“কথা দিলি?”
—“কথা দিলাম।”
এরপর নানু ফোনটা নিলেন।
—“কী রে পুতুল?”
—“ভালো আছি নানু।”
—“আমাদের বাড়িতে আসবি কবে?”
—“খুব তাড়াতাড়ি।”
—“তোর জন্য কিন্তু সবাই অপেক্ষা করছে।”
—“আমিও সবাইকে খুব মিস করছি।”
—“তাহলে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে আয়।”
—“আচ্ছা নানু।”
মামাদের সঙ্গে কথা
এরপর একে একে মামাদের সঙ্গেও ফারিয়ার কথা হলো।
বড় মামা বললেন,
—“কেমন আছিস মা?”
—“ভালো আছি মামা।”
—“তুই না আসায় বাড়িটা ফাঁকা লাগছে।”
—“আমারও আসতে খুব ইচ্ছে করছিল।”
—“ভালো হয়ে তাড়াতাড়ি চলে আয়।”
—“আসব।”
মেজো মামা ফোন নিয়ে বললেন,
—“আমাকে ভুলে গেছিস নাকি?”
ফারিয়া হেসে বলল,
—“না মামা!”
—“তাহলে এতদিন দেখা নেই কেন?”
—“জ্বর হয়ে গেল যে!”
—“এই জ্বরটা তো সব পরিকল্পনা নষ্ট করে দিল।”
ফারিয়া হেসে ফেলল।
ছোট মামা ফোন নিয়ে বললেন,
—“তুই আসলে কিন্তু অনেক গল্প হবে।”
—“আমি আসলেই সব গল্প শুনব।”এই ভাবে একের পর একে মামানিদের সাথেও কথা হলো
—“তাহলে তাড়াতাড়ি আয়।”
—“আচ্ছা।”
নিলিমা, নিহা ও অনামিকা
সালমা আবার নিলিমার সঙ্গে কথা বললেন।
—“নিলিমা, তই আর মেয়েরা ঠিকমতো ওর সঙ্গে থাকো।”
—“চিন্তা করিস না। আমরা আছি।”
নিহা বলল,
—“আন্টি, আপনি একদম চিন্তা করবেন না।”
অনামিকা বলল,
—“হ্যাঁ আন্টি, ফারিয়াকে আমরা ঠিকমতো দেখছি।”
সালমা হেসে বললেন,
—“তোদের ওপর আমার ভরসা আছে।”
নিলিমা বলল,
—“তুই আগে সবার সঙ্গে দেখা কর। তারপর ফারিয়ার কাছে ফিরে এসে!
—“হ্যাঁ, আমি দুপুরের পরই রওনা দেব।”
জাহিদের সঙ্গে কথা হওয়ার আগেই
কিছুক্ষণ পর সালমা বললেন,
—“মা, এবার জাহিদের সঙ্গে কথা বলবি?”
ফারিয়া হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।
তার বুকের ভেতরটা ধুকপুক করতে লাগল।
সে আস্তে করে বলল,
—“হুম... দাও।”
সালমা বললেন,
—“একটু দাঁড়া, জাহিদ এদিকেই আসছে।”
ফারিয়া ফোনটা শক্ত করে ধরে অপেক্ষা করতে লাগল।
ঠিক তখনই ওপাশ থেকে জাহিদের কণ্ঠ ভেসে এলো,
—“ফুফি মনি, ফোনটা কার?”
ফারিয়ার বুকটা কেঁপে উঠল।
সে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
কিন্তু জাহিদের সঙ্গে কথা বলার আগেই হঠাৎ কল কেটে গেল।
ফারিয়া কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর আস্তে করে বলল,
—“কথাটাও হলো না...”
নিহা ফারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“হয়তো পরে হবে।”
ফারিয়া কোনো উত্তর দিল না।
মিষ্টির সঙ্গে ফারিয়া
ফারিয়া বিছানায় গিয়ে বসতেই মিষ্টি এসে তার কোলে উঠে পড়ল।
ফারিয়া মিষ্টির মাথায় হাত বুলিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
তার মনে শুধু একজনের কথাই ঘুরছে—
জাহিদ।
ছোটবেলার সেই দুষ্টু ছেলেটা।
যে তাকে সবসময় বিরক্ত করত।
তার পুতুল লুকিয়ে রাখত।
আবার রাগ করলে নিজেই এসে মান ভাঙাত।
ফারিয়া মিষ্টির মাথায় হাত বুলিয়ে আস্তে করে বলল,
—“মিষ্টি, জাহিদ ভাইয়া কি আমাকে এখনও মনে রেখেছে?”
মিষ্টি মিউ করে উঠল।
ফারিয়া হেসে বলল,
—“আমি কিন্তু ওকে ভুলিনি।”
কথাটা বলেই ফারিয়া নিজের মুখ ঢেকে ফেলল।
—“আমি এসব কী বলছি!”
দূর থেকে অনামিকা হেসে বলল,
—“আমরা কিন্তু শুনেছি!”
ফারিয়া লজ্জা পেয়ে বলল,
—“তোরা চুপ কর!”
নিহা হেসে বলল,
—“আচ্ছা, আমরা কিছু বলছি না।”
অনামিকা মুচকি হেসে বলল,
—“তুই চাইলে আমাদের বলতে পারো।”
ফারিয়া লজ্জা পেয়ে মিষ্টিকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
—“কিছুই বলব না।”
সালমার কুমিল্লায় ফেরা
দুপুরের পর সালমা খান বাড়ি থেকে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।
নাসরিন মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
—“মা, ফারিয়াকে ভালোভাবে দেখে রাখিস।”
—“অবশ্যই আম্মু।”
মিথিলা বললেন,
—“আফা, ফারিয়া ভালো হলে ওকে নিয়ে এসো।”
সালমা হেসে বললেন,
—“অবশ্যই।”
নিলিমা বলল,
—“তুমি চিন্তা করো না সালমা। ও এখন অনেক ভালো।”
সালমা মৃদু হেসে বললেন,
—“জানি। তবুও মেয়েকে অসুস্থ রেখে মায়ের মন তো পড়ে থাকে।”
তারপর সবাইকে সালাম দিয়ে সালমা গাড়িতে উঠলেন।
গাড়ি ধীরে ধীরে খান বাড়ির গেট পেরিয়ে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
বিকেলের দিকে গাড়ি কুমিল্লার বাড়ির সামনে এসে থামল।
ফারিয়া জানালা দিয়ে গাড়িটা দেখেই বুঝতে পারল—
আম্মু এসে গেছে।
কিছুক্ষণ পর সালমা ঘরে ঢুকলেন।
ফারিয়া মায়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
—“আম্মু!”
সালমা মেয়ের কপালে হাত রাখলেন।
—“এখন তো জ্বর অনেকটাই কম।”
—“হুম।”
সালমা মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।
—“আমার মেয়েটা তাড়াতাড়ি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠুক।”
ফারিয়া মায়ের বুকে মাথা রেখে চুপ করে রইল।
কিন্তু তার মনের ভেতরে তখনও একটা কথাই ঘুরছে—
আজ জাহিদের সঙ্গে কথা হতে হতে হলো না।
আর ঢাকার খান বাড়িতে জাহিদও জানে না—
কুমিল্লার একটা ঘরে বসে কেউ একজন আজ সারাদিন তার কথাই ভেবেছে।
চলবে…