ফন্ট সাইজ:
থিম:
সে ছিলো অন্যরকম

১৪তম পর্ব

লেখক: পুষ্পিতা মেহরীন তিশা

#সে_ছিলো_অন্যরকম

#পুষ্পিতা_মেহরীন_তিশা

#পর্ব- ১৪

সকালে হিয়ার ঘুম ভাঙলো গরম কিছুর অনুভবে। হিয়া ঘুমের মাঝেই অনুভব করলো, যেন তার শরীরের চারপাশে কেউ গরম জ্বালানি রেখে দিয়েছে। শরীরটা পুড়ছে খুব। সে অনুভব করছে ঠিকই কিন্তু ঘুমের আদুরে চোখ মেলতে পারছে না।

হঠাৎ তার মনে হলো, যেন গরম কিছু তাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। ভয়ে চট করে চোখ খুললো সে। কিন্তু, উঠতে গিয়ে যেন কিছুর বাঁধা পেলো। পাশ ফিরে চাইতেই সে যা দেখলো, তাতে মুখটা নিজে থেকেই হা হয়ে গেলো।

সে রুদ্রর বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়ে আছে। রুদ্র আষ্টেপৃষ্টে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে তাকে। যেন ছেড়ে দিলেই পালিয়ে যাবে! রুদ্রর থুঁতনিটা হিয়ার চুলের ওপর ঠেকেছে। খুব শক্ত করে চেপে ধরে আছে রুদ্র তাকে। হিয়ার মনে হলো, সে যেন স্বপ্ন দেখছে। খুব সুন্দর একটা স্বপ্ন।

বিয়ের পর আজই প্রথম যখন সে রুদ্রর বুকে মাথা রেখেছে। রুদ্র নিজে থেকে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। অন্য সময় হলে হয়তো, হিয়া আরও কিছু সময় এই অনুভব টা নিতো। ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকতো রুদ্রর বুকে। হাজার ডাকলেও হয়তো উঠতো না। কিন্তু, এখন সে এটা করতে পারবে না। কারণ, রুদ্রর গায়ে অনেক জ্বর। হিয়া নিজেই নিজেকে বোঝালো,

"লিসেন হিয়া! রুদ্রর সারা শরীর পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। এখন তোর রোমাঞ্চ করার সময় নয়। এখন সময় তোর স্বামীর সেবা যত্ন করার। বুঝতে পেরেছিস?"

হিয়া ধীরে ধীরে রুদ্রর বাঁধন থেকে আলগা হয়ে উঠে বসল। হাত রাখলো রুদ্রর কপালে— যেন আগুন জ্বলছে সেখানে! ক্লান্তিতে চোখে মুখে ঘাম জমেছে, নিঃশ্বাস ভারী।

সে কয়েকবার ডাকলো রুদ্রকে, কোনো সাড়া পেলো না। হিয়া উঠে ওয়াশরুমে চলে গেলো। নিজে ফ্রেশ হয়ে, হাতে করে দুইটা বালতি আর একটা মগ আনলো। যার একটা বালতি খালি অন্যটা পানি ভর্তি। রুদ্রর চোয়ালে হাত রেখে তাকে ডাকলো হিয়া।

"রুদ্র! রুদ্র.. একটু উঠে বসো প্লিজ!" রুদ্রর মাথার নিচে হাত রেখে হিয়া তাকে সাহায্য করতে চাইলো।

"হঠাৎ করে তোমার এতো জ্বর কিভাবে আসলো? ইশশ! জ্বরে শরীরটা পুড়ে যাচ্ছে! এখন যে কি করি আমি!"

রুদ্রর চোখ বন্ধ। তাকাতে পারছে না সে, জ্বালা হচ্ছে চোখে..! রুদ্র ভাঙা কাঁপা গলায় বলল,,

"এই সবটা হয়েছে তোমার জন্য!"

হিয়া রুদ্রকে বসানের চেষ্টা করতে করতে বলল,,

"আমার জন্য? আমি আবার কি করলাম?"

"তুমি ওভাবে আমার কপালটা ঘষলে আর কফি মারলে বলেই তো এমন হলো!"

"আসলেই কি তাই?" একটু চিন্তিত হয়ে বললো হিয়া।

"না নকলেই তাই!"

"পাজি ছেলে! আচ্ছা একটু উঠে বসো তো! আমি একা পারছি না তোমাকে উঠাতে! কতো ভারী তুমি!"

রুদ্র একটু চেষ্টা করলো উঠে বসার। কিন্তু পারলো না।

"আমি বসতে পারছি না হিয়া। কষ্ট হচ্ছে খুব। গা গোলাচ্ছে আমার!"

রুদ্রর কন্ঠটা কেমন কাতর শুনালো। হিয়ার বুকটা যেন ধক করে উঠলো। সে রুদ্রর মাথাটা বুকে চেপে ধরে বলল,,

"কিচ্ছু হবে না রুদ্র। সামান্য জ্বরই তো হয়েছে। সবার হয়, তুমি ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা করো না।"

হিয়া আর রুদ্র কে জোর করলো না। সে বিছানায় আড়াআড়িভাবে শুইয়ে দিলো রুদ্রকে। মাথায় পানি ঢেলে দিলো অনেকটা সময় নিয়ে। জলপট্টি ও দিলো। এখন শুধু শরীরটা মুছিয়ে ডাক্তার কে কল করতে পারলেই হয়।

হিয়া রুদ্রর ভেজা মাথাটা মুছিয়ে আলতো করে তাকে বালিশে হেলান দিয়ে আধশোয়া করে রাখলো। রুদ্রর চোখটা তখনো বন্ধ। হিয়া একটু সময় নিয়ে দেখলো তাকে।

মাত্র কয়েক ঘন্টাই তার বরের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ঠোঁট দুইটা বারবার শুকিয়ে যাচ্ছে, রুদ্র আবার তা জিহ্বা দিয়ে ভিজিয়ে নিচ্ছে। হিয়া বেশ খেয়াল করে দেখলো বিষয়টা। কেন জানি তার মনের মাঝে হুট করে দুষ্ট বুদ্ধি লাড়া দিলো।

আচ্ছা, কি এমন হবে? যদি হিয়া এখন টুপ করে তাকে একটা চুমু খেয়ে নেয়। রুদ্র তো এখন তাকে ধরে মারতে ও পারবে না। বেচারা দুর্বল উঠতেই তো পারবে না। এটাই সুবর্ণ সুযোগ, এ সুযোগ হাত ছাড়া করা যাবে না।

হিয়া এগিয়ে গেলো রুদ্রর দিকে। রুদ্র এখনো বারবার জিহবা দিয়ে ঠোঁট ভেজাচ্ছে। হিয়া সুযোগ বুঝে একটা গাঢ় চুমু খেলো তার ঠোঁটে। রুদ্র অবাক হলো ঠিকই, কিন্তু কোনো রেসপন্স করলো না। হিয়া সরে আসতেই সে আস্তে আস্তে চোখ খুলল। নরম সুরে বলল,,

"আমার দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছো তুমি!"

"একদম! এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাই না আমি! ভাবছি, আরও বিশেষ কোনোভাবে সুযোগটা কাজে লাগানো যায় নাকি!"

"আমার ফোনটা দাও তো!"

"কি করবে?"

"৯৯৯ এ কল করবো!"

"কেন?"

"ভাই! মান ইজ্জত ধামা ভরা না, একবার গেলে তা আর পাওয়া যাবে না! তোমার মতলব আমার ভালো ঠেকছে না! ইজ্জত বাঁচাতে পুলিশ ডাকা ছাড়া, আর কোনো উপায় আমি দেখছি না!"

একদমে কথাগুলো বলল রুদ্র। হিয়া হো হো হেসে দিলো। তার হাসি যেন থামছেই না।

"তাহলে তো ফোন তুমি কাল সকালের আগে পাবে না। কারণ, আজ তোমার সর্বনাশ না করে আমি ছাড়ছি না!"

এবারে তারা দুজন একসাথেই হেঁসে দিলো। হঠাৎ রুদ্র ডাকে ধ্যান ফিরলো হিয়ার। রুদ্র হাতে তুড়ি বাজিয়ে একটু জোরে ডাকলো তাকে,

"এই মেয়ে!"

ধড়ফড়িয়ে উঠলো হিয়া। ব্যস্ত হয়ে বলল, "হু"

"একা একা এভাবে বোকার মতো হাসছো কেন? জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছো নাকি?"

হিয়া বুঝতে পারলো, এতো সময় সে একা মনে কল্পনা করছিলো। নিজের মাথার একটা গাট্টি দিলো সে। তা দেখে রুদ্র কপালে ভাজ ফেলে বলল,,

"আবার কি হলো?"

"কিছু না। তুমি বসো আমি তোমার জন্য হালকা কিছু করে আনি। ডাক্তারকে কল করেছি সে চলে আসবে কিছু সময়ের মধ্যেই।

-

হিয়া মাত্র কিচেনে এসেছে রুদ্রর জন্য হালকা পাতলা কিছু করে নিতে। এখন তাকে কোনোভাবেই খালি পেটে রাখা যাবে না। ছকিনা খালা আজ দু'দিন কাজে আসছেন না, অবশ্য ছুটি নিয়েছেন তিনি। এতে করে হিয়ারই সব কাজ কাম করতে হচ্ছে।

হঠাৎ বাসার কলিং বেল বেজে উঠলো। হিয়া আপনমনে ভাবলো,, এই সময়ে আবার কে এলো? ডাক্তারকে তো সে একটু আগেই কল করলো। এর মাঝে চলে এলো?

আট-পাঁচ ভাবতে ভাবতে হিয়া দরজাটা খুললো। আর ওমনি ওর হাসিখুশি মুখটা প্যাঁচার মতো হয়ে গেলো। রাজ্যের সব রাগ, বিরক্তি, আর ক্ষোভ এসে জড়ো হলো তার চেহারায়। দরজার বাইরে থেকে হাত নেড়ে লারা বলল,,

"হ্যালো!"

"হেলছি!" বিরক্ত মাখা উত্তর হিয়ার।

"উমহু!" হিয়ার কথা বুঝতে না পেরে এমনই একটা শব্দ করলো লারা। হিয়া পুনরায় বিরক্ত হয়ে বলল,,

"কি চাই? এখানে কি চাই?"

"কিছু চাইতে আসি নাই। রুদ্রর সাথে দেখা করতে এসেছি!"

"কেন দেখা করতে এসেছেন?"

"ওকে কাল সন্ধ্যা থেকে কল করছি ধরছে না। আবার আজকে অফিসেও গেলো না তাই...!"

হিয়া একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ওয়াল ঘড়ির দিকে। মাত্র সাড়ে দশটা বাজে তাতে।

"এখন বাজে ১০:২৮। রুদ্র রোজ অফিসে যায় সকাল ৮:৩০ তে। অর্থাৎ, মাত্র দু'ঘন্টা লেট হয়েছে তার। আর এতেই আপনি বাসায় চলে আসছেন? অদ্ভুত তো!"

"আমাকে কি এখানেই দাড় করিয়ে রাখবেন? আমরা ভেতরে গিয়ে কথা বলি?" হালকা হেঁসে বলল লারা।

"না! ওখানে দাঁড়িয়েই বলুন। আমি শুনতে পাচ্ছি। কেন এসেছেন এখানে?"

"আসলে অফিসে আজ খুব বড়ো একটা ডিল আছে। সেটার জন্য রুদ্রকে প্রয়োজন তাই....."

"চুলোয় যাক আপনার ডিল! আমার রুদ্র আজ অফিসে যাবে না!"

"কেন যাবে না?"

"কারণ, ও অসুস্থ!"

কথাটা শুনেই চমকে উঠলো লারা। হিয়াকে সরিয়ে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে উত্তেজিত হয়ে বলল,,

"অসুস্থ? কেন? কি হয়েছে ওর?"

"সেই কৈফিয়ত কি এখন আপনাকে দিবো?"

"কৈফিয়ত তো চায়নি! শুধু জানতে চেয়েছি।"

"কিন্তু, আমি বলতে চাচ্ছি না!"

লারা হাসলো অদ্ভুত ভাবে। "আচ্ছা, ঠিক আছে! আমি নিজেই জেনে নিবো!"

বলেই সে পা বাড়ালো সিঁড়ির দিকে, হিয়া ছুটে গিয়ে দাঁড়ালো তার সামনে।

"কোথায় যাচ্ছেন মিস লারা?"

"ওপরে!"

"কেন?" কপালে ভাজ ফেলে বলল হিয়া।

"রুদ্রর সাথে দেখা করতে!"

"রুদ্র কি আপনার বিয়ে করা বর লাগে?" কটাক্ষ করে বলল হিয়া।

"মানে?" ভ্রু কুঁচকে শুনলো লারা।

"মানে, তখন থেকে যেভাবে রুদ্র রুদ্র বলছেন। তাতে মনে হচ্ছে, রুদ্র আপনার বর হয়? বস হয় ও আপনার, ওকে স্যার বলে সম্বোধন করবেন। ফারদার যেন রুদ্র বলতে না শুনি!"

"রুদ্র কিন্তু আমার বন্ধুও হয়!" হালকা হেঁসে বলল লারা।

"গুষ্টি কিলাই আপনার বন্ধু্ত্বের! রুদ্রর কোনো মেয়ে বন্ধু নাই। আপনি ওকে স্যার ডাকবেন মানে স্যারই ডাকবেন!"

"সেদিন অফিসে আপনার কথা শুনে আমি আপনাকে বুদ্ধিমতী এবং ম্যাচিউর মেয়ে ভেবেছিলাম। কিন্তু, এখন আপনার বিহেভিয়ার দেখে তো অন্য কিছু মনে হচ্ছে!"

"হুহ! সে তো আমিও আপনাকে ভদ্র ঘরের মেয়ে ভেবেছিলাম। তাই ঠান্ডা মাথায় বুঝিয়ে ছিলাম আপনাকে। কিন্তু, এখন দেখি আপনি আস্ত একটা নির্লজ্জ! আমার এতো অপমানের পরও, খুঁজে খুঁজে আমার বাড়ি চলে আসলেন?"

"আপনার বাড়িতে আসা মেহমানদের সাথে কি আপনি এমন অসভ্যের মতো ব্যবহার করেন?"

"প্রথমত, কোনো চরিত্রহীন,নির্লজ্জ মেয়েকে আমি আমার মেহমান মনে করি না। আর দ্বিতীয়ত, সভ্যতা কি এখন আমাকে আপনি শেখাবেন?"

"প্রয়োজন হলে তাই শেখাব। আমি আবার এসবে খুব দক্ষ।"

হিয়া মাথায় হাত দিয়ে মনে মনে বলল,, "ওরেহ শালী! আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে তুই আমাকেই অসভ্য বলিস। তুই শালী বের হ আমার বাড়ি থেকে।"

এবারে সে মুখ ফুটিয়ে বলল,, "বের হন আমার বাসা থেকে!"

লারা কয়েকটা সিঁড়ি পর্যন্ত গিয়েছিলো, হঠাৎ-ই হিয়া তার ডান হাত চেপে ধরে কথাটা বলল। মুখে তার একরাশ বিরক্তি।

"মানে?" ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলো লারা।

"মানে অসভ্যতা কাকে বলে, সেটাই দেখাচ্ছি আপনাকে। বের হন আমার থেকে। আমার স্বামীর সাথে আমি আপনার মতো ভদ্র মহিলাকে দেখা করাবো না!"

"আর ইউ ক্রেজি মিসেস হিয়া!"

"ক্রেজির থেকেও বড়ো যদি কোনো ফ্রেজি থেকে থাকে তাহলে আমি সেটাই! এখন আপনি বের হন আমার বাসা থেকে।"

সে লারাকে আর কিছু বলার সুযোগ দিলো না। লারার হাত ধরে টানাটানি শুরু করলো তাকে বের করার জন্য। অন্যদিকে, লারা সিঁড়ি ওপরের রেলিং চেপে ধরলো জোরে।

"এসব কি হচ্ছে হিয়া!"

হঠাৎ ওপরের বারান্দা থেকে একটা গম্ভীর স্বর ভেসে এলো। হিয়া আর লারা একসাথে তাকালো সেদিকে। রুদ্র দাড়িয়ে আছে। রেলিং ধরে। চোখ-মুখ গম্ভীর হয়ে আছে। তির্যক চাহনি তার হিয়ার ওপর।

তাকে দেখা মাত্রই লারা হিয়ার থেকে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলো কিন্তু হিয়া আরও জোরে চেপে ধরলো তাকে। অগ্নি দৃষ্টি দিয়ে বুঝালো,

"এরকম হাজারটা রুদ্র আসলেও, আজ তোকে আমার হাত থেকে ছাড়াতে পারবে না।"

"রুদ্র!" ন্যাকামি সুরে ডাকলো লারা।

"তুমি ওর হাত কেন চেপে ধরেছো?" গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করলো রুদ্র। হিয়া স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলো,

"কারণ, ও আমাকে অসভ্য বলেছে।"

লারা হাত নাড়িয়ে রুদ্রকে কিছু বলতে নিলো, মানে এক্সকিউজ দিতে গেলো আরকি। কিন্তু রুদ্র, হাত উঁচু করে তাকে থামিয়ে দিলো। হিয়ার উদ্দেশ্য বলল,

"তাই বলে তুমি ওকে বাসা থেকে বের করে দিবে?"

