ফন্ট সাইজ:
থিম:
সে ছিল আমার কল্পনায়

১৩তম পর্ব

লেখক: নাবিলা আহমেদ সেহরিশ

#সে_ছিল_আমার_কল্পনায়

#পর্ব_১২
#লেখিকা_নাবিলা_আহমেদ সেহরিশ
গাড়ির জানালার পাশে বসে আছে অভ্যুদয়। একটানা পা নাচিয়ে যাচ্ছে সে। অস্থির আঙুলগুলো কখনও সিটের উপর টোকা দিচ্ছে, কখনও নিজের নখ খুঁটছে। তার অধৈর্য দৃষ্টি বারবার ছুটে যাচ্ছে জানালার বাইরে, যেন রাস্তার ভিড়ের মধ্যে কোথাও লুকিয়ে আছে তার অস্থিরতার উত্তর।
পাশের সিটে বসে আছেন অনামিকা চৌধুরী। কিছুক্ষণ আগেই ছেলেটার ওপর বেশ রাগারাগি করেছেন তিনি। যার ভোরে উঠে পড়ার কথা, সেই ছেলে আজ ঘুম থেকে উঠেছে সাড়ে আটটায়! কথাটা মনে পড়তেই আবারও বিরক্তি এসে ভিড় করল মনে।
কিন্তু এবার যখন অভ্যুদয়ের দিকে তাকালেন, তখন বিরক্তির জায়গাটা দখল করে নিল বিস্ময়।
আজ ছেলেটার মুখে সেই চিরচেনা রাগ নেই। নেই হতাশা কিংবা অভিমানের ছাপ। বরং মুখজুড়ে ছড়িয়ে আছে অদ্ভুত এক দ্বিধা আর অস্থিরতা।
তার চোখ নেমে এল অভ্যুদয়ের হাতে। ছেলেটা অনবরত নিজের নখ খুঁটছে। এরপর দৃষ্টি আটকাল তার পায়ে। অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে পা নেড়ে চলেছে সে। যেন শরীরের ভেতরে জমে থাকা অস্থিরতা আর কোনোভাবেই আটকে রাখা যাচ্ছে না। অনামিকা চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে বললেন-
 "কী হয়েছে? এমন নার্ভাস লাগছে কেন তোমাকে?" হঠাৎই চমকে উঠল অভ্যুদয়।
"জি?"
“বললাম, এত নার্ভাস লাগছে কেন?" এক মুহূর্ত থেমে নিজেকে সামলে নিল সে।
"কই... না তো। আসলে গতকাল রাতে ঘুমটা ভালো হয়নি। তাই শরীরটা একটু খারাপ লাগছে।"
"ওহ..." আর কিছু বললেন না অনামিকা চৌধুরী।
অভ্যুদয়ও সুযোগ পেয়ে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল।
তার বুকের ভেতরটা যেন অবিরাম ধুকপুক করে চলেছে। হৃদস্পন্দন এত দ্রুত আগে কখনও অনুভব করেনি সে। ঘুম ভাঙার পর থেকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ করার সাহস হয়নি তার। চোখ বন্ধ করলেই সেই স্বপ্নটা ফিরে আসে।
নওশীন...মেয়েটার কণ্ঠস্বর। গলার কাছে ছোট্ট সেই তিল। স্বপ্নের অস্পষ্ট স্পর্শগুলো। সবকিছু যেন অবিশ্বাস্য রকম বাস্তব হয়ে ফিরে আসে তার কাছে। মনে হয়, আরেকটু হলেই আবার সেই অদ্ভুত অনুভূতির ভেতর ডুবে যাবে সে।
হঠাৎ করেই গাড়ির কাচ নামিয়ে দিল অভ্যুদয়।গরম লাগছে। অসহ্য রকমের গরম। যেন বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে।
সে জানে না নিজের সঙ্গে কী হচ্ছে। শুধু এটুকু বুঝতে পারছে—নওশীনের সঙ্গে আর কথা বলা যাবে না। একদমই না। যত দূরে থাকা যায়, ততই ভালো।
কলেজের গেটের সামনে গাড়ি থামতেই প্রায় লাফিয়ে নেমে পড়ল অভ্যুদয়।
অন্যদিনের মতো অনামিকা চৌধুরীর গাড়ি চলে যাওয়ার জন্যও অপেক্ষা করল না। মাথা নিচু করে প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে ঢুকে গেল কলেজ ভবনের ভেতরে।
ক্লাসে তখন হাতে গোনা কয়েকজন ছাত্রছাত্রী এসেছে। হাঁপাতে হাঁপাতে ঢুকতেই সবাই কৌতূহলী চোখে তাকাল তার দিকে। কিন্তু আজ কারও দৃষ্টির পরোয়া করার মতো অবস্থায় নেই সে।
প্রতিদিনের মতো প্রথম বেঞ্চে না গিয়ে সোজা চলে গেল একেবারে শেষ বেঞ্চে। ব্যাগটা বেঞ্চের ওপর ছুড়ে রেখেই দ্রুত চেইন খুলল। মোবাইল বের করল। ব্লুটুথ ইয়ারফোন কানেক্ট করল। ডাটা অন করেই মেসেঞ্জারে ঢুকে গেল। আজই..এই মুহূর্তেই... নওশীনকে ব্লক করে দেবে সে। চিরদিনের জন্য।
মেয়েটা তার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। সে দেখতে কেমন, তার পুরো নাম কী—কিছুই জানে না অভ্যুদয়। তবু সেই মেয়েকে নিয়েই এমন স্বপ্ন!
ভাবতেই নিজের প্রতিই ঘৃণা জন্মাল তার। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। এতটা নিচে কীভাবে নেমে গেল সে? রাগে দাঁতে দাঁত চেপে ধরল।
মেসেঞ্জারে ঢুকতেই নওশীনের ইনবক্সটা সামনে ভেসে উঠল। চ্যাট খুলতেই চোখ আটকে গেল একটি লাইনে।
This message was unsent.
মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল গতরাতের সেই ছবির কথা। গলার কাছে ছোট্ট তিলটা। স্বপ্নের সঙ্গে মিশে যাওয়া অস্পষ্ট সব স্মৃতি। বিরক্ত হয়ে দ্রুত স্ক্রল করে ওপরে উঠল সে। চোখে পড়ল নওশীনের পাঠানো অডিওটি।
একবার...
শুধু শেষবারের মতো। নিজেকেই যেন বোঝাল সে।
প্লে বাটনে চাপ দিল। মুহূর্তেই নওশীনের কণ্ঠে ভেসে উঠল গান। অভ্যুদয় অজান্তেই চোখ বন্ধ করে ফেলল। কী আশ্চর্য! এই কণ্ঠে যেন অদ্ভুত এক টান আছে। যত শোনে, ততই যেন ডুবে যেতে ইচ্ছে করে। চোখের সামনে আবারও ভেসে উঠল সেই অদ্ভুত স্বপ্নের জঙ্গল। কুয়াশায় মোড়া পরিবেশ। খাটের ধারে বসে থাকা নওশীন। মৃদু কণ্ঠে গাওয়া গান। তার দিকে বাড়িয়ে দেওয়া আহ্বান। হঠাৎই স্বপ্নের আরও কিছু অস্পষ্ট দৃশ্য ফিরে আসতে শুরু করল। অভ্যুদয় ঝটকা দিয়ে চোখ খুলে ফেলল। মনে হলো, যেন নিজের কাছেই অপরাধী হয়ে যাচ্ছে সে। বিরক্তিতে দাঁতে দাঁত চেপে ব্লুটুথটা খুলে ছুড়ে রাখল বেঞ্চের ওপর।
মাথার ভেতর সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
ইচ্ছে করছে সামনে থাকা বেঞ্চগুলো ভেঙে চুরমার করে ফেলতে। এমন কেন হচ্ছে তার? নিজেকেই যেন আর চিনতে পারছে না সে। কাঁপা হাতে আবার নওশীনের প্রোফাইলে ঢুকল।
ব্লক অপশনের ওপর আঙুল রেখে থেমে গেল। মন বাধা দিল। যদি নওশীন পরে কথা বলতে আসে?
যদি এসে দেখে, সে ব্লক করে দিয়েছে? মেয়েটার দোষটা কোথায়? সমস্যা তো নওশীনের নয়।
সমস্যাটা তার নিজের। তার নিজের মন। তার নিজের অবচেতন। তাহলে শাস্তিটা নওশীন পাবে কেন? কিন্তু...যদি ব্লক না করে? যদি আবারও এমন স্বপ্ন দেখতে থাকে?
যদি ধীরে ধীরে নওশীনকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করে? না...সেই সুযোগ সে নিজেকে দিতে পারে না।
দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল অভ্যুদয়। চোখ দুটো ধীরে ধীরে বন্ধ করল। তারপর আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। আঙুলটা নেমে গেল ব্লক বাটনের ওপর। সবকিছু শেষ হয়ে গেল এক স্পর্শেই।
স্ক্রিনের দিকে কিছুক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে থেকে মনে মনে ফিসফিস করে বলল—
"ভালো থেকো, নওশীন।"
বিকেল চারটা।
পড়ার টেবিলে বসে আছে অভ্যুদয়। তার ঠিক পাশের চেয়ারে বসে আছেন গণিতের স্যার। আজ উচ্চতর গণিতের টিউশন। সিলেবাসের সব অধ্যায় অনেক আগেই শেষ হয়েছে, এখন চলছে শুধু রিভিশন। সামনে পরীক্ষা, তাই কোনো ভুলের সুযোগ নেই।
স্যার খাতার ওপর কলম চালাতে চালাতেই ধীরে ধীরে অঙ্কটা বুঝিয়ে যাচ্ছেন।
"বুঝতে পেরেছো?" অভ্যুদয়ের দৃষ্টি খাতার ওপরই স্থির।
দেখতে মনে হচ্ছে সে মনোযোগ দিয়েই অঙ্কটা দেখছে, অথচ তার চোখ যেন কেবল কালো কালি আর সাদা কাগজই দেখছে। সংখ্যাগুলো মাথার ভেতর ঢুকেই হারিয়ে যাচ্ছে। একটাও সূত্র মনে পড়ছে না।
"অভ্যুদয়!" স্যারের গম্ভীর কণ্ঠে চমকে উঠল সে।
"জি... স্যার?"
"মন কোথায় আজ? অঙ্কটা বুঝতে পেরেছো?"
একটু ইতস্তত করে মাথা নেড়ে বলল-
 "জি, স্যার।" উত্তরটা শুনেও সন্তুষ্ট হলেন না স্যার।
"আচ্ছা, তাহলে এটা করে দেখাও।" কথা শেষ করে তিনি খাতায় নতুন একটি অঙ্ক লিখে সেটি অভ্যুদয়ের দিকে এগিয়ে দিলেন।
d/dx [(x + √(x² + 1))⁷]
অঙ্কটার দিকে স্থির হয়ে রইল অভ্যুদয়। ঠিক তখনই অজান্তেই চোখ চলে গেল টেবিলের কোণে রাখা ছোট্ট ঘড়িটার দিকে।
৪টা ২০।
মনের ভেতর আচমকা একটা প্রশ্ন উঁকি দিল।
এই সময়টাতে যদি নওশীন অনলাইনে আসে, যদিও আসে না কিন্তু আজ যদি আসে? আর যদি দেখে সে তাকে ব্লক করে দিয়েছে..তখন কেমন লাগবে ওর?
"কী হলো? শুরু করো।" স্যারের কণ্ঠে বিরক্তির আভাস। অভ্যুদয় আবার খাতার দিকে তাকাল।
কিন্তু অঙ্কটা যেন সম্পূর্ণ অপরিচিত লাগছে। এটা কি সে আগে কখনও করেছে? কোন সূত্র লাগবে?
চেইন রুল? নাকি আগে ভেতরের অংশটা অন্তরীকরণ করতে হবে? মাথাটা যেন একেবারে ফাঁকা হয়ে গেছে।
"অভ্যুদয়!" আবারও ডাক। সে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল। মনে হলো, নিজের মাথাটাকে জোর করে শান্ত করার চেষ্টা করছে। স্যার এবার বিরক্ত গলায় বললেন-
"পারছো না? এসব তো অনেক আগেই করানো শেষ। সব ভুলে বসে আছো নাকি? আর কয়েকদিন পর পরীক্ষা, আর তোমার এই অবস্থা?"
কথা শেষ হওয়ার আগেই চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল অভ্যুদয়।
"আমি... ওয়াশরুমে যাচ্ছি।" উত্তরের অপেক্ষা না করেই দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।
ওয়াশরুমে ঢুকেই দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল। বেসিনের কল ছেড়ে দু'হাত ভরে ঠান্ডা পানি তুলে কয়েকবার মুখে ছিটিয়ে দিল। তারপর দু'হাত বেসিনে রেখে মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। শ্বাস-প্রশ্বাস ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে লাগল।
কয়েক সেকেন্ড পর মাথা তুলে আয়নার দিকে তাকাতেই হঠাৎ অঙ্কটা আবার ভেসে উঠল চোখের সামনে। অবচেতনেই আঙুল তুলে আয়নার ওপর লিখতে শুরু করল সে।
বাইরের স্তরে পাওয়ার রুল...
তারপর চেইন রুল...
ভেতরের অংশের অন্তরীকরণ...
একটার পর একটা ধাপ যেন নিজে থেকেই মাথায় ফিরে আসতে লাগল। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো সমাধান দাঁড়িয়ে গেল। অভ্যুদয় স্থির হয়ে গেল। এটা তো সে পারে! তাহলে একটু আগে কিছুই মনে পড়ছিল না কেন? কী হচ্ছে তার সঙ্গে?
নিজের মনটাই কি আর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই?
ঠিক তখনই বাইরে থেকে ভেসে এল স্যারের বিরক্ত কণ্ঠ।
 "আজ কী ওয়াশরুমেই থেকে যাবে?" চমকে উঠে দ্রুত কল বন্ধ করল সে। মুখটা আরেকবার মুছে দরজা খুলে বেরিয়ে এল। চুপচাপ এসে আবার নিজের জায়গায় বসল। খাতাটা টেনে নিয়ে কলম ধরল। এবার আর একবারও থামল না। মাত্র দুই মিনিটের মধ্যেই পুরো অঙ্কের সমাধান লিখে খাতাটা স্যারের দিকে এগিয়ে দিল।
স্যার কয়েক মুহূর্ত খাতার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে ভ্রু কুঁচকে বললেন-
"ওয়াশরুমে গিয়ে মোবাইলে উত্তর দেখে এসেছো... তাই তো?" কথাটা শুনে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল অভ্যুদয়। পরক্ষণেই চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। একটাও কথা না বলে টেবিলের ওপর রাখা বইয়ের ওপর থেকে নিজের মোবাইলটা তুলে এনে স্যারের সামনে রেখে দিল। মোবাইলটা এতক্ষণ এখানেই ছিল। ওয়াশরুমে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। স্যার কিছুক্ষণ মোবাইলের দিকে, তারপর অভ্যুদয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মুখে এক ধরনের অস্বস্তি ফুটে উঠল। শেষ পর্যন্ত গলা পরিষ্কার করে বললেন-
"আচ্ছা... ঠিক আছে। পরের বার কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই করবে।" বলতে বলতেই তিনি আরেকটা অঙ্ক বের করতে শুরু করলেন। অভ্যুদয় কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে গিয়ে থামল টেবিলের ওপর রাখা মোবাইলটার দিকে।
ছোট্ট কালো স্ক্রিনটা নিঃশব্দে পড়ে আছে। ওটার ভেতরে এমন কী আছে, সে নিজেও জানে না।
শুধু এটুকু জানে—কয়েক ঘণ্টা ধরে তার চোখ মোবাইলটার কাছ থেকে বেশিক্ষণ দূরে থাকতে পারছে না।
মনে হচ্ছে, স্ক্রিনটা নিভে থাকলেও যেন ওখান থেকেই কেউ তাকে নিরন্তর ডাকছে।
রাত ১০টা ৪৫।
এত রাতেও পড়ার টেবিলে বসে আছে অভ্যুদয়। সামনে খোলা উচ্চতর গণিতের বই, পাশে খাতা। কলম চলছে ঠিকই, কিন্তু মনটা যেন সংখ্যার ভেতর নেই।
বিছানার ওপর রাখা মোবাইলটা বারবার তার দৃষ্টি কাড়ছে। একটা অঙ্ক লিখছে। তারপর মাথা তুলে মোবাইলের দিকে তাকাচ্ছে। স্ক্রিনের আলো নিভে গেলে হাত বাড়িয়ে আবার জ্বালিয়ে দিচ্ছে। আবার সময় দেখছে। আবার অঙ্কে মন দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু কয়েক লাইন পরই একই ঘটনা।
শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে কলমটা নামিয়ে রাখল সে।
আবারও চোখ গেল মোবাইলের স্ক্রিনে। ১০:৫৭।
সময়টা দেখেই যেন শরীরের ভেতর কিছু একটা নড়ে উঠল। প্রায় ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করে মোবাইলটা হাতে তুলে নিল অভ্যুদয়। লক খুলে এক নিঃশ্বাসে ঢুকে গেল মেসেঞ্জারে। আর মাত্র তিন মিনিট। এগারোটা বাজলেই নওশীন সাধারণত অনলাইনে আসে। এক মুহূর্ত দেরি না করে তার প্রোফাইলে ঢুকে ব্লক খুলে দিল সে।
কাজটা শেষ হতেই যেন হুঁশ ফিরল। সে স্থির হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
“আমি... ব্লক খুললাম কেন?” নওশীন অনলাইনে এলে তার কী? সে নিজেই তো ঠিক করেছিল আর কখনো কথা বলবে না। নিজের ওপরই প্রচণ্ড রাগ হলো। দাঁতে দাঁত চেপে আবার ব্লক করতে গেল। কিন্তু স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
You have to wait 48 hours to block someone after unblocking them.
কয়েক সেকেন্ড বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সে।
তারপর হঠাৎই বিস্ফোরিত হলো।
"ফা'ক ইউ, ফেসবুক! ফা'ক ইউ, জা'কারবার্গ!"
রাগে মোবাইলটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে ঘরের ভেতর পায়চারি শুরু করল। নিজের ওপরই এতটা রাগ আগে কখনো হয়নি। কে বলেছিল ব্লক খুলতে?
এই পৃথিবীতে যদি গাধাদের তালিকা করা হয়, তাহলে নিজের নামটা নিশ্চয়ই এক নম্বরে থাকবে।
হঠাৎ থেমে গিয়ে মোবাইল নিয়ে ওয়াই-ফাই বন্ধ করে দিল। ব্যস। এটাই সমাধান। অনলাইনেই যাবে না। তাহলে নওশীন মেসেজ দিলেও দেখা হবে না।
কথাও বলতে হবে না। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে আবার চেয়ারে বসে পড়ল।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা বইগুলোর মধ্যে থেকে একটি তুলে নিল। বইটা গত মাসে দিয়েছিল তার বন্ধু হামিদ।
প্রচ্ছদের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে নামটা পড়ল সে—
"সিক্সটি নাইন" — নাবিলা আহমেদ সেহরিশ।
বইটা উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে হামিদের কথা মনে পড়ে গেল। ও বলেছিল, দারুণ একটা থ্রিলার বই। ভাবতেই ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গের হাসি ফুটে উঠল। হামিদ আবার কবে থেকে থ্রিলার পড়তে শুরু করল? ওর তো বই মানেই... ই'রোটিকা।
মাথা নেড়ে বইটা পাশে রেখে দিল অভ্যুদয়।নিশ্চয়ই অনেকক্ষণ কেটে গেছে। এতক্ষণে হয়তো নওশীন অনলাইনে এসে তাকে না পেয়ে চলে গেছে। স্বস্তির একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল সে।
হাসিমুখেই মোবাইল হাতে নিয়ে পাওয়ার বাটনে চাপ দিল। স্ক্রিন জ্বলে উঠতেই তার হাসি মিলিয়ে গেল।
১১:০৯। মাত্র দশ মিনিট! অভ্যুদয় হতভম্ব হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল অন্তত এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। হতাশ হয়ে মাথা পেছনে ঠেকিয়ে আওড়ায়-
 "ফা'ক ইউ, ঘড়ি... ফা'ক ইউ!" 
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মোবাইলটা আবার হাতে নিল। না...এভাবে পালিয়ে থাকা সম্ভব নয়। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে নিজের সঙ্গে কী হচ্ছে। যত বেশি এড়িয়ে যেতে চাইছে, মন তত বেশি নওশীনের দিকেই ছুটে যাচ্ছে। পালিয়ে নয়...সম্মুখীন হয়েই এর শেষ করতে হবে। নিজেকে বোঝানোর ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বলল,
"সমস্যার সামনে দাঁড়াতেই হয়।" একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার ওয়াই-ফাই চালু করল।
এক সেকেন্ডও পেরোয়নি।টুন করে নোটিফিকেশন ভেসে উঠল।
নওশীন।
অভ্যুদয়ের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
হৃদস্পন্দন অকারণেই বেড়ে গেল। অথচ একই সঙ্গে একফোঁটা অদ্ভুত আনন্দও ছড়িয়ে পড়ল মনে। অনলাইনে এসেই নওশীন তাকে মেসেজ করেছে। তাহলে... তার প্রথম খোঁজটা এখনও অভ্যুদয়ই? চ্যাট খুলতেই ভেসে উঠল সেই পরিচিত মেসেজ।
"কী করো, পিচ্চি?" অভ্যুদয়ের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।
পিচ্চি?
মনে মনে বলল-
“এই পিচ্চিটা কী করতে পারে, সেটা যদি কখনও জানতে... তাহলে সবার আগে তুমিই পালাতে।”
"আমি পিচ্চি না।" মেসেজ পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গেই সারাদিনের দ্বিধা, অস্থিরতা আর আত্মসংযম যেন একটু একটু করে দূরে সরে যেতে লাগল। কিছুক্ষণ পরই রিপ্লাই এল।
"পিচ্চি না তো কী? আপনি?" 'আপনি' শব্দটা দেখে নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল অভ্যুদয়।
কেন যেন ভালো লাগে, যখন নওশীন তাকে এভাবে সম্বোধন করে।
"আপনার জানা লাগবে না।"ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর এল—
"ওহো... কেন জানা লাগবে না? আমি তো জানি, ইউ আর এ কিড।" অভ্যুদয় ভ্রু তুলে। 
"কিড? ইউ থিংক আই অ্যাম এ কিড?" মেসেজ পাঠালো দ্রুত।
"ইয়েস। ইউ আর জাস্ট এ কিড।"
কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল সে।
"ইউ ক্যান নেভার হ্যান্ডেল এ কিড লাইক মি।"
মেসেজটা পাঠিয়েই বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করতেই ঠোঁটের কোণে আবারও সেই বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।
কিড...
নওশীন যদি জানত, এই 'কিড'-এর মাথার ভেতর কত অদ্ভুত যুদ্ধ চলছে...
যদি জানত, তাকে নিয়েই কোন ধরণের স্বপ্ন দেখছে সে, কতটা অপরাধবোধ আর কতটা টান একসঙ্গে বাসা বেঁধেছে তার মধ্যে, তাহলে হয়তো সবার আগে ছুটে পালাবে সে। এই পিচ্চির ধারেকাছেও সে আসবে না। চলে যাবে দূরে কোথাও, অনেক দূরে।
চলবে...
আপনাদের ভাইয়াকে ব্লক করে আবার আনব্লক করে আবারও ব্লক করে তারপর কি লেখা উঠে তা বের করেছি🤣।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন