#সে_ছিলো_অন্যরকম
#পুষ্পিতা_মেহরীন_তিশা
#পর্ব- ১০
ঘড়ির কাটা সন্ধ্যা ছয়'টা ছুঁইছুঁই। রুদ্র বসে আছে ডিভানে। পরণের কোটটা পড়ে আছে ফ্লোরে। গলার টাই টা এলোমেলো। শার্টের ইন টাও ঠিক নাই। সেই সাথে ঘামে ভিজে আছে শার্টটা। সে মাথা নিচু করে, হাঁটুর ওপরে একহাত রেখে, ঝুঁকে বসে আছে ডিভানে। রাগে যেন তার শরীর টা রী রী করছে।
তার থেকে তিনহাত দূরে, ঠোঁটের ওপর এক আঙুল চেপে দাঁড়িয়ে আছে হিয়া। দেখতে ভেজা বেড়ালের থেকে কোনো অংশে কম লাগছে না তাকে। হিয়ার মনে, শুধু একটাই ভয়! কি থেকে কি হয়?
নিরবতা ভেঙে হঠাৎ বজ্র কন্ঠে বলে উঠলো রুদ্র।
"তোকে ঠিক কোন ধরণের প্যানিশমেন্ট দিলে, এই মুহুর্তে আমার রাগটা কমবে বলতো?তোকে আসলে কি করা উচিত বল?"
হিয়া ঠোঁটে আঙুল টা চেপে রেখেই অবুঝ ভঙ্গিতে বলল,,
"ফটাফট কয়েকটা গাঢ় চুমু খাও আমাকে। দেখবে ঝটাঝট তোমার রাগটা ঝরে যাবে।"
হিয়ার কথায় বিদ্যুতের গতিতে ঘাড় ঘুরিয়ে রুদ্র তাকালো তার দিকে। চোখটা যেন রাগেতে লাফাচ্ছে। সে উঠে গিয়ে হিয়ার সামনে দাঁড়ালো। হিয়া ভয়ে একটু জড়োসড়ো হলো।
"ইচ্ছে করছে ঠাটিয়ে তোকে একটা থাপ্পড় মারি। বেয়াদব মেয়ে। ফাজলামো করিস আমার সাথে?"
"তোমার সাথে কি আমার ফাজলামোর সম্পর্ক! তেমার সাথে তো আমার রোমাঞ্চের সম্পর্ক!" শান্ত স্বর হিয়ার।
রুদ্র আর এক মুহুর্তে ও সময় নিলো না। কষিয়ে একটা থাপ্পড় দিলো হিয়ার গালে। কিছুটা দূরে সরে গেলো হিয়া। মুখে হাত দিয়ে দেখলো, ঠোঁটের নিচটা কেটেছে কিছুটা।
মানুষ যখন অতিরিক্ত রেগে যায়, তখন অপর পাশের ব্যক্তিটির চুপ থাকা উচিত। এতে মানুষের রাগটা কমে যায়। কিন্তু, যদি সেইম ভাবে অপর পাশের মানুষটাও রাগী ব্যক্তিটির মুখে মুখে তর্ক করে তাহলে তার রাগটা আরও বেড়ে যায়। তর্ক গুলো তার ইগোতে গিয়ে লাগে। নিজের কাছেই নিজেকেই ছোট মনে হয়। তার রাগটাকে মানুষ মূল্যায়ন করছে না? সে এতোটা ফালতু হয়ে গেছে? এতে মানুষের নিজেকে জোকার মনে হয়। যার ফলে রাগটা আরও বেড়ে যায়। তখন, অপর পাশের মানুষটির চোখে নিজের প্রতি ভয় দেখাটাই তার মুল লক্ষ্য হয়ে দাড়ায়। তাই এর জন্য তাকে যা করতে হোক। রুদ্রর ক্ষেত্রেও এই সময়ে তাই-ই হলো। হিয়ার রসিকতা তার ইগোতে হার্ট করলো। ফলস্বরূপ, হিয়ার ঠোঁট কেটে যাওয়া দাগ।
দাঁতে দাঁত পিষে বলল রুদ্র।
"ইচ্ছে করছে তোর জামা কাপড় খুলিয়ে, ওই ৩৬টা জাঙ্গিয়া পড়িয়ে তোকে এলাকা ঘুরিয়ে নিয়ে আসি। কিন্তু, আফসোস! আমি সেটা করতে পারবো না। কারণ, তুই আমার বউ হস।"
কোমরে দুহাত রেখে রুদ্র কিছু সময় বড়ো বড়ো শ্বাস নিলো। এরপর আবার হিয়াকে টেনে এনে সামনে দাড় করিয়ে বলল,,
"এই কি মনে করিস তুই নিজেকে? হ্যাঁ? কি মনে করিস? তোর কি মনে হয়, আমি ইয়ার্কি করি তোর সাথে? জোকার মনে হয় আমাকে? দু'দিন! জাস্ট দু'টো দিন তোর সাথে একটু ভালো ভাবে কথা বলেছি, আর এতেই তুই আহ্লাদে গদগদ হয়ে গেলি? ধরাকে সরা জ্ঞান করে নিলি না?
"তোর কি মনে হয়? আমি তোর অতীতকে ভুলে গিয়েছি? তোকে আবার ভালোবাসতে শুরু করেছি? হাবুডুবু খাচ্ছি তোর প্রেমে? ক্ষমা করে দিয়েছি তোকে? উহু, ক্ষমা মাই ফুট।"
বলেই থামলো রুদ্র। হিয়ার এতো সময় চুপচাপ রুদ্রর কথাগুলো শুনছিলো। কিন্তু এবার সে মুখ খুললো। একদমে তড়তড় করে বলল,,
"তো আমি বলেছি, তুমি আমার অতীত ভুলে যাও? ক্ষমা করে আমাকে বুকে টেনে নাও? তোর শালা অতীত ভোলার দরকার নেই। তুই অতীত মনে রাখ। তুই আমার অতীতকে রান্না করে খা। সেটাকে গুলিয়ে পানি বানিয়ে খা। সেই পানি আমাকেও দিস। যাতে সেটা খেয়ে আমি প্রেগনেন্ট হয়ে যাই।"
হিয়া থামল এবার। রুদ্রর রকগুলো ফুলছিলো হিয়ার কথা শুনে, কিন্তু কেন জানি! হিয়ার শেষ কথাটা শুনে রুদ্রর রাগেও মাঝেও ব্যাপক হাসি পেলো। সে কিড়মিড়িয়ে বলল,,
"অসভ্য মহিলা।"
"অসভ্য পুরুষ।" চটজলদি উত্তর হিয়ার।
রুদ্র দ্বিতীয় বার থাপ্পড় দেওয়ার জন্য হাত উঠালো। তবে থাপ্পড় টা ডান গালে পড়ার আগেই হিয়া তার দিকে বাম গালটা বাড়িয়ে দিলো। চোখ বন্ধ করে উত্তেজিত হয়ে বলল,
"এ বারের টা বাম গালে মারো প্লিজ। একপাশে দুই'টা থাপ্পড় খেলে পরে গাল বাকিয়ে যাবে তো।"
রুদ্র একটু অবাক হলো। কিছু সময় পরই হাতটা নামিয়ে নিলো। ওয়ালে গিয়ে, ইচ্ছেমতো কয়েকটা ঘুষি দিলো। হাতটা হালকা ছুলে গেলো তার। হিয়া দৌড়ে যেতেই, তার বাহু স্বজোরে চেপে ধরলো রুদ্র। দাঁতে দাঁত পিষে বলল,,
"গায়ে লাগে না তাই না? তোকে আমি, এতো অপমান করি, এতো বাজে কথা বলি তোর কিছুই গায় লাগে না? তোর মাটি দিয়ে তৈরী রে তুই? শরীরে গন্ডারের চামড়া লাগানো না তোর?"
"গন্ডারের চামড়ার থেকে পুরু চামড়া দিয়ে তৈরী এই হিয়া। তাই ওসব বলে, লজ্জা দিতে পারবে না। ফালতু মুখ নষ্ট করো না" নির্বিকার উত্তর হিয়ার।
-
এভাবেই কেটে গেলো কিছু সময়। পরিবেশ এখন বেশ শান্ত। যে যার মতো বসে আছে। হঠাৎ রুদ্র উঠলো ফ্রেশ হতে যাওয়ার জন্য। যেই না সে সামনে কয়েকপা বাড়ালো, ওমনি হিয়া গিয়ে তার সামনে ঢাল হলো। কোনো কথা বার্তা ছাড়াই, রুদ্রর শার্টের বোতামে হাত দিলো।
রুদ্র অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকালো কিছু সময়। খেয়াল করলো, হিয়ার চোখের কোণে পানি চিকচিক করছে। ডান গালটা লাল হয়ে আছে। পুরা পাঁচ টা আঙুলের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ঠোঁটের কোণে, হালকা রক্ত জমে আছে। দেখে রুদ্রর বুকটা যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। না চাইতেই বুকটা যেন ভেঙে আসছে তার। সে হিয়ার হাতটা সরানোর চেষ্টা করে, শান্ত স্বরে বলল,,
"হাত সরাও। এসব ঢং আর ভালো লাগছে না।"
হিয়া তার কথায় পাত্তা দিলো না। প্রথম বোতামটা খুলতে খুলতে, কান্নাজড়িড কন্ঠে বলল,,
"সহ্য করতে করতে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছি আমি! তবুও, মনকে সব সময় বোঝাই, আজ না হয় কাল সবটা ঠিক হয়ে যাবে। আচ্ছা কবে ঠিক হবে সবটা? বলতে পারো রুদ্র?"
শেষ কথাটায় হিয়া তাকালো রুদ্রর পানে। টুপ করে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো চোখ দিয়ে। রুদ্র চোখ নামিয়ে নিলো। কিছু বলার জন্য, মুখ খুললো তখনই হিয়া তার কলার টেনে নাকের কাছে নিলো।
বারবার নাক টেনে রুদ্রর শার্ট শুকতে থাকলো। রুদ্র অবাক হয়ে বলল,,
" কি হলো? কি করছো এসব?"
হিয়া কোনো উত্তর দিলো না। সোজা চলে গেলো। আয়নার কাছে। সেখান থেকে রুদ্র পারফিউম বের করে স্প্রে করলো তার হাতে। এরপর নাকে ধরে ঘ্রাণ নিতে থাকলো।
"আরেহ! কি হয়েছে। কি করছো এসব?"
হিয়া আবার রুদ্রর কাছে এসে রুদ্রর ঘাড়ের ঘ্রাণ নিলো। কোমরে হাত দিয়ে, নাকের ডগা ফুলিয়ে শাসন করার ভঙ্গিতে বলল,,
"কাকে জড়িয়ে ধরে ঘরে এসেছো? তোমার শার্টে কার পারফিউমের গন্ধ?এটা তো তোমার পারফিউম না।"
রুদ্র যেন শকড্ হয়ে গেলো। মুখটা হা হয়ে গেলো। আনমনে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো,,
"ওয়াট দ্য ফাক?"
"ওসব ফাক-ঠাক পরে। আগে বলো কাকে হাগ করে বাসায় এসেছো? ফাস্ট বলো!"
রুদ্র কোনো উত্তর না দিয়ে, ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালো। হিয়া আবার তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। গম্ভীর গলায় বলল,,
"মুখের বুলি কোথায় হারালো? বলো কাকে জড়িয়ে ধরেছিলে?"
"আজব মেয়ে মানুষ তো তুমি? কি মিন চাইছো? অফিসে ছিলাম হয়তো কোনো কলিগ বা রাহাদ হাগ করেছে। তাই নিয়ে এমন করার কি আছে বুঝলাম না।"
"রাহাদ ধরেছে নাকি কলিগ ধরেছে ঠিক করে বলো।" হিয়ার কন্ঠে তেজ আর হিংসা।
রুদ্র থেমে গেলো। সবটা যেন তার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। কিছু সময় ভাবলো সে। লারা? হ্যাঁ, লারা। লারা তাকে হাগ দিয়েছিলো। তারমানে...! ভুল বুঝতে পেরে নার্ভাস হলো রুদ্র। আমতা আমতা করে বলল,
"রা..রাহাদ! রাহাদ ধরেছে।"
"রাহাদ ধরেছে তাই না? এদিকে আয়।" হিয়ার কন্ঠ আরও সন্দেহভাজক হলো।
কথাটা বলেই সে রুদ্রকে টেনে নিয়ে বসালো বেডের ওপর। এরপর নিজে উঠলো বেডে, রুদ্রর পেছনে গিয়ে ঘাড় দেখলে লাগলো ভালো করে।
"আরে করছো টাকি? এভাবে টানাটানি করছো কেন? আজব তো?"
"চুপ!" হিয়া ভালো করে খুঁজলো। রুদ্রর শার্টে কাঁধের অংশে একটা চুল। চুলটা বেশি লম্বাও নয় খাটোও নয়। হিয়া চোখ বড়ো করে আস্তে করে চুলটা টেনে বের করলো।
"চুউউউউউউউল! মেয়েদের চুউউল!"
রুদ্রর চোখ দু'টো যেন কোটর থেকে বের হয়ে আসার উপক্রম হলো। এটা নিশ্চিত লারার চুল। মনে মনে, নিজেকে সহ লারাকে কয়েকটা গালি দিলো। এরপর ভয়ার্ত গলায় বলল, "এই চুল কোথা থেকে আসলো!"
"এটা নিশ্চয়ই রাহাদের চুল তাই না রুডি বয়?" হিয়ার মুখে ব্যঙ্গহাসি।
"রা..রাহাদের চুল কেন হতে যাবে। ওর চুল এতো বড়ো নাকি?" আমতা আমতা করে বলল রুদ্র।
"ওহ আচ্ছা। রাহাদ ভাইয়ার চুল নয়? তাহলে মনে এটা আমার চুল তাই না রুডি বয়।" ব্যঙ্গসুর হিয়ার।
রুদ্র চোখ কুঁচকে তাকালো হিয়ার দিকে। হিয়ার চোখে মুখে, জেদের প্রবণতা। কেমন জানি অস্থির লাগছে তাকে। যেন সে সুযোগ পেলেই রুদ্রকে ঘাড় ধরে ঘুল্লি দিবে।
"হ্যাঁ, তাই তো। এটা তোমার ছাড়া আর কার চুল? সারাদিন গায়ের ওপর গড়াগড়ি করো। কোথাও শান্তি আছে নাকি তোমার কারণে? অসভ্য গায়ে পড়া মেয়ে।"
"ঠাটিয়ে একটা থাপ্পড় দিয়ে তোর মুখের ভৌগোলিক অবস্থান বদলে দিবো বেদ্দব ছেলে। ঘরে বউ রেখে তুই বাইরে মেয়েদের সাথে ইংকি-পিংকি করিস। আবার ঘরে এসে বউকে ঝাড়ি মারিস। তোর দুঃসাহস দেখে আমি হতাশ রুদ্র। খুবই হতাশ আমি।"
"কিহ?"
রুদ্র অবাক হলো। কিছু সময় আগে যে মেয়েকে সে থাপ্পড় মারলো। এতো অপমান করলো, সে কিনা এখন সবটা ভুলে তাকেই মারতে চাইছে? মানে একটা মেয়ে কতোটা ফাজিল হলে, এমন করতে পারে?
" এই কি মানে আবার কিরে? আমার চুল কালো জিরার মতো কুচকুচে কালা। লাল শাকের মতো এমন খাটা কালার নয়। তাহলে সত্যি করে বল, কোন মেয়ের কাছে গিছিলি তুই?"
"তুই-তুকারি করছো কেন? আর মেয়ের কাছে মানে? তুমি যা বলছো, ভেবে চিন্তে বলছো তো?" বিরক্ত গলায় বলল রুদ্র।
"চোখের সামনে যা দেখতে পারছি। তা ছেড়ে ভাবতে যাবো কেন? সত্যি করে বল, তুই কার সাথে ডলাঘষা করে এসেছিস?" কন্ঠে সেই তেজ।
রুদ্র : "তোর নানির সাথে। হুহ" বিরক্তি ভরা স্বর রুদ্রর।
হিয়া : "আমার নানীর চুল সাদা। তাহলে, এটা লাল হলো কেমনে? আপনি কি পরকীয়ায় লিপ্ত হয়েছেন পতিবাবু?"😳
" আর একবার ফাউল কথা কইলে, ঠাটিয়ে আর একটা থাপ্পড় দিবো চোখের মাঝে জোনাকি জ্বলবে তোমার।" রেগে বলল রুদ্র।
"জোনাক আমি তোর জ্বালাবো। দাঁড়া! তোর মা'কে ফোন করে বলি, তুই পরকীয়া করতেছিস।"
#চলবে~