"হ্যাঁ!" একটু থেমে হিয়া আবার বলল,, "তুমি না জ্বরে উঠতে পারছিলে না। তাহলে এখন এখানে কিভাবে এলে?"

রুদ্র তার কথার উত্তর দিলো না। গম্ভীর কন্ঠে বলল,,

"ওর হাতটা ছেড়ে দাও হিয়া। ওপরে আসতে দাও ওকে!"

বলেই রুমের দিকে যেতে নিলো রুদ্র তার আগেই হিয়া কাটা উত্তর দিলো,

"না!"

রুদ্র ফিরে তাকায়। আগের থেকে একটু বেশি গম্ভীর হয়ে বলে,

"হিয়া! তুমি ভুলে যাচ্ছো, ও আমার এমপ্লয়ি হয়।"

"আর তুমি ভুলে যাচ্ছো, আমি তোমার স্ত্রী হই!" এবারে হিয়ার কন্ঠ ও গম্ভীর হলো।

-

রুদ্র আর কোনো জবাব দিলো না। চলে গেলো নিজের রুমে। হিয়া লারার হাতের বাঁধন একটু আলগা করতেই লারা তাকে ঝারি মেরে উপরে চলে গেলো। হিয়াও গেলো পিছু পিছু।

লারা রুমে ঢুকেই, রুদ্রর কপালে হাত দিয়ে বলল,,

"রুদ্র কি হয়েছে তোর? হঠাৎ এমন জ্বর কিভাবে আসলো? কি করে বাঁধালি এমন জ্বর? আচ্ছা, ডাক্তার ডেকেছিস তো নাকি...."

লারার এসব কথায় হিয়ার শরীরটা যেন জ্বলে যাচ্ছে। সে ছুটে গেলো লারার কাছে, রুদ্রর শরীর থেকে তার হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,,

"না ডাকিনি! আপনি এসে ডাকবে তাই বসে আছি!"

লারা একবার তাকালো হিয়ার দিকে। কিন্তু কোনো জবাব দিলো না। ফের রুদ্রকে বলল,,

"রুদ্র আমি...."

তার কথা শেষ হওয়ার আগেই হিয়া গর্জে উঠে বলল,

"এই মেয়ে! কি তখন থেকে রুদ্র রুদ্র করে যাচ্ছেন? আপনাকে বলেছি না ওকে স্যার ডাকতে! ও বস হয় আপনার ঘরের জামাই নয়!"

"শুধু কি ঘরের জামাই কেই মানুষ নাম ধরে ডাকে? আর কাউকে ডাকে না?"

"হ্যাঁ, ডাকে তো! মা তার ছেলেকে নাম ধরে ডাকে! তো আপনি কি ওর মা?"

লারা কিছু বলার আগেই রুদ্র বলল,,

"তোমার সমস্যা কি হিয়া?"

"সমস্যা যাইহোক, সমাধান একটাই! লারা এক্ষুনি এই বাসা থেকে বের হবে, আর অলওয়েজ তোমাকে স্যার ডাকবে!"

"বন্ধু হয় ও আমার!"

"হ্যাঁ তো?" কপালে ভাজ ফেলে বলল হিয়া।

"তো ও আমাকে নাম ধরে ডাকতেই পারে।"

"না পারে না। আমি চাই না কোনো বাইরের মেয়ে তোমাকে নাম ধরে ডাকুক!"

"তোমার চাওয়া বা না চাওয়াতে কিছুই যায় আসে না। ও আমাকে নাম ধরে ডাকে মানে, নাম ধরেই ডাকবে!"

হিয়া পিছিয়ে গেলো কয়েক কদম। ভেঙে আসলো শরীরটা। দাঁড়িয়ে থাকতেই খুব কষ্ট হচ্ছে তার। চোখ দুটো ভরে উঠেছে পানিতে। সে ভাঙা গলায় প্রশ্ন করলো,,

"আ..আসলেই তোমার..তোমার কিছু যায় আসে না!"

রুদ্র ঘাড় ঘুরিয়ে নিলো হিয়ার থেকে। মুখটা আড়াল করলো, চোখের ওপর হাত দিয়ে। লারা বলে উঠলো,,

"এক কথা কতোবার বলতে হয় তোমাকে?"

"আমি আপনার সাথে কথা বলছি না মিস লারা। স্বামী-স্ত্রীর পার্সোনাল ব্যাপারে নাক গলানো বন্ধ করুন!"

লারা তাচ্ছিল্য সুরে হেঁসে বলল,,

"ওহ আচ্ছা! এটা স্বামী-স্ত্রীর পার্সোনাল বিষয়। সরি! আমি না বুঝতে পারি নাই!"

শেষ কথাটা মুখ টিপে হেঁসে বলল লারা। রুদ্র কোনো প্রতিবাদ করলো না। গার্ড করলো না হিয়াকে। হিয়া আরও কয়েকবার ডাকলো রুদ্রকে। উত্তরে রুদ্র শুধু বলল,,

"আমি ঘুমাবো। এখন কথা বলতে চাচ্ছি না। লারা তুই এখানে বসেই মিটিং টা কর! প্রয়োজন হলে আমাকে ডাকিস!"

"ওকে রুদ্র!" মিষ্টি হেঁসে বলল লারা।

ওদিকে অবশ হয়ে গেলো হিয়া। সে দৌড়ে বের হয়ে যেতে চাইলো রুম থেকে। কিন্তু পারলো না। লজ্জায় সে পা টাও নাড়াতে পারছে না। দৌড়ে যাওয়া তো অনেক দূরের কথা। লারার কাছে খুবই বাজে ভাবে ছোট হয়েছে সে। আর এখন লজ্জায় না সে এখানে দাঁড়াতে পারছে, আর না বের হতে পারছে।

-

বেশ অনেকটা সময় পর, হিয়া রুম থেকে বের হয়ে বসার ঘরে গেলো। গিয়ে বসলো সোফাতে। দু'হাতে মাথার চুলগুলো টেনে ধরলো। নিজের কাছে নিজেকে খুব ছোট লাগছে হিয়ার। আজ রুদ্র একটা বাইরের মেয়ের সামনে তাকে অবহেলা করেছে, অপমান করেছে খুব বাজে ভাবে। বুঝিয়ে দিয়েছে, তাদের মাঝের সম্পর্ক আর পাঁচটা স্বামী-স্ত্রীর মতো নয়। হিয়া ছোট হয়ে গেছে। ওই লারা নামক মেয়েটার কাছে ছোট হয়ে গেছে সে। এখন তো হিয়া আর কোনোদিন ওই মেয়ের সামনে মুখ তুলে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারবে না। কখনো তাকাতে পারবে না লারার চোখের দিকে। লারার কাছে হাসির পাত্রী হয়ে গেলো সে। হিয়ার ইচ্ছে করছে মরে যেতে। আজকের দিনটা সে কখনো ভুলবে না। জীবনের শ্রেষ্ঠ অপমানটা সে আজ বোধ করলো।

হিয়ার কান্না আসছে না। একটুও কান্না আসছে না তার। তবে বুকের ভেতরটা ব্যাথা হচ্ছে। খুবই তীব্র ব্যাথা অনুভব হচ্ছে সেখানে। দম নিতেও কষ্ট হচ্ছে হিয়ার। এখন কি করবে সে? কি করা উচিত তার?

হিয়ার ভাবনায় ছেদ পড়লো। কলিং বেলের আওয়াজে। সে উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলো। ডাক্তার আঙ্কেল এসেছে। হিয়া তার সাথে সৌজন্যমুলক কথা বললো। এরপর তাকে উপরে রুদ্রর কাছে নিয়ে গেলো।

রুদ্র কপালে হাত রেখে শুয়ে আছে। আর তার পায়ের কাছে রুদ্রর ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে লারা। ডাক্তার আসতেই লারা ল্যাপটপ রেখে উঠে দাঁড়ালো।

ডাক্তার রুদ্রকে দেখে ঔষধ পত্র দিয়ে দিলেন, সাথে দিলেন এক গাদা পরামর্শ। এই পুরোটা সময়, ডাক্তারের সাথে লারা এমন ভবে কথা বলছিলো যেন সে-ই রুদ্রর স্ত্রী হিয়া নয়।

চেক-আপের শেষে, লারা রুদ্রকে ধরে শুইতে দিতে গেলো। যেটা দেখে হিয়া এগিয়ে গেলো ডাক্তারকে বিদায় দিতে। হিয়া নিচে তো নামলো। কিন্তু পুরা আধঘন্টা হয়ে গেলো সে আর ওপরে উঠলো না। ছেড়ে দিলো তাদের কে একা।

#চলবে~

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন