ফন্ট সাইজ:
থিম:
সে ছিল আমার কল্পনায়

৮ম পর্ব

লেখক: নাবিলা আহমেদ সেহরিশ

#সে_ছিল_আমার_কল্পনায়

#পর্ব_৮
#লেখিকা_নাবিলা_আহমেদ সেহরিশ
​অভ্যুদয় বসে আছে খাবার টেবিলে। তাদের বাসায় একটা নিয়ম আছে, সবাই একসাথে রাতের ডিনার করে ঠিক রাত ৯টায়। অভ্যুদয় নিজের মনে খাবার খাচ্ছে, অনামিকা চৌধুরী মাঝেমধ্যে খাবার তুলে দিচ্ছেন ইকরামুল চৌধুরীর প্লেটে।
​“পড়াশোনা কেমন যাচ্ছে?" হঠাৎ করেই গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন ইকরামুল চৌধুরী।
​“জি, ভালো।"
​“কোনো কিছু আনতে হবে? প্রয়োজন থাকলে বলতে পারো, কাল জাপান যাচ্ছি আমি।" খাওয়া বন্ধ হলো অভ্যুদয়ের। নিজের প্লেটের দিকে চেয়ে থাকলো কিছুক্ষণ, কাল জাপান যাচ্ছেন আর এখন জানতে পারলো সে?
​“তোমার এসব নিয়ে টেনশন করতে হবে না। যা প্রয়োজন আমি এনে দিতে পারবো” অভ্যুদয় কিছু বলার আগেই বলে উঠলেন অনামিকা চৌধুরী।
​“ভালো করে পড়াশোনা করো। আমি চাই ইন্টারমিডিয়েট শেষ হলে তুমি লন্ডন বা জাপানে গিয়ে পড়াশোনা করো।" হুট করেই মনের মধ্যে খুশির জোয়ার জাগলো অভ্যুদয়ের। সে তো এটাই চেয়েছিলো, দূরে কোথাও চলে যাবে।
​“জি, আব্বু।” অভ্যুদয়ের কণ্ঠে থাকা আনন্দ এড়িয়ে গেল না অনামিকা চৌধুরী বা ইকরামুল চৌধুরীর কাছ থেকে।
​ডিনার শেষ করে এক প্রকার লাফাতে লাফাতে নিজের রুমে প্রবেশ করে অভ্যুদয়। আর মাত্র কয়েকটা মাস, কয়েক মাস পরেই তার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা। নিজের ওপর তার পুরো আত্মবিশ্বাস আছে, সে জানে সে অবশ্যই পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করবে।
​অভ্যুদয় গিয়ে দ্রুত পড়ার টেবিলে বসলো। মন ভালো থাকায় আজ ইচ্ছে করছে আরেকটু পড়তে। আজ ১০টা পর্যন্ত পড়বে সে। পড়া শুরু করে সে।
​“ঠক ঠক!”
​“কামিং!” দরজায় কড়া নাড়তেই উঠে গিয়ে দরজা খুলে অভ্যুদয়। বাইরে ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে আছেন অনামিকা চৌধুরী। ট্রে-তে দুধের গ্লাস। অভ্যুদয় কিছু বললো না, গ্লাসটা হাতে নিয়েই ঢকঢক করে এক নিশ্বাসে পুরো গ্লাস খালি করে দিল। খালি গ্লাস আবারও ট্রে-এর ওপরে রাখলো, বাম হাত দিয়ে মুখ মুছে ফেললো মুহূর্তেই।
​“কাল থেকে রাত ৯টায় আমার কলিগ আসবে, তোমাকে পড়াতে।" অভ্যুদয় অবাক হলো। তার তো সময়-ই নেই, সব সাবজেক্ট-ই পড়ছে সে। এমনকি বাংলার জন্যও টিচার রাখা। তাহলে তার মায়ের কলিগ আবার কী পড়াবে?
​“কিন্তু..."
​“একাডেমিক পড়াশোনা নয়, তোমার ইংলিশ স্পোকেনটা আরও বেশি নিখুঁত করতে।" অভ্যুদয় চুপ করে রইলো। সে ভালো করেই জানে এখানে কথা বলে লাভ নেই।
​“গুড নাইট।"
​“গুড নাইট, মা।” অভ্যুদয় উত্তর দিতেই অনামিকা চৌধুরী চলে গেলেন। দরজা বন্ধ করে দেয় অভ্যুদয়। তার মাঝেমধ্যে মনে হয় তার মতো এমন পোড়া কপাল আর কারো নেই, একটা দিনও আনন্দে সময় কাটাতে পারে না।
​দরজা বন্ধ করতেই অভ্যুদয়ের চোখ গিয়ে ঠেকলো টেবিলে থাকা বইয়ের দিকে। যেই বইটা একটু আগেও তার কাছে এতো ভালো লাগছিলো, তা দেখে এখন মেজাজ খারাপ হচ্ছে, ইচ্ছে করছে বইটা টেনে ছিঁড়ে ফেলতে। ক্ষিপ্ত অভ্যুদয় লাইট অফ করেই বিছানায় যায়। বিছানার পাশে থাকা মোবাইল নিতেই চোখ ঠেকলো নওশীনের আইডির দিকে। কোনো মেসেজ আসেনি, তবে স্টোরি দিয়েছে একটা। স্টোরিতে ক্লিক করলো সে। এক ঘণ্টা আগে ছবিটা দেওয়া হয়েছিলো।
​স্টোরিতে একটা ছেলের হাতের ছবি দেওয়া। ছবিতে শুধু ছেলের হাতের কবজির অংশ দেখা যাচ্ছে। তাতে স্পষ্ট ভেসে আছে হাতের রগগুলো। ওপরে ছোট করে লেখা—‘weakness😭'। অভ্যুদয় আবারও হাতটার দিকে তাকালো, এরকম শিরাযুক্ত হাত কারো দুর্বলতা হয় কীভাবে? মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে নিজের হাতের দিকে আলো ধরলো সে। তার হাতে থাকা শিরাগুলোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। পরক্ষণেই বেডসাইড ল্যাম্প জ্বালালো সে। ঘরটা মৃদু আলোয় আলোকিত হতেই নিজের হাত দেখিয়ে ছবি তুললো একটা।
​“এখানে weakness-এর কী আছে?" ছবিটা নওশীনকে পাঠিয়েই জিজ্ঞেস করলো সে। সব ছেলেরই তো এমন হাত। মেসেজ ডেলিভারড হলো। অভ্যুদয় ল্যাম্প অফ করে, বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করে রিপ্লাই আসার।
​রিপ্লাই এলো না। মেসেঞ্জার থেকে বেরিয়ে গেল সে। ফেসবুকে ঢুকলো খেলার গ্রুপটায়। কতক্ষণ কাটলো জানে না সে, তবে চোখ ঘুম ঘুম লাগতেই টাইম দেখলো। ১১:৩০টা বেজে গেছে। কপালে ভাঁজ পড়লো তার, এতো রাত হলো কখন?
​আবারও মেসেঞ্জারে ঢুকে সে। নওশীনের মেসেজ আসেনি, তবে তার নামের পাশে সবুজ চিহ্নটা দেখা গেল।
​“ভালো লাগে।" নওশীনের মেসেজ সংক্ষিপ্ত।
​“ভালো লাগার কী আছে?"
​“তুমি বুঝবে না, ছেলে মানুষ তো, তাই।"
​“আচ্ছা, তাই নাকি? তো আর কী কী ভালো লাগে মেয়েদের?"
​“ভদ্র-শান্ত-শিষ্ট ছেলে, সবাইকে সম্মান করে এমন।”
​“তোমার কেমন ভালো লাগে?"
​“আমারটা শুনলে ভাববে আমি মেন্টাল।" অনেকগুলো হাসির ইমোজি এলো। আগ্রহ জাগলো অভ্যুদয়ের।
​“কেন?"
​“কারণ আমার পছন্দ রাগী মানুষ। একদম রাগ হলে হাত-হুত ঘু'ষায়ে ফাটাই ফেলবে, তেমন।" বেকুব হয়ে গেল অভ্যুদয়। এই ধরণের মানুষ আবার কে পছন্দ করে? আর বাস্তবে কি এমন মানুষ আছে নাকি?
​“তুমি আসলেই মেন্টাল।"
​“টোল্ড ইউ।"
​“তো খাওয়া-দাওয়া করেছো?" জানতে চাইলো অভ্যুদয়।
​“না। তুমি?"
​“করেছি। কেন করোনি?"
​“মেজাজটা খারাপ আছে, তাই।"
​“কী জন্য?"
​“আর বলিও না। কথাটা বললেই মেজাজ খারাপ হয়ে যাবে। এরপর ইচ্ছামতো গা'লাগা'লি করবো।" অবাক হলো অভ্যুদয়।
​“তুমি গা'লাগা'লিও করতে পারো?"
​“পারে না কে? সকলেই পারে। মেয়ে বলে দেই না। ছেলে হলে কথায় কথায় গা'লি দিতাম।" অভ্যুদয় হাসলো। কী সব অদ্ভুত কথাবার্তা মেয়েটার! গা'লাগা'লিতে আবার ছেলে-মেয়ে আছে নাকি? সে নিজেও তো কখনো কাউকে গালি দেয়নি।
​“তো কী জন্য এতো খেপে আছো, তা তো বলো?"
​“বা'লের একটা গল্প পড়ে মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে।"
​“গল্প?"
​“হ্যাঁ, গল্প। প্রথম দিকে এতো সুন্দর করলো, আর শেষে কী বা'ল করলো?" অভ্যুদয় বুঝতে পারলো নওশীন রেগে গেছে। কথায় কথায় সে যে 'বাল' বলে যাচ্ছে, তা সম্পর্কে সে একটুও অবগত নয়।
​“কী করেছে?"
​“শেষে এসে দুইটার ডিভোর্স করায় দিছে। বা'ল করছে।"
​“হা হা হা হা!" অনেকগুলো হাসির ইমোজি পাঠালো অভ্যুদয়। সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে মানুষ এভাবে রেগে যায় নাকি?
​“হাসবে না, একদম ব্লক মে'রে দিবো!" মেসেজ এলো নওশীনের।
​“স্যাড এন্ডিং দিতেই পারে। স্যাড এন্ডিংয়েও কিছু সৌন্দর্য রয়েছে।"
​“হয়েছে, হয়েছে, এতো ভাষণ দিও না। গল্প তো পড়ো না, তাই বুঝো না। পছন্দের মানুষের বিচ্ছেদ কতটা যন্ত্রণার, তা তুমি বুঝবে না।" হাসি সরলো অভ্যুদয়ের মুখ থেকে।
​“তুমি কীভাবে বুঝলে, নওশীন?"
​“আপু করে ডাকো। বেয়াদবের মতো নাম ধরে ডাকো! বজ্জাত, তোমার মায়ের কাছে বিচার দিবো।" মেসেজ এলো নওশীনের। মনের মধ্যে খুঁতখুঁত করছে অভ্যুদয়ের। চোখের ঘুম কোথায় পালিয়েছে, সে জানে না। ঘড়িতে ১২টা এখন।
​“বলো।"
​“আমার আপুকে দেখেছি..."
​“তার সাথে কী হয়েছিলো?"
​“বাড়িতে সকলেই জানতো তাদের সম্পর্কের কথা। এরপর তার বয়ফ্রেন্ডটা হাতেনাতে ধরা পড়লো চিট করতে গিয়ে। আপু না কাউকে কিছু বলতে পারতো, না সহ্য করতে পারতো।" থামলো নওশীন।
​“রাত-বিরাতে দেখতাম কান্না করছে সে। সেই চাপানো কান্না দেখেই বুঝেছিলাম ভালোবাসায় সুখ থেকে যন্ত্রণা বেশি। তাই বলি কি, কখনো প্রেম করো না।" আবারও মেসেজ এলো নওশীনের। অভ্যুদয় বুঝতে পারছে না এই মেসেজের কী উত্তর দিবে সে। সে তো এরকম কিছু কখনো ফেস করেনি, এমন সময় কাউকে কীভাবে সান্ত্বনা দিতে হয়, তাও জানে না সে।
​“কী বলবো বুঝতে পারছি না।" রিপ্লাই করলো অভ্যুদয়। মেসেজ না দিলে হয়তো নওশীন ভাবতে পারে সে ভালো করে তার মেসেজই দেখেনি।
​“বলার মতো আসলে কিছু নেইও। আচ্ছা, বাদ দিই এই টপিক। কী করছো?"
​“শুয়ে আছি। তুমি? খাবে না?"
​“আমিও। বা'লের এই খাবারের কথা বলো না তো! এই খাবারের কথা মনে পড়লেই সেই গল্পের কথা মনে পড়ে।"
​“গান শুনবে একটা?" হুট করেই মেসেজ পাঠালো অভ্যুদয়।
​“তুমি শোনাবে?"
​“শুনতে চাইলে শোনাবো।"
​“ও মাই গড! কে তুমি? অভ্যুদয়........"
“অভ্যুদয়.......... "
“অভ্যুদয়....কোথায় তুমি?....." একের পর এক মেসেজ আসতে শুরু করলো নওশীনের।
​“পাগল হয়ে গেলে নাকি?"
​“অভ্যুদয়, তোমার আইডি হ্যাক হয়েছে! কে একজন জানি আইডিতে ঢুকে আমাকে গান শোনাতে চাইলো। বিশ্বাস করো, আমি তো জানি তুমি কখনো এই কাজ করবে না!"
​“হয়েছে, হয়েছে...এখন কী গান শুনবে? নাকি ঘুমাতে যাবো আমি?"
​“শোনাও, শোনাও!"
​“৫ মিনিট অপেক্ষা করো।"
​“ওকে।"
​“অপেক্ষা করো নওশীন, যেও না।" মেসেজটা দিয়েই বেরিয়ে গেল অভ্যুদয়। ভয়েস রেকর্ডার অন করে গান গাইতে শুরু করে—
​Oceans apart, day after day
And I slowly go insane
I hear your voice on the line
But it doesn't stop the pain
If I see you next to never
Then how can we say forever?
Wherever you go, whatever you do
I will be right here waiting for you
Whatever it takes or how my heart breaks
I will be right here waiting for you.
​গানটা রেকর্ড হতেই তা সেন্ড করে দিল নওশীনকে। সঙ্গে সঙ্গে তা সিন করলো নওশীন। অভ্যুদয় বড়ো করে শ্বাস ছাড়লো, যেন নওশীন আছে কি না তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলো।
​বিছানায় চিত হয়ে শুলো সে। হঠাৎ করেই এই গানটা কেন গাইলো, জানে না। তবে এই গানটা তার ভালো লাগে। অদ্ভুত রকমের, তবে আজ যেন বেশিই ভালো লাগলো। দু-হাত মেলে শুলো সে। চোখ বন্ধ করলো নিজের অজান্তেই।
​“নওশীন..." বিড়বিড় করে উঠলো অভ্যুদয়। যেন তার কণ্ঠে নামটা কেমন শোনায় তা জানতে চাইছে।
​“আপু..." আবারও কথাটা বলতেই এক লাফে উঠে বসলো সে।
​“ইয়াক, ইয়াক, ইয়াক!" মুখটা অদ্ভুত রকমের করলো, যেন কথাটা বলতেই তার বমি আসছে।
​চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন