পুতুল বউ
পর্ব—১২
ফলাফলের সকাল
সকালটা আজ যেন অন্যরকম সুন্দর।
রাতের বৃষ্টির পর চারপাশটা ঝকঝকে হয়ে আছে। জানালা দিয়ে নরম রোদ ঘরে এসে পড়েছে। দূরে পাখির ডাক, আর ভোরের ঠান্ডা বাতাসে পুরো বাড়িটা শান্ত হয়ে আছে।
ফারিয়া প্রতিদিনের মতো ঘুম থেকে উঠে ওযু করে নামাজ পড়ে নিল।
নামাজ শেষে কিছুক্ষণ জায়নামাজে বসে দোয়া করল।
তারপর মিষ্টিকে খুঁজতে গিয়ে দেখল, তার আদরের বিড়ালটা দরজার পাশে গোল হয়ে বসে আছে।
ফারিয়া মিষ্টিকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করে বলল,
—“আমার মিষ্টি, ঘুম ভাঙছে?”
মিষ্টি মিউ করে উঠল।
ফারিয়া হেসে বলল,
—“চলো, তোমাকে নিয়ে বাগানে যাই।”
মিষ্টিকে পাশে রেখেই ফারিয়া হাতে পানির ঝাঁঝরি নিয়ে বাগানে চলে গেল।
এক এক করে ফুলের গাছগুলোতে পানি দিতে লাগল।
গোলাপ, জুঁই, বেলি—সবগুলো গাছই যেন আজ আরও সুন্দর লাগছে।
ঠিক তখনই গেটের বাইরে দুজনের কণ্ঠ শোনা গেল।
—“ফারিয়া!”
—“ফারিয়া, কোথায় তুই?”
ফারিয়া ঘুরে তাকিয়ে দেখল অনামিকা আর নিহা দাঁড়িয়ে আছে।
ফারিয়া অবাক হয়ে বলল,
—“তোরা এত সকালে?”
নিহা দ্রুত এসে বলল,
—“আজকে কী দিন ভুলে গেছিস?”
ফারিয়া মুচকি হেসে বলল,
—“কী দিন?”
অনামিকা চোখ বড় বড় করে বলল,
—“আজকে আমাদের SSC রেজাল্ট!”
ফারিয়া একটু থেমে বলল,
—“ওহ! জানি তো।”
নিহা বিরক্ত হয়ে বলল,
—“জানিস, কিন্তু তোর কোনো চিন্তাই নেই!”
ফারিয়া হেসে বলল,
—“চিন্তা করে কী হবে? যা হওয়ার হয়ে গেছে।”
অনামিকা বলল,
—“তোর এত সাহস কোথা থেকে আসে বল তো?”
ফারিয়া মিষ্টির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
—“আমার তো মনে হচ্ছে ভালোই হবে।”
নিহা বলল,
—“আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
অনামিকা বলল,
—“আমারও! মনে হচ্ছে রেজাল্টের আগে আমি অজ্ঞান হয়ে যাব।”
ফারিয়া হেসে ফেলল।
—“আচ্ছা, তোরা আগে ভেতরে আয়। আমি নাস্তা করছি।”
---
রেজাল্টের অপেক্ষা
তিনজন ঘরে এসে বসতেই ফারিয়া নাস্তার টেবিলে বসে গেল।
নিহা বারবার নিজের ফোনটা দেখছে।
অনামিকাও ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে।
ফারিয়া দুজনের কাণ্ড দেখে বলল,
—“কিরে? এমন করছিস কেন?”
নিহা বলল,
—“দশটা বাজতে আর কতক্ষণ?”
ফারিয়া দেয়ালের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
—“দশটা বাজতে আর কত সময়?”
অনামিকা সঙ্গে সঙ্গে ঘড়ি দেখে বলল,
—“আর মাত্র পনেরো মিনিট!”
নিহা মাথায় হাত দিয়ে বলল,
—“এই পনেরো মিনিটই তো এখন পনেরো বছর মনে হচ্ছে!”
ফারিয়া হেসে বলল,
—“তোরা আগে শান্ত হ।”
অনামিকা বলল,
—“তুই এত শান্ত কীভাবে আছিস?”
ফারিয়া নাস্তা করতে করতে বলল,
—“আমি শান্ত না থাকলে কি রেজাল্ট ভালো হয়ে যাবে?”
নিহা বলল,
—“না।”
—“তাহলে খাও।”
অনামিকা হেসে বলল,
—“এই মেয়ের মাথায় শুধু খাবার!”
ফারিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—“আমি অন্তত খাচ্ছি। তোরা তো দুশ্চিন্তা করতে করতে শুকিয়ে যাচ্ছিস।”
তিনজনই হেসে ফেলল।
---
স্কুলে রেজাল্ট
নাস্তা শেষ করে তিন বান্ধবী দ্রুত স্কুলের উদ্দেশ্যে বের হলো।
স্কুলের সামনে আজ অনেক শিক্ষার্থী আর অভিভাবকের ভিড়।
কারও মুখে হাসি, কেউ আবার চিন্তায় চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
ফারিয়া, অনামিকা আর নিহা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে রেজাল্টের অপেক্ষা করতে লাগল।
অবশেষে স্কুলের একজন শিক্ষক বাইরে এসে বললেন,
—“তোমাদের রেজাল্ট প্রকাশ হয়েছে। সবাই শান্তভাবে নিজের রেজাল্ট দেখো।”
তিনজনই ফোন হাতে নিল।
ফারিয়ার হাতটাও একটু কেঁপে উঠল।
নিহা বলল,
—“ফারিয়া, আগে তুই দেখ।”
ফারিয়া বলল,
—“না, তুই আগে দেখ।”
অনামিকা বলল,
—“তোরা কেউ আগে দেখবি না? আমি দেখছি!”
অনামিকা দ্রুত নিজের রেজাল্ট দেখল।
কয়েক সেকেন্ড পর তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
—“আমি A পেয়েছি!”
নিহা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ!”
তারপর নিহাও নিজের রেজাল্ট দেখল।
—“আমিও A পেয়েছি!”
দুজন আনন্দে একে অপরকে জড়িয়ে ধরল।
এবার ফারিয়ার পালা।
ফারিয়া কাঁপা হাতে নিজের রেজাল্ট খুলল।
কয়েক মুহূর্ত সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর তার চোখ বড় হয়ে গেল।
—“তোরা...”
অনামিকা বলল,
—“কী হয়েছে?”
ফারিয়া মৃদু হেসে বলল,
—“আমি A+ পেয়েছি!”
নিহা চিৎকার করে উঠল,
—“ফারিয়া!”
অনামিকা সঙ্গে সঙ্গে তাকে জড়িয়ে ধরল।
—“আমি জানতাম! তুই পারবি!”
ফারিয়ার চোখে আনন্দের পানি এসে গেল।
সে মৃদু হেসে বলল,
—“আলহামদুলিল্লাহ।”
তিন বান্ধবী একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ করতে লাগল।
---
ফেরার পথে তিন বান্ধবী
স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় তিনজনের মুখেই হাসি।
অনামিকা বলল,
—“ফারিয়া, আজকে তোর জন্য মিষ্টি খাওয়াবি।”
ফারিয়া বলল,
—“কেন? তোরা A পেয়েছিস, তোদেরও খাওয়াতে হবে।”
নিহা বলল,
—“ঠিক আছে। তিনজন মিলে খাব।”
অনামিকা হেসে বলল,
—“কিন্তু বিল দেবে A+ পাওয়া মানুষটা!”
ফারিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“কী! A+ পেলেই কি আমি এত বড়লোক হয়ে গেলাম?”
নিহা হেসে বলল,
—“হ্যাঁ, আজ থেকে তুই আমাদের VIP!”
ফারিয়া ওদের দুজনকে ধাক্কা দিয়ে বলল,
—“তোরা একদম অসহ্য!”
তিনজন হাসতে হাসতে বাড়ির পথে এগিয়ে গেল।
---
খান বাড়িতে খবর
অন্যদিকে সালমা ইসলাম ফোন হাতে নিয়ে খান বাড়িতে সবার সঙ্গে কথা বলছিলেন।
নাসরিন উৎকণ্ঠিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
—“সালমা, রেজাল্ট কী হলো?”
সালমার মুখে সঙ্গে সঙ্গে গর্বের হাসি ফুটে উঠল।
—“আম্মু, আমার ফারিয়া A+ পেয়েছে!”
নাসরিন আনন্দে বলে উঠলেন,
—“আলহামদুলিল্লাহ! আমার পুতুল A+ পেয়েছে!”
আবদুল হাকিম খানও পাশে থেকে বললেন,
—“মাশাআল্লাহ! আমার নাতনি তো দারুণ করেছে।”
মিথিলা খুশি হয়ে বললেন,
—“সালমা আফা, ফারিয়াকে আমার পক্ষ থেকে অনেক আদর দিয়েন।”
সালমা হেসে বললেন,
—“অবশ্যই।”
এক এক করে খান বাড়ির সবাই ফারিয়ার রেজাল্টের কথা শুনে আনন্দ করতে লাগল।
আর সেই খবরটা গিয়ে পৌঁছাল জাহিদের কাছেও।
জাহিদ খবরটা শুনে মুচকি হেসে বলল,
—“আমার পুতুল তো পারবেই।”
সাওন পাশে থাকলে হয়তো আবার তাকে নিয়ে মজা করত।
কিন্তু আজ সাওন আর সাব্বির কেউই তার পাশে নেই।
জাহিদ একা বসে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ফারিয়ার নামের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল,
—“অভিনন্দন, পুতুল।”
তার মুখে ফুটে উঠল গর্ব আর অদ্ভুত এক মায়ামাখা হাসি।
আর ঠিক তখনই দূর থেকে ফারিয়ার হাসির শব্দ যেন তার কল্পনায় ভেসে এলো।
জাহিদ মনে মনে বলল,
—“তুই অনেক বড় হয়ে গেছিস, ফারিয়া...”
চলবে….