ফন্ট সাইজ:
থিম:
অন্তহীন প্রেম আমার

২১তম পর্ব

লেখক: Afifa Afnan

#অন্তহীন_প্রেম_আমার

#আফীফা_আফনান

#পর্ব_২০ (ক)

[কপি করা নিষিদ্ধ]

"আমার প্রিয় স্নিগ্ধপ্রিয়া,

​প্রতিবারের ন্যায় আজো সর্বপ্রথম আমার হৃদয়স্পর্শী ভালোবাসা গ্রহণ করো। তোমাকে 'তুমি' বলে সম্বোধনের স্পর্ধা দেখানোর জন্য আমি ক্ষমা চাইব না। কারণ, 'তুমি' শব্দটাই ভালোবাসা প্রকাশের সবচাইতে মধুর ও জোরালো মাধ্যম। আশা করি তুমি অভিমান করবে না; আর করলেই বা কী, আমি তো তোমার ধরাছোঁয়ার বাইরে! আমি জানি তুমি ভালো আছো, তোমাকে যে ভালো থাকতেই হবে। তোমার ভালো থাকাই যে ধরণীর বুকে কোনো এক অপার্থিব মানবের বেঁচে থাকার কারণ।

​হয়তো এই চিঠির প্রতিটি শব্দ তোমার কাছে একরাশ বিস্ময় নিয়ে পৌঁছাবে। সেই সাথে প্রতিবারের ন্যায় আজো তা প্রত্যাখ্যান হবে। তুমি বরাবরের মতোই নিঃশব্দে খুব মনোযোগ সহকারে চিঠিখানা পড়বে, এর পরেই আবার হৃদয়হীন রমণীর মতোই তা ছুঁড়ে ফেলবে—পড়ে থাকবে কোনো নর্দমায় অথবা ডাস্টবিনের কোণে। ভাবছ তো, এসব কীভাবে জানলাম? কে এই মানুষটি, যে তোমার অগোচরে তোমাকে নিয়ে এত গভীর পঙক্তিমালা সাজায়? বলব না, জানতে চেয়ো না মেয়ে। কিছু জিনিস অজানাতেই সুন্দর। তবে শুনে রাখো, আমি তোমার চারপাশের কোলাহলে মিশে থাকা এক নিঃশব্দ ছায়া। যে তোমাকে দেখে, তোমাকে অনুভব করে, কিন্তু তোমার সামনে আসার স্পর্ধা রাখে না। এই জগতের দলিলে আমার কোনো নাম তোমার চেনা নেই, তবে এই চিঠির শেষে আমি আমার এক কাল্পনিক পরিচয় রেখে গেলাম—সাজিয়ে নিয়ো নিজের মনের মাধুর্য দিয়ে।

​স্নিগ্ধপ্রিয়া, তুমি কি জানো? তোমার চোখের ওই অবাধ্য চাউনিতে যে জেদ মিশে থাকে, তা দেখার জন্য আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে পারি। তোমার হাসি যেন শরতের মেঘমুক্ত আকাশে এক ফালি রোদের ঝিলিক। যখন তুমি অভিমান করে মুখ ভার করো, তখন আমার পুরো পৃথিবীটা যেন নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তোমাকে ভালোবাসা হয়তো আমার অধিকার নয়, কিন্তু তোমাকে দূর থেকে ভালোবেসে যাওয়াটা আমার অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমার এই ভালোবাসা কোনো দাবি রাখে না, শুধু চায় তুমি তোমার আপন মহিমায় বিকশিত হও।

​শোনো মেয়ে, জীবনটা সবসময় মসৃণ হবে না। অনেক সময় মনে হবে তুমি পথ হারিয়ে ফেলেছ, চারদিকের মানুষগুলো তোমাকে ছোট করার চেষ্টা করবে। কিন্তু মনে রেখো, তুমি এক অজেয় শক্তির নাম। তোমার পড়াশোনা, তোমার জ্ঞানই হবে তোমার আসল ঢাল। পৃথিবীর কাছে কখনো মাথা নত করবে না। মনে রেখো, তুমি কোনো সাধারণ রমণী নও; তুমি আগুনের গোলার মতো তেজস্বিনী, আবার ভোরের শিশিরের মতো স্নিগ্ধ। নিজের স্বপ্নগুলোকে ডানা মেলতে দাও, আকাশ ছোঁয়ার নেশায় মত্ত হও। আমি জানি, তুমি পারবে।

​স্নিগ্ধপ্রিয়া, তোমার জীবনে আমার আগমন এক অন্ধকার রজনীর ছায়ার মতো। ছায়া যেমন দেহ থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়, তেমনই তোমাকে ভুলে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার হৃদয়ের গহীনে উঁকি দেওয়া একমাত্র প্রতিচ্ছবি তুমি, যা চাইলেও মুছবে না। কখনো যদি খুব একা লাগে, তবে আকাশের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসি দিও। জেনো, সেই হাসির আড়ালে কেউ একজন তোমার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসের ভার ভাগ করে নিচ্ছে। তোমার প্রতিটি জয় আমার জন্য পরম তৃপ্তির। তোমার সাফল্যে যখন পৃথিবী মুখরিত হবে, তখন ভিড়ের একদম শেষ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা অস্পষ্ট লোকটির চোখের কোণে যদি এক ফোঁটা জল দেখো, চিনে নিও—সে আমি।

​নিজের লক্ষ্য ভুলো না। সামনে এগিয়ে যাও, আমি ছায়া হয়ে তোমার সাথে আছি। তোমাকে পাওয়ার কোনো বাসনা নেই, শুধু তোমাকে ভালো রাখার এক অনন্ত প্রার্থনা আছে। কারণ, পৃথিবীটা যে তোমার অপেক্ষায়।

​ইতি,

তোমার গোপন অনুরাগী,

কাসাফাদ্দৌজা আশিক"

~~~~

​রুহি চুপচাপ চিঠিটির প্রতিটি শব্দ নিঃশব্দে অবলোকন করছে। এমন আবেগপ্রবণ চিঠির প্রতিটি ছত্র যেন তার হৃদপিণ্ডকে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিয়েছে। তবে এই চিঠি প্রাপ্তি তার জন্য নতুন কিছু নয়। এই অজানার চিঠির যাত্রা শুরু হয়েছিল আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগে। সেদিন আজকের মতো বৃষ্টির কোনো রেশ ছিল না, কিন্তু ছিল বসন্তের এক মনোরম বিকেল। দশম শ্রেণীর টেস্ট পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় হুট করেই তার স্কুল ব্যাগের ওপর প্রথম চিঠিখানা খুঁজে পেয়েছিল সে। রুহি ছিল গার্লস স্কাউটের সদস্য, তাই সেদিন স্কুলের এক বিশেষ অনুষ্ঠানে ব্যাগ বাইরে রেখেই স্কাউটের কাজে চলে গিয়েছিল।কাজ শেষে বাড়ি ফেরার জন্য ব্যাগ নিতে ফিরে এসে অবাক হয়ে দেখেছিল সাদা কাগজের ওই অদ্ভুত সুন্দর চিঠিটি।

​প্রথম প্রথম রুহির কাছে এগুলো বেশ রোমাঞ্চকর লাগত। কিন্তু সে ছিল বরাবরই কাঠখোট্টা স্বভাবের; চিঠিগুলো পড়ে অবহেলার সাথেই সে ফেলে দিত পাশের কোন ডাস্টবিনে বা নর্দমায়। বলতে গেলে গত তিন বছর ধরে প্রতি শনিবার নিয়ম করে চিঠি আসত তার জন্য । কিন্তু হঠাৎ মাস ছয়েক আগে তা বন্ধ হয়ে যায়। আজ সেই বিরতির পর পুনরায় চিঠি দেখে রুহি কিছুটা বিস্ময়ে ফেটে পড়েছে। মস্তিস্ক বলছে বরাবরের মতো চিঠিটি ছিঁড়ে ফেল রুহি, কিন্তু মন যেন এক অদৃশ্য বাধার দেওয়াল তুলে বলছে—'চিঠিটা খুব যত্ন করে রেখে দে, দেখবি এই অনুপ্রেরণাই তোকে লক্ষ্যে পৌঁছাবে।'

​রুহি যখন মন আর মস্তিস্কের এই দ্বন্দ্বে ব্যস্ত, তখনই তার হাত থেকে ছোঁ মেরে চিঠিটি কেড়ে নিল বিন্তি। বর্তমানে তারা দুই বান্ধবী একটি কফি শপে গরম কফিতে চুমুক দিচ্ছিল। ছোঁয়া আর পড়শীকে বিদায় দিয়ে ফেরার পথে প্রবল বৃষ্টির পাল্লায় পড়ে তারা এখানে আশ্রয় নেয়। কফি শপে ঢুকে হাত ধোয়ার জন্য দুই বান্ধবীই বেসিনে গিয়েছিলো, সেখান থেকে ফিরে রুহি হঠাৎ খেয়াল করল তার সাইড পকেটের চেইনটা খোলা। চেইন খোলা কিছু পরে গিয়েছে কিনা তা দেখতেই কৌতূহলী হয়ে হাত ঢোকাতেই স্পর্শ পেল সেই হালকা গোলাপি রঙের সুগন্ধি কাগজের যা বর্তমানে বিন্তির হাতে।

​বিন্তি চিঠিটি পড়ে অবাক চোখে রুহির দিকে তাকিয়ে বলে, "মজনু আশিকটা তো দেখছি আবারও তোকে চিঠি পাঠিয়েছে! তার ওপর সে এও জানে যে তুই চিঠি পড়েই তা ফেলে দিস।"

বিন্তির কথায় ​রুহি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবুক হয়ে বলে, "হুমমম, সেটাই তো দেখছি। এই লোক কি আমাদের স্টক করে নাকি? তা না হলে আমি যে চিঠি যেখানে-সেখানে ফেলি, উনার তো জানার কথা না! তাহলে লোকটা কি আমাদের পরিচিত বা কাছের কেউ।"

রুহি ও বিন্তি ​উভয়ই কিছুক্ষণ গভীর ভাবনায় ডুবে রইল। অতঃপর রুহি নিজের মনের দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বলল, "নাহ, বাদ দে। ওসব ভাবতে ভালো লাগছে না। নিজের জীবনেই মানসিক শান্তি নেই, তার ওপর উল্টা-পাল্টা টেনশন। যেই হবে, যাই হবে দেখা যাবে।"

​রুহির কথায় বিন্তি মাএ চিঠিটা ডাস্টবিনে ফেলার উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়েছিলো

ঠিক তখনই রুহি তাকে থামিয়ে দিল— "ফেলিস না, এটা আমাকে দে।"

​রুহি অবাক হয়ে বলল, "কেন রে তুই কি এটা রেখে দিতে চাইছিস?"

"হুম।" রুহির ক্ষুদ্র পরিসরে জবাব।

"কিন্তু আগের সব তো ফেলে দিতিস, তাহলে এটা রাখবি কেন!" বিন্তির উৎসুক প্রশ্ন।

​রুহি এবার বিন্তির চোখে চোখ রেখে শান্ত স্বরে বলল, "আগেরগুলো রাখতে মন চায়নি বিন্তি, কিন্তু এটা ফেলতে মন সায় দিচ্ছে না। দেখ না, কতটা আবেগ দিয়ে লেখা এই চিঠিখানা। যে লিখেছে, সে কতটা সময় অপচয় করে কতটা যত্নে শব্দগুলো সাজিয়েছে। সে যেই হোক, তার প্রতি ভালোবাসা বা ভালোলাগা না-ই থাকলো, কিন্তু তার চিন্তাভাবনার প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ তো এটা আমার কাছে রাখতেই পারি।"

রুহির কথায় বিন্তি আর কিছু বললো না শুধু মুচকি হাসলো। বাহিরে যখন বৃষ্টি, ঠিক তখন কফি শপের এক কোণে রুহি সযত্নে সেই রহস্যময় চিঠিটি নিজের ব্যাগে পুরে নিল।

★★★

কলেজ প্রাঙ্গণে বিন্তি ও ছোঁয়ার সেই বিস্ফোরক মন্তব্য—আর কফি শপে পাওয়া কাসাফাদ্দৌজা আশিকের সেই আবেগঘন চিঠি; সব মিলিয়ে রুহির মনের ভেতর এখন এক প্রলয়ংকরী ঝড় বয়ে যাচ্ছে। একদিকে অজানার প্রতি এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা, অন্যদিকে শাহাজ ভাইয়ের প্রতি মনের অবচেতন কোণে জমে থাকা সেই মায়াবী টান। বৃষ্টির ঝাপটা কমে এলেও রুহির মনের আকাশটা এখনো ঘন মেঘে ঢাকা। একরাশ অস্থিরতা আর অসংলগ্ন চিন্তা সঙ্গী করে রুহি যখন বাড়ির গেটে এসে পৌঁছাল, তখনো সে ঘোরের মধ্যে।

​গেট দিয়ে ভেতরে পা রাখতেই ভেতর থেকে ভেসে আসা আনন্দঘন হৈ-হুল্লোড় আর হাসাহাসির শব্দে রুহির ধ্যান ভাঙ্গলো, সে থমকে দাঁড়াল। বাড়ির থমথমে পরিবেশটা যেন এক নিমেষেই জাদুর ছোঁয়ায় বদলে গেছে। রুহির মনে এক তীব্র কৌতূহল দানা বাঁধল—কী এমন হলো যে বাড়িতে আজ এতো উৎসবের আমেজ লেগেছে?

এসব ভাবতে ভাবতেই রুহি ​দ্রুত পায়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই রুহির চোখ গিয়ে আটকাল ড্রয়িং রুমের সোফায়। সেখানে বসে আছেন তার অতি প্রিয় মানুষ, আসাদুজ্জামান। রুহির ঠোঁটজোড়া খুশিতে প্রসারিত হলো, দুশ্চিন্তার কালো মেঘ সরিয়ে তার মুখশ্রীতে চিকচিক করে উঠল এক চিলতে হাসি। খুশিতেই অস্ফুট স্বরে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো— "বাবা!"

​কিন্তু চমকের তখনো বাকি ছিল। রুহি ঘরের ভেতর প্রবেশ করেই চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে নিতেই তার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সোফায় শুধু তার বাবা বসে নেই, বাবার ঠিক পাশেই এক অত্যন্ত পরিচিত কিন্তু এই মুহূর্তে অবিশ্বাস্য এক চেহারা দৃশ্যমান! রুহি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। সে ভাবল হয়তো চোখের ভুল, তাই ভালো করে চোখ কচলে নিলো। একবার বন্ধ করল, আবার খুলল—না, কোনো ভুল নেই। শাহাজ! তার শাহাজ ভাই!

সোফায় আখতারুজ্জামান ও ​দাদি মমতাজ বেগমের গা ঘেঁষে বসে আছে শাহাজ। দাদি খুব মমতা আর পরম যত্নে নাতির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। আখতারুজ্জামান ও শাহাজকে ঘিরে আছে বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা—তানজিনা বেহম, নাসরিন বেগম, ইয়াসমিন বেগম, মুগ্ধ, রুবি, রুহি পিয়াস সবাই। শুধু বড় আব্বু মোস্তফা কামাল আর মেজো আব্বু শাহরিয়ার কবির এখনো বাড়িতে ফেরেননি আর কাব্য শহরের বাহিরে। পুরো খন্দকার বাড়িটা যেন আজ এক উৎসবের সাজে সেজেছে। সবার মুখে আনন্দের ঝিলিক, আর রুহি দরজায় দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে আছে। যে মানুষটিকে নিয়ে সারাদিন মনে মনে যুদ্ধের শেষ ছিল না, সেই মানুষটিই এখন তার চোখের সামনে, তাদের বাড়িতে! রুহির সমস্ত কৌতূহল আর ক্লান্তি যেন এক মুহূর্তেই শাহাজের ওই শান্ত শীতল উপস্থিতিতে বিলীন হয়ে গেল।

এদিকে রুহি ভেতরে প্রবেশ করতেই আসাদুজ্জামান সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। প্রিয় বাবার হাসিমুখটা দেখামাত্রই রুহির সমস্ত ক্লান্তি আর মনের ভেতর জমে থাকা মেঘ যেন এক নিমেষেই কর্পূরের মতো উবে গেল। আসাদুজ্জামান দুই হাত প্রসারিত করে দিতেই রুহি এক দৌড়ে গিয়ে বাবার বুকে মুখ লুকাল। আসাদুজ্জামান পরম মমতায় মেয়েকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। রুহির মনে হলো, সারা দুনিয়ার সবটুকু আশ্রয় যেন এই একটি বুকেই লুকিয়ে আছে। বাবা-মেয়ের এই নিঃশব্দ ভালোবাসার দৃশ্যটি ড্রয়িং রুমের আবহে এক পশলা শীতল বৃষ্টির মতো শান্তি ছড়িয়ে দিল।

তখনই ​তানজিনা বেগম পাশে দাঁড়িয়ে হেসে বললেন, "অনেক হয়েছে বাবা-মেয়ের আদর, এবার খাবারের পালা। রুহি তুই রুমে গিয়ে জলদি ফ্রেশ হয়ে আয়। দুপুরে খাওয়ার সময় হয়েছে তো মা ।"

বড় ​মায়ের কথা মতো রুহি দ্রুত পায়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। মনের ভেতর তার তখনো একরাশ প্রশ্ন—শাহাজ ভাই এখানে কীভাবে? রুহি কোন মতে ফ্রেশ হয়ে চেঞ্জ করে নিয়ে যখন সে নিচে নামল, ততক্ষণে ডাইনিং টেবিলে দুপুরের খাবার পরিবেশন করা হয়েছে। আসাদুজ্জামান আজ খুব তৃপ্তি নিয়ে নিজের সন্তানদের পাশে বসিয়ে নিজ হাতে বেড়ে খাওয়াচ্ছেন। শাহাজও তার পাশে সেই টেবিলেই বসা।

খেতে খেতেই রুহি ​শাহাজের দিকে তাকালো কিন্তু সে আবারও শাহাজের মুখমন্ডলে সেই চিরচেনা গাম্ভীর্যের দেয়াল দেখতে পেল। শাহাজ একদম স্বাভাবিক, তার সেই গম্ভীর পার্সোনালিটি যেন প্রতিটি পরতে পরতে ফুটে উঠছে। সে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে খাবার খাচ্ছে, যেন অনিকের ফ্ল্যাটে রুহির সাথে ঘটে যাওয়া সেই রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলোর কোনো অস্তিত্বই তার কাছে নেই।

অন্যদিকে রুহি খেতে খেতেই আড়চোখে কয়েকবার শাহাজের দিকে তাকালো, মনে মনে আশা করল শাহাজ হয়তো অন্তত একবার তার দিকে তাকাবে। কিন্তু শাহাজ একটিবারের জন্যও নজর তুলে রুহির দিকে দেখল না। তার নির্বিকার মনোভাব দেখে রুহি বেশ অবাক হলো এবং মনে মনে ভাবল—"ছোঁয়া আর বিন্তি সব ভুল বলেছে। কই, শাহাজ ভাইয়ের মনে তো কোনো ভাবান্তর নেই! সব আমার মনের ভুল।"

​নিজের ওপর কিছুটা বিরক্ত হয়ে রুহি যখন অন্যদিকে দৃষ্টি সরালো, হঠাৎ তার চোখ গিয়ে পড়ল পিয়াসের দিকে। রুহি দেখল, পিয়াস খাবারের থালা সামনে নিয়ে একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তার সেই লোলুপ চাউনি দেখে রুহির গা রি রি করে উঠল। সে সাথে সাথেই মুখ ভেংচি কেটে চরম অবজ্ঞায় পিয়াসের দিক থেকে নজর সরিয়ে নিল। শাহাজের শীতল গাম্ভীর্য আর পিয়াসের এই অদ্ভুত চাউনির মাঝে রুহি যেন এক অদ্ভুত অস্বস্তিতে ডুবে রইল।

★★★

বিকেলের আকাশটা আজ অদ্ভুত সুন্দর, মনোরম এক স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে আছে চারদিকে। শাহাজ প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে খন্দকার বাড়ির ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সুদূরের কোনো এক অজানা দিগন্তে নিবদ্ধ। মৃদু বাতাসে তার অবাধ্য চুলগুলো কপালে এসে পড়ছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

​হঠাৎ নীরবতা ভেঙে শাহাজের পিঠে একটি চেনা হাতের স্পর্শ পড়ল। শাহাজ পাশ ফিরতেই দেখল সেজো আব্বু আসাদুজ্জামান তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। দুজনের দৃষ্টি যখন একসাথে মিলিত হলো, ঠিক তখনই আসাদুজ্জামান ঠোঁটের কোণে এক টুকরো রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে তুললেন।

তা দেখেই শাহাজ এবার গম্ভীর গলায় বলে উঠল, "আমার দুর্বলতা জেনে আমাকেই ব্ল্যাকমেইল করে এখানে নিয়ে এলে, তার ওপর আবার হাসছ? এটা তো ঠিক না সেজো আব্বু।"

​আসাদুজ্জামান প্রাণখুলে হাসলেন, যেন শাহাজের অসহায়ত্বে তিনি বেশ মজা পেয়েছেন। অতপর শাহাজের পিঠে স্নেহভরে চাপড় দিয়ে বলে উঠলেন, "ওই একটাই তো দুর্বলতা যার মাধ্যমে তোকে কাবু করা সম্ভব। নাহলে তোকে সহজে বাগে আনা কি আর চারটেখানি কথা?"

​শাহাজ তার স্বাভাবিক গম্ভীর কণ্ঠে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, "তাহলে তুমিও শেষমেশ ঘরের শত্রু বিভীষণের মতো আচরণ করছ?"

​"হ্যাঁ, শত্রু ভাবতেই পারিস, ভাবতে তো আর টাকা লাগে না। তবে আমি কিন্তু আমার কথা থেকে নড়ছি না। কার্য হাসিল করতে হলে আমার শর্ত তোকে মানতেই হবে," আসাদুজ্জামানের কণ্ঠে এবার কিছুটা দৃঢ়তা।

​শাহাজ এবার অকপটে উত্তর দিল, "তাহলে আগে তোমার ভাইকে বলো। উনি যদি রাজি থাকেন, তবেই আমি তোমার শর্ত মানবো, তার আগে নয়।"

​কথাটি শেষ করে দুজনেই আবার সামনের ওই ধূসর দিগন্তের দিকে তাকালেন। কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভেঙে আসাদুজ্জামান চশমাটা ঠিক করতে করতে প্রশ্ন করলেন, "ভালোবাসিস ওকে?"

​শাহাজের কোনো দ্বিধা নেই, এক মুহূর্ত সময় না নিয়ে সহজ স্বীকারোক্তি দিল, " খুব !"

​ আসাদুজ্জামান শাহাজের দিকে তাকিয়ে খুব আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "কতটুকু ভালোবাসিস?"

​শাহাজ এক মুহূর্ত থামল, তারপর নিজের চিরাচরিত স্বভাব বজায় রেখে গভীর স্বরে বলে উঠলো, "নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসি এটা কখনো বলব না। কারণ যে মানুষ নিজেকেই ভালোবাসতে জানে না, সে অন্যকে কীভাবে ভালোবাসবে বলো? তবে হ্যাঁ, ওকে ছাড়া এখন নিঃশ্বাস নিতেও আমার বড় কষ্ট হয় সেজো আব্বু।"

​আসাদুজ্জামান আবারও হাসলেন। শাহাজের এই স্বচ্ছ অভিব্যক্তি তার বেশ ভালো লাগল। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, "তা বলেছিস ওকে?

জানিয়েছিস নিজের মনের কথা?"

​"নাহ।"

​"তো না জানিয়ে ওভাবে বসে থাক ! পরে মাঝখান থেকে অন্য কেউ ওকে নিয়ে যাক?" আসাদুজ্জামানের বিদ্রুপের সাথে বলা কথা।

​শাহাজ এবার আসাদুজ্জামানের দিকে তাকিয়ে হালকা করে একটু হাসল। পরক্ষণেই আবার সামনে দৃষ্টি ফিরিয়ে অত্যন্ত আভিজাত্যপূর্ণ আর শিতল কণ্ঠে সুধালো, "আমার জিনিস সবসময় আমারই থাকে। শাহাজাদা মোস্তফা সর্বদা তার প্রিয় বস্তু সামলে রাখতে জানে। শাহাজ চায় বলেই তার জীবন এখনো স্বাভাবিক সবার কাছে উন্মুক্ত, কিন্তু যেদিন থেকে শাহাজ চাইবে না সেদিন থেকেই সে হবে একান্ত আমার সম্পত্তি ।"

​আসাদুজ্জামান শাহাজের এমন আত্মবিশ্বাস দেখে অবাক হয়ে বললেন, "তা তো বুঝলাম, কিন্তু তোর জানানোর আগেই যদি ওর মনে অন্য কারো জন্য অনুভূতির জন্ম নেয়? তখন কি চাইলেও তুই সবটা ঠিক করতে পারবি। তখন কিন্তু আমারও কিছু করার থাকবে না।"

​শাহাজ এবার স্থির দৃষ্টিতে আসাদুজ্জামানের দিকে তাকালো। তার চোখে-মুখে এক অন্যরকম দ্যুতি ফুটে উঠেছ। বজ্রকঠিন আর প্রবল আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে সে বলল, "হ্যাঁ, অনুভূতি জন্ম নিবে। কিন্তু তা কেবল আর কেবল মাত্র আমার জন্যই হবে। ওর প্রতিটি অনুভূতি, প্রতিটি অনুভব, ভালো লাগা আর খারাপ লাগা—সবটুকুই হবে শুধু আমার জন্য। ওর রন্ধ্রে রন্ধ্রে কেবল আমারই অস্তিত্ব মিশে থাকবে। শুধু মাএ এই শাহাজাদা মোস্তাফার।"

​আসাদুজ্জামান একদৃষ্টিতে শাহাজকে অবলোকন করতে লাগলেন। এমন এক দৃঢ়চেতা, আত্মবিশ্বাসী আর সাহসী শাহাজকেই তিনি আজীবন দেখে এসেছেন এবং দেখতে চেয়েছেন। শাহাজের এই অদম্য ব্যক্তিত্ব দেখে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক প্রশান্তির হাসি। তিনি বুঝতে পারলেন, শাহাজ তার লক্ষ্য অর্জনে কতটা অটল। অতপর তিনি বলে ওঠেন, "ঠিকাছে তাহলে আমিও প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করি কি বলিস!"

আসাদুজ্জামানের কথায় শাহাজ হাসলো, এক প্রশান্তিময় সেই হাসি যাতে লুকিয়ে আছে অগাধ ভালোবাসার পরশ ও একপশলা রহস্যের তরঙ্গ ।

চলবে________

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন