#এক_মুঠো_অপূর্নতা পর্বঃ৬
#ফাতেমা_তুজ_জোহরা
পেসে*ন্টের জ্ঞান ফিরেছে…. কথাটা বলল নার্স সবার উদ্দেশ্য। রাশেদ আর ইসরাত দৌড়ে গিয়ে একসাথে জিজ্ঞেস করলো আমার মেয়ে ঠিক আছে?
নার্স স্মিত হেঁসে বলল," আপনাদের মেয়ে ঠিক আছে। বাট রিপোর্ট গুলো পেতে দেরি হবে বলেই চলে গেল । রাশেদ আর ইসরাত সমস্বরে বলল আলহামদুলিল্লাহ বলেই কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল। রাশেদ আর ইসরাতের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রোকেয়া বেগম বলল, " আমি হয়তো অনেক পূর্ন্য করেছিলাম রবিন তার কারনে রাশেদ কে আমার সন্তান হিসেবে পেয়েছিলাম " কথাটুকু বলতে গিয়ে রোকেয়ার চো**খ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। রবিন এগিয়ে এসে তার মায়ের কাঁধজোড়া আকড়ে বলল," তুমি ঠিক বলেছো মা। আমি রাশেদ আর ইসরাত কে দেখি তত অবাক হই। মা বাবা না হয়ে ও রুশমিতার জন্য তাদের ভালোবাসা আমাকে বিমোহিত করে মা। আর দেখো যার মেয়ে তার হুঁশ নেই" কথাটুকু বলে রবিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোকেয়া বেগম কে নিয়ে চললো রুশমিতার কেবিনের দিকে।
রুশমিতা চোখ দুটো খোলা রেখে একদৃষ্টিতে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে ।চো**খের কার্নিশ দিয়ে পানি গড়িয়ে বালিশে পড়ছে। রুশমিতাকে দেখে একটা জীবন্ত কাঠের পুতুলের মতো মনে হচ্ছে।একদম স্থির ভাবে একদিকে তাকিয়ে মেয়েটা। সপ্তদশী কন্যাকে দেখে বুঝা যাচ্ছে ভেতর থেকে ভে**ঙে গু*ড়িয়ে গেছে। চোখ গুলোর নিচে কালি পড়ে গেছে, মুখটা দেখে মনে হচ্ছে কেউ তার শরীর থেকে র**ক্ত শুষে ফ্যাকাশে করে দিয়েছে। সপ্তদশীর চোখের সামনে তার ভালোবাসার মানুষটার প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠছে। একমাস আগেও মানুষটা তাকে কত আশা দিয়ে বলেছিলো তাকে তাকে ছাড়া সে বাঁচতে পারবে না। তাকে নিয়ে চলে যাবে অনেকদূরে যেখানে তাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না। কথাগুলো ভেবে সপ্তাদশীর ঠোঁটে ফুটে উঠলো ত্যাচ্ছিল্যর হাসি,আর চো**খ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো অবিরাম নোনা ধারা।
তাকে ভালোবাসেনি ইয়াশ। তাকে ঠ*কি*য়ে তার বোন কে বিয়ে করছে।সাজেকে দুইদিন পুতুল খেলা খেলেছে। সে ভেবেছে তাকে কত ভালোবাসে। কিন্তু এটা বুঝতে পারেনি বোবা মেয়েদের কেউ ভালোবাসে না। সবাই শুধু সুযোগের স*ৎ ব্যবহার করে। যেমন টা তার সাথে ইয়াশ করলো। তার শরীর মনটাকে নিজের দখলে করে তাকে ছু**ড়ে ফেললো অমানিশার অন্ধকার গহ্বরে যেখান থেকে বের হওয়ার কোন পথ নেই। চারদিকে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার তাকে গ্রাস করছে। রুশমিতা কথা গুলো ভেবে তার বুকের ভেতর টা অস্থির হয়ে গেল। সে শক্তি দিয়ে হাতের ক্যা*নুলা টেনে খুলতে হাত থেকে ছিটকে র**ক্ত বেরিয়ে এলো। আশ্চর্য আজকে যেন মেয়েটি ব্যা*থা অনুভব করতে পারলো না এতটুকু। যে মেয়েটা একটু ব্যা*থা পেলে সারাদিন ইসরাতের আঁচলের নিচে মুখ লুকিয়ে কাঁ*দে, আজকে সে মেয়েটা যেন রোবটে পরিনত হয়েছে। না আছে দুঃখ,না আছে সুখ, না আছে কোন প্রকার অনুভূতি।
রুশমিতা বেড থেকে নামতেই তার মাথা ঘু*রে উঠলো তবুও অষ্টাদশীর পায়ের গতি কমলো না। এগিয়ে গেল সামনের দিকে। কিন্তু ওই যে বলে না জোর করে কিছু হয় না। তেমনই রুশমিতার জোড় করে হাঁটতে গিয়ে মেয়েটা পায়ের সাথে পা বেড়ি দিয়ে ধপ করে নিচে পড়ার আগে ইসরাত আর রাশেদ ধরে নেয়।
ইসরাত রুশমিতাকে বুকে আগলে ধরে অস্থির গলায় বলল," কি হয়েছে আম্মু. তুমি বেড থেকে কেন নিচে নামলে " কথাগুলো বলতে গিয়ে ইসরাতের গলাটা জড়িয়ে আসছে কা*ন্না*য়।
রাশেদের রুশমিতার হাতের দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে গেল। ডান হাত দিয়ে টপটপ করে র**ক্ত গড়িয়ে পড়ছে ফ্লোরে। রাশেদ আ*র্ত*না*দ করে বলল," ইসরাত র**ক্ত বের হচ্ছে হাত দিয়ে? বলেই পকেট থেকে রুমাল বের করে হাতটকে আলতো ভাবে চেপে ধরে।
রুশমিতা কোনকিছু বলছে না। সে ইসরাতের বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে আছে। কোনদিকে কোন খেয়াল নেই।
ইসরাত বলল," ওকে ধরে বেডে নিয়ে চলুন? রাশেদ এক মুহূর্ত দেরি করলো রুশমিতাকে কোলে নিয়ে বেডে শুয়েই দিলো। রুশমিতা এবার পিটপিট করে চো*খ খুলে রাশেদের দিকে তাকায়। তার চো*খ দিয়ে নোনা পানি গড়িয়ে পড়ছে। রাশেদ নিচু হয়ে রুশমিতার চোখের পানি গুলো মুছে বলল," কি হয়েছে আমার আম্মা ? কোথায় ক*ষ্ট হচ্ছে বলো মেজো আব্বুকে?
রুশমিতা একহাত বাড়িয়ে রাশেদের ডান হাতটা আকড়ে ধরে ডু*ক*রে কেঁ**দে উঠল। তার কা*ন্না*র কোন শব্দ হলো না। থেকে গেল চার দেয়ালের মধ্যে। ইসরাত রুশমিতার কা*ন্না দেখে সে ও কেঁ*দে উঠলো শব্দ করে। সে এগিয়ে গিয়ে ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বলল, " কি হয়েছে মা? মাকে বল!
রুশমিতা এখনো হাত ধরে কেঁ**দেই যাচ্ছে। কি করে বলবে এত বড় কথা তাদের লু*কিয়ে সে অন্য জায়গায় বিয়ে করেছে। আবার সেই স্বামী তাকে ত্যাগ করে তার বড় বোনকে পাত্র হিসেবে দেখতে এসেছে । তাহলে তার মেজো আব্বু আর আম্মু স*হ্য করতে পারবে না। তারা অনেক পাবে এগুলো শুনলে। রুশমিতা কাঁ*দ*তে কাঁ*দ*তে মাথা ঝাকিয়ে বোঝালো তার কিছু হয়নি সে ঠিক আছে।
ইসরাত কা*ন্না*ভেজা গলায় বলল," তুমি এখানেই থাকবে নাকি ডাক্তার ডেকে আনবে মেয়েটা কত ক*ষ্ট পাচ্ছে দেখতে পাওনা।
রাশেদ রুশমিতার থেকে হাতটা ছাড়িয়ে তাড়াতাড়ি করে কেবিন থেকে বের হতেই দেখলো রবিন আর রোকেয়া বেগম কেবিনে প্রবেশ করছে। রাশেদ কোনপ্রকার বাক্যবায় না করে এগিয়ে গেল সামনে।
রবিন আর রোকেয়া কেবিনে প্রবেশ করে দেখলো। ইসরাত বুকে মাথা রেখে রুশমিতা শুয়ে ফোঁপাচ্ছে চোখ বন্ধ করে।
রোকেয়া এগিয়ে যেতে বলল," আমার দাদুভাই কেমন আছে বৌমা?
ইসরাত আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বলল," ভালো আছে আম্মা?
রুশমিতা চোখ খুললো না সে ইসরাতের কোমড় জড়িয়ে বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে আছে। মনের মধ্যে তার ইয়াশের দেওয়া তি*ক্ত স্মৃতি গুলো ভেসে উঠছে । রোকেয়া রুশমিতার গা ঘেঁষে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।
রবিন এগিয়ে গিয়ে একটা টুল টেনে বসলো। চোখ দুটো নিবদ্ধ রুশমিতার ফ্যাকাশে মুখাবয়বের দিকে।
*******
ইয়াশ তার ঘরে প্রতিটা জিনিস ভে*ঙে চূর্নবিচূন করছে। আরবিন ভিলা থেমে কেঁপে কেঁপে উঠছে তার ভা*ঙ*চুরের শব্দ।শার্ট, স্যুট হাতের ঘড়ি সব নিচে অব**হেলিত হয়ে পড়ে আছে। আর ইয়াশের পরনে শুধু কালো প্যান্ট। দুইহাত দিয়ে র**ক্ত গড়িয়ে পুরো ফ্লোর রঙিয়ে উঠেছে লা*ল রঙে। ইয়াশের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই সে তো মেতে উঠেছে তা*ন্ড*ব লিলায়। তার কানের কাছে কবিরের কথা গুলো থেকে থেকে বেজে উঠছে। নিজেকে তার পা*গল পা*গল লাগছে। রা*গে ক্ষো**ভে পাশ থেকে একটা ফুলদানি তুলে নিজের মাথাতে মে*রে দেয়। কপাল ফুঁ*ড়ে বেরিয়ে এলো উষ্ণ র**ক্ত ছড়িয়ে গেল পুরো উদম শরীরে। তবুও যুবক থেমে নেই আরেকটা মা**র*তে নিলেই পেছন থেকে কেউ তার ফুলদানি টাকে শক্ত করে আকড়ে ধরলো। ইয়াশ পেছন ফিরে অস্ফুটে স্বরে বলল," মা মামুনি!
সামনে মেয়েটার পরনে লাল পাড়ের জামদানি শাড়ী। শরীর ভর্তি গয়না। মুখে গম্ভীর ভাব বিদ্যমান। চুল গুলো পেছনে খোঁপা করে গয়না দিয়ে আটকানো আছে। তার দিকে তাকালে আপানাআপনি ভেতর থেকে আগের যুগের রানী রানী ফিল হয়ে আসবে। মেয়েটি ফুলদানিটা একঝটকায় কেড়ে নিয়ে বলল,'" তোমাকে এমন শিক্ষা দেয়নি ইয়াশ?কিয়তক্ষন থেমে বলল," শ*ত্রু*র সাথে লড়াই করতে নেমে শ*ত্রু*র প্রতি মায়া মমতা দেখাতে নেই ইয়াশ। নিজেকে শক্ত করো নাহলে তোমার বি*না*শ তুমি নিজ হাতে টেনে আনবে?
ইয়াশ কিছু বলল না। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলো একজায়গায়।
মেয়েটি ফুলদানিটাকে যত্ন করে টেবিলে সাজিয়ে মুখে মুচকি হাসি টেনে বলল," আমাকে আগে বলতে পারতে তুমি এখনো এই খেলার উপযুক্ত হওনি। তাহলে আমি অন্য কাউকে বলতাম। কিন্তু মাঝপথে এইভাবে খেলা রেখে পালিয়ে গেলে আমি বরদাস্ত করবো না মাই ডিয়ার " মেয়েটা কথাটাতে না ছিলে শান্তনা না ছিলো মমতা। তার কথায় বিদ্যমান ছিলো একপ্রকার হুমকি?
ইয়াশ মাথা নিচু করে একটা দাসের ন্যায় বলল," আমি মাঝপথে পালিয়ে আসিনি মামুনি। আমি ওই কায়সার ফ্যামেলিকে ধ্বং**স না করা অবধি শান্তি পাবো না?
মেয়েটি বাঁকা হেঁসে বলল," ঠিক আছে তাহলে শেষ করো এই খেলার অন্তিম পর্ব। যেভাবে ওরা আমাদের বাড়ির মেয়েকে মে**রে ফেলেছিলো সেভাবে তুমি ওদের বাড়ির মেয়েদের মৃ*ত্যু**র দিকে ঠেলে দাও। বুঝতে দাও ওদের মেয়ে হা*রা*নো*র য*ন্ত্র*ণা কতটা। যে য*ন্ত্র*ণা আমরা পেয়েছি তারা পাক " বলেই মেয়েটা হাসতে হাসতে বাইরে চলে গেল। তার এই হাসি বলে দিচ্ছে সামনে বড় বি*প*দ কায়সার দের।
ইয়াশ র**ক্ত মাখা ঠোঁটে ফুটে উঠলো ক্রুর হাসি। সে টলতে টলতে চলে গেল ওয়াশ রুমে। আর বিরবির করে বলল," শে*ষ হবে সবাই শে*ষ হবে!
******
আপনার মেয়ে চার সপ্তাহের প্রেগনেন্ট মিস্টার কায়সার।
ডাক্তারের কথাটা কেবিনে ভেতরে একটা বো**মে*র মতো পড়লো। রাশেদের পাহাড় সমান শরীরটা ভূমিকম্পের ন্যায় দুলে উঠলো এক লহমায়। মনে তার চারপাশ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে । চোখ দুটো আপনা আপনি আচানাক বড় বড় হয়ে গেল তার। সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে রইলো। এখানে কি রিয়েকশান দিবে সে বুঝতে পারলো না। তার মেয়ের এখনো বি*য়ে হয়নি, সেখানে প্রে*গ*নেন্ট কিভাবে সম্ভব। সে একভাবে তাকিয়ে রইলো ডাক্তারের দিকে।
ডাক্তার তার দিকে বাড়িয়ে দিলো আ*ল্ট্রা করার রিপোর্ট। রাশেদ কাঁ*পা কাঁ*পা হাত দিয়ে রিপোর্ট টাকে আকড়ে ধরে…...
#চলবে