ফন্ট সাইজ:
থিম:
বিয়ে এবং একাকীত্ব

২য় পর্ব

লেখক: সিদরাতুল মুনতাহা

দুই ভিন্ন মানুষ

জারিফ রহমান ইহান চৌধুরীকে দেখলে প্রথমেই চোখে পড়ত তার ব্যক্তিত্ব।
লম্বা, ফর্সা এবং ভীষণ সুদর্শন। তার চেহারায় এমন এক আকর্ষণ ছিল, যা তাকে ভিড়ের মাঝেও আলাদা করে চিনিয়ে দিত। আর তার হাসি? অসম্ভব সুন্দর। তাকে হাসতে দেখলে কেউ বিশ্বাসই করতে চাইত না যে এই শান্ত, হাসিখুশি মানুষটার ভেতরে এতটা তীব্র রাগ লুকিয়ে থাকতে পারে।
জারিফ সাধারণত খুব শান্ত স্বভাবের। নতুন কারও সঙ্গে পরিচিত হতে তার বেশি সময় লাগত না। খুব সহজেই সবার সঙ্গে মিশে যেতে পারত। মানুষের উপকার করা, কারও বিপদে পাশে দাঁড়ানো কিংবা কারও মুখে হাসি ফোটানো—এসব তার কাছে ছিল একেবারেই স্বাভাবিক।
তবে তার ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিক ছিল, যেটা সবাই জানত না—তার রাগ।
জারিফ সহজে রাগ করত না। বরং নিজের রাগকে সবসময় নিয়ন্ত্রণে রাখত। কারণ সে জানত, তার রাগ সাধারণ কোনো রাগ নয়। কিন্তু যখন সত্যিই সে রেগে যেত, তখন তার শান্ত চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে যেত। যে একবার তার সেই রূপ দেখেছে, সে দ্বিতীয়বার তার সামনে দাঁড়ানোর আগে দুবার ভাবত।
তবুও পৃথিবীতে একজন মানুষ ছিলেন, যার সামনে জারিফের এই তীব্র রাগও হার মেনে যেত—তার মা, মাহিরা চৌধুরী।
মাকে জারিফ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সম্মান করত। মায়ের কোনো কথা সে কখনো অমান্য করত না। আর তার রাগ সামলানোর ক্ষমতা ছিল একমাত্র তার মায়েরই।
অন্যদিকে, আদিবা সুলতানা আরফিন রহমান ছিল একেবারেই সাধারণ একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। জীবনে বড় কোনো বিলাসিতা না থাকলেও তার মধ্যে ছিল এমন এক মায়া, যা তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে তুলত। ফর্সা গায়ের রং, শান্ত মুখ আর টানা টানা মায়াবী চোখ—আদিবাকে দেখলে চোখ ফেরানো কঠিন ছিল। বিশেষ করে তার চোখ দুটো ছিল অসম্ভব সুন্দর। সেই চোখের দিকে তাকালে মনে হতো, সেখানে যেন নীরবে হাজারটা গল্প লুকিয়ে আছে।
আদিবা ভীষণ ভদ্র, নম্র ও লাজুক স্বভাবের মেয়ে। নিজের সৌন্দর্য নিয়ে তার বিন্দুমাত্র অহংকার ছিল না। খুব বেশি মানুষের সঙ্গে মিশত না, নিজের মতোই শান্তভাবে থাকত। তার হাসিটাও ছিল ঠিক তার চোখের মতোই মায়াবী—নরম, সরল আর মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো।
তার সৌন্দর্যের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় ছিল তার ব্যবহার। কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা তো দূরের কথা, কাউকে কষ্ট দেওয়ার কথাও সে ভাবতে পারত না।
আদিবা জানত না, তার এই সাধারণ সরলতা, মায়াবী চোখ আর শান্ত স্বভাব একদিন এমন একজন মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে, যে নিজের রাগকে পুরো পৃথিবীর কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে পারে—কিন্তু তার কাছ থেকে নিজের অনুভূতিগুলো লুকিয়ে রাখতে পারবে না।
অজানা সম্পর্ক
আদিবা সুলতানা আরফিন রহমানকে শুধু তার পরিবারের মানুষই নয়, আশপাশের অনেকেই পছন্দ করত।
তবে সেই পছন্দের কথা আদিবা জানত না।
জানলেও হয়তো খুব একটা গুরুত্ব দিত না।
কারণ নিজের ছোট্ট পৃথিবীটাকে নিয়েই সে বেশ ছিল। বাবা-মা, ছোট ভাই আদিল, পড়াশোনা আর ঘরের ছোটখাটো কাজ—এই ছিল তার প্রতিদিনের জীবন।
অপরিচিত কারও সঙ্গে অযথা কথা বলা তার স্বভাব ছিল না। প্রয়োজন ছাড়া কারও সঙ্গে মিশত না। পরিবারের মানুষদের সঙ্গেই তার সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য।
স্কুলে পড়ার সময়ও অনেকেই দূর থেকে তাকে পছন্দ করত। কেউ তার শান্ত স্বভাবের জন্য, কেউ তার ভদ্রতার জন্য, আবার কেউ তার মায়াবী চোখের জন্য।
কিন্তু আদিবা সেসবের কিছুই বুঝত না।
তার কাছে ভালো মেয়ে হওয়া মানে ছিল নিজের পরিবারের সম্মান ধরে রাখা, পড়াশোনায় মন দেওয়া আর মানুষকে কষ্ট না দেওয়া।
এদিকে আদিবার বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না চৌধুরী বাড়ি।
হেঁটে গেলে প্রায় ত্রিশ মিনিটের পথ।
এই অল্প দূরত্বের মধ্যেই যেন দুই পৃথিবী বাস করত।
একদিকে আদিবাদের সাধারণ মধ্যবিত্ত সংসার।
অন্যদিকে চৌধুরী পরিবার—অর্থ, ব্যবসা, প্রভাব আর প্রতিপত্তিতে যার অবস্থান ছিল অনেক ওপরে।
আর সেই পরিবারের একমাত্র ছেলে—
জারিফ রহমান ইহান চৌধুরী।
জারিফ দেশে ফেরার পর থেকেই এলাকার মেয়েদের মধ্যে তাকে নিয়ে যেন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছিল।
কারণ জারিফ শুধু দেখতে সুদর্শনই ছিল না, তার পরিবারের নামও ছিল যথেষ্ট পরিচিত।
অনেক মেয়েরই ইচ্ছে ছিল একবার অন্তত জারিফের সঙ্গে কথা বলবে।
কেউ দূর থেকে তাকিয়ে থাকত।
কেউ আবার কোনো পরিচিতের মাধ্যমে তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করত।
কিন্তু জারিফ?
সে এসবের কোনো কিছুতেই আগ্রহ দেখাত না।
কারণ তার জীবনে তখন অন্য একজন ছিল।
একজন মেয়ে।
যার কথা খুব কম মানুষই জানত।
এমনকি জারিফের পরিবারেরও সবাই জানত না।
শুধু তার ছোট বোন জারা জানত সেই সম্পর্কের কথা।
কারণ জারিফ যখন বিদেশে পড়াশোনা করত, তখন থেকেই তিশার সঙ্গে তার পরিচয়। সময়ের সঙ্গে সেই পরিচয় ধীরে ধীরে ভালো লাগায়, আর ভালো লাগা একসময় গভীর সম্পর্কে পরিণত হয়েছিল।
জারা তিশার সঙ্গে একবার নয়, কয়েকবার দেখা করেছিল। ভাইয়ের জীবনে তিশার গুরুত্বটা সে ভালোভাবেই বুঝত।
তিশাও একটি প্রতিষ্ঠিত পরিবারের মেয়ে। তাদের নিজেদের ব্যবসা ছিল, সমাজে যথেষ্ট পরিচিতিও ছিল। তবে চৌধুরী পরিবারের মতো এতটা প্রভাবশালী তারা ছিল না।
জারিফ আর তিশার সম্পর্কটা ছিল দীর্ঘদিনের। পরিবারে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো না হলেও দুজনের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল।
জারিফ মনে মনে বিশ্বাস করত—
একদিন সে তিশাকেই বিয়ে করবে।
সে জানত না, তার জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটা তার নিজের হাতে থাকবে না।
সেই সিদ্ধান্ত নেবেন অন্য একজন।
তার মা।
আর সেই সিদ্ধান্তের নাম হবে—
মায়ের সিদ্ধান্ত
দেশে ফেরার কয়েকদিন পর থেকেই জারিফ বুঝতে পারছিল, তার মা যেন তাকে নিয়ে কিছু একটা ভাবছেন।
মাহিরা চৌধুরী সরাসরি কিছু বলছিলেন না।
কিন্তু ছেলের সঙ্গে অকারণে ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলছিলেন।
কখনো বলতেন,
“দেশে ফিরে এবার নিজের কাজটাও একটু দেখাশোনা করো।”
আবার কখনো হঠাৎ জিজ্ঞেস করতেন,
“জারিফ, বিয়ে-শাদি নিয়ে কখনো ভেবেছিস?”
প্রশ্নটা শুনলেই জারিফ হেসে এড়িয়ে যেত।
“এখনই এসব নিয়ে ভাবতে চাই না, মা।”
মাহিরা তখন আর কিছু বলতেন না।
শুধু ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসতেন।
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে যে একটা সিদ্ধান্ত ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে, সেটা জারিফ বুঝতে পারেনি।
একদিন সন্ধ্যায় মাহিরা ছেলেকে নিজের ঘরে ডাকলেন।
জারিফ গিয়ে মায়ের সামনে বসতেই তিনি শান্ত গলায় বললেন,
“তোর জন্য একটা মেয়ে দেখেছি।”
জারিফ প্রথমে ভেবেছিল মা হয়তো মজা করছেন।
“মা, এসব শুরু করো না তো।”
“আমি মজা করছি না।”
মাহিরার গলায় এমন দৃঢ়তা ছিল যে জারিফ চুপ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সে বলল,
“আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।”
মাহিরা ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কেন?”
জারিফ কোনো উত্তর দিল না।
তিশার কথা তার মনে পড়ে গেল।
কিন্তু মায়ের সামনে সে কথাটা বলতে পারল না।
কারণ মাহিরার কাছে সে কখনো কোনো কথা লুকাতে চাইত না।
অথচ আজ প্রথমবার তার মনে হলো, এই একটা কথা হয়তো তাকে লুকিয়েই রাখতে হবে।
মাহিরা ধীরে বললেন,
“মেয়েটা খুব ভালো। পরিবারও ভালো। আমি কথা দিয়েছি।”
জারিফ অবাক হয়ে তাকাল।
“তুমি কথা দিয়ে ফেলেছ?”
মাহিরা মাথা নাড়লেন।
জারিফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
“মা, তুমি যদি কথা দিয়ে থাকো...”
বাকিটা সে শেষ করল না।
কারণ সে জানত, মায়ের দেওয়া কথা সে কখনো ভাঙতে পারে না।
কিন্তু সেই মুহূর্তে তার মনে শুধু একজনের কথাই ঘুরছিল—
তিশা।
আর অন্যদিকে, কিছুই না জেনে আদিবা নিজের স্বাভাবিক জীবনেই ছিল।
সে জানতও না—
তার জীবনটা খুব শিগগিরই এমনভাবে বদলে যেতে চলেছে, যেটা সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন