পুতুল বউ
পর্ব—১৩
দুই বছর পর
দেখতে দেখতে আরও দুই বছর কেটে গেল।
এই দুই বছরে ফারিয়া আর জাহিদ দুজনেই অনেক বড় হয়ে গেছে।
ফারিয়া এখন কলেজে পড়ে, আর জাহিদ ইউনিভার্সিটিতে।
সময় যেমন তাদের বয়স বাড়িয়েছে, তেমনি বদলে দিয়েছে তাদের চেহারাও।
ফারিয়া এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি সুন্দরী হয়ে উঠেছে। কোমর ছাড়িয়ে নেমে আসা ঘন কালো চুল, মায়াবী চোখ, মিষ্টি হাসি—তাকে দেখলে যে কেউ দ্বিতীয়বার তাকাতে বাধ্য হয়।
অন্যদিকে জাহিদও এখন ক্যাম্পাসের অন্যতম আকর্ষণ।
লম্বা, সুদর্শন, আত্মবিশ্বাসী জাহিদকে দেখলেই ক্যাম্পাসের অনেক মেয়ের চোখ আটকে যায়।
জাহিদের ক্যাম্পাস
সেদিন ক্লাস শেষ করে জাহিদ আবির, নাহিম, রাকিব, সাওন আর সাব্বিরের সঙ্গে ক্যাম্পাসের মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
দূর থেকে কয়েকজন মেয়ে বারবার জাহিদের দিকে তাকাচ্ছিল।
একজন আরেকজনকে বলল,
—“ওই ছেলেটা কে?”
আরেকজন মুচকি হেসে বলল,
—“জাহিদ। আমাদের ডিপার্টমেন্টের।”
—“অনেক সুন্দর না?”
—“শুধু সুন্দর না, অনেক মেয়েই ওকে পছন্দ করে।”
কথাগুলো জাহিদের কানে গেলেও সে কোনো গুরুত্ব দিল না।
আবির হেসে জাহিদের কাঁধে হাত রেখে বলল,
—“ভাই, তোর জন্য তো দেখি পুরো ক্যাম্পাস পাগল!”
নাহিম বলল,
—“প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ তোর দিকে তাকায়। তোর ভাগ্য কিন্তু ভালো!”
রাকিব মজা করে বলল,
—“একজনকে পছন্দ করলেই তো আর এতজনকে দেখা যায় না!”
সাওন আর সাব্বির হেসে উঠল।
জাহিদ বিরক্ত হয়ে বলল,
—“তোরা শুরু করিস না।”
সাব্বির বলল,
—“কেন? সত্যি কথা বলছি। এত মেয়ে তোর পেছনে ঘুরে, তবুও তুই কাউকে পাত্তা দিস না।”
জাহিদ মৃদু হেসে বলল,
—“যাকে মনে জায়গা দিয়েছি, তার জায়গা অন্য কেউ নিতে পারবে না।”
সবাই একে অপরের দিকে তাকাল।
আবির বলল,
—“ফারিয়া?”
জাহিদ এবার কোনো উত্তর দিল না।
শুধু মুচকি হেসে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
ফারিয়ার সকাল
অন্যদিকে প্রতিদিনের মতো ভোরে ঘুম থেকে উঠল ফারিয়া।
ওযু করে নামাজ পড়ল।
নামাজ শেষে জায়নামাজে বসে কিছুক্ষণ দোয়া করল।
তারপর বাগানে চলে গেল।
হাতে পানির ঝাঁঝরি।
এক এক করে গোলাপ, জুঁই, বেলি আর রজনীগন্ধার গাছে পানি দিতে লাগল।
সকালের নরম রোদে ফারিয়ার মুখটা আরও উজ্জ্বল লাগছিল।
লম্বা চুলগুলো বাতাসে উড়ছিল।
মিষ্টি পায়ের কাছে ঘুরঘুর করতেই ফারিয়া হেসে নিচু হয়ে তাকে কোলে তুলে নিল।
—“এই যে আমার মিষ্টি, এত সকালে ঘুম ভেঙে গেছে?”
মিষ্টি মিউ করে উঠল।
ফারিয়া তার কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলল,
—“চলো, আগে তোমাকে একটু আদর করি।”
মিষ্টিকে নিয়ে বাগানের বেঞ্চে বসে পড়ল ফারিয়া।
তারপর নিজের চুল ঠিক করতে করতে ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
ফারিয়ার সৌন্দর্য এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাকে দেখলে পরিচিত মানুষও মাঝে মাঝে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
কলেজের বান্ধবীরা
কলেজে ফারিয়ার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী এখন চারজন।
অনামিকা, নিহা, বৃষ্টি আর তাসপ্রিয়া।
পাঁচজন একসঙ্গে থাকলে পুরো কলেজটাই যেন তাদের হাসির শব্দে মুখর হয়ে ওঠে।
বৃষ্টি প্রায়ই ফারিয়াকে বলত,
—“তুই জানিস, তুই দিন দিন কত সুন্দর হচ্ছিস?”
ফারিয়া হেসে বলত,
—“আবার শুরু করলি!”
তাসপ্রিয়া বলত,
—“সত্যিই তো! কলেজের অর্ধেক ছেলে তোকে দেখলে তাকিয়ে থাকে।”
ফারিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলত,
—“আমি এসব খেয়ালই করি না।”
নিহা হেসে বলত,
—“তুই খেয়াল না করলেও ওরা তো করে!”
সবাই হেসে উঠত।
ফারিয়া শুধু মুচকি হাসত।
তার এসব নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই।
কলেজ থেকে বাড়ি
বিকেলে কলেজ থেকে ফিরে ফারিয়া বাড়িতে ঢুকেই মাকে দেখতে পেল।
মাকে দেখেই দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল।
—“আম্মু!”
সালমা হেসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
—“আমার মেয়েটা তো প্রতিদিনই বড় হচ্ছে!”
ফারিয়া মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বলল,
—“আমি যত বড়ই হই, তোমার কাছে তো ছোটই থাকব।”
তারপর মায়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করে নিজের ঘরে চলে গেল।
ওযু করে নামাজ পড়ল।
নামাজ শেষ করতেই মিষ্টি দৌড়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল।
ফারিয়া হেসে বলল,
—“কী হলো? আমাকে ডাকছিস?”
মিষ্টি তার জামা আঁকড়ে ধরতেই ফারিয়া তাকে কোলে তুলে নিল।
—“আচ্ছা, আজকে তোকে নিয়ে একটু খেলি।”
কিছুক্ষণ পর ঘরজুড়ে শুধু ফারিয়ার হাসির শব্দ।
ফারিয়ার ডায়েরি
রাতের পড়াশোনা শেষ করে ফারিয়া ড্রয়ার খুলে তার পুরোনো ডায়েরিটা বের করল।
ডায়েরিটা খুলে অনেকক্ষণ খালি পাতার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লিখতে শুরু করল—
“আজকে দিনটা খুব সুন্দর ছিল।
সকালে ফুল গাছে পানি দিয়েছি।
মিষ্টির সঙ্গে অনেক খেলেছি।
কলেজে বৃষ্টি আর তাসপ্রিয়া আবার বলল, আমি নাকি আগের চেয়ে অনেক সুন্দর হয়ে গেছি।
কিন্তু আমি জানি না...
সৌন্দর্য দিয়ে কী হয়?
কখনো কখনো মনে হয়, আমার জীবনে কিছু একটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।”
ফারিয়া একটু থামল।
তারপর ধীরে ধীরে লিখল—
“আজ আবার জাহিদ ভাইয়ের কথা মনে পড়ল।
অনেক দিন তাকে দেখিনি।
জানি না উনি এখন কেমন আছেন।
উনি কি আমাকে মনে রেখেছেন?”
কিছুক্ষণ পর ফারিয়া আবার লিখল—
“হয়তো উনার জীবনে অনেক মানুষ এসেছে।
হয়তো উনি আমাকে ভুলে গেছেন।
কিন্তু আমি কেন জানি তাকে এখনো ভুলতে পারিনি।”
ফারিয়ার চোখে হালকা পানি জমে উঠল।
সে দ্রুত চোখ মুছে ডায়েরিটা বন্ধ করে ফেলল।
ডায়েরিটা বুকের কাছে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল,
—“জাহিদ ভাই... আপনি কি সত্যিই আমাকে ভুলে গেছেন?”
অন্যদিকে ঠিক সেই রাতেই জাহিদও একা বসে ফোনের গ্যালারি খুলল।
পুরোনো একটা ছবির সামনে এসে তার আঙুল থেমে গেল।
ফারিয়ার ছবি।
জাহিদ ছবিটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—“ভুলে গেছি?”
তারপর মাথা নাড়িয়ে আস্তে করে বলল,
—“না, পুতুল। তোকে ভুলে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না।”
কিন্তু তাদের দুজনের কেউই জানত না—
খুব শিগগিরই এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে, যা দুই বছর ধরে দূরে থাকা এই দুজন মানুষকে আবার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে।
আর সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক গভীর রহস্য...
চলবে…