ফন্ট সাইজ:
থিম:
সে ছিলো অন্যরকম

১৫তম পর্ব

লেখক: পুষ্পিতা মেহরীন তিশা

#সে_ছিলো_অন্যরকম🥀

#পুষ্পিতা_মেহরীন_তিশা

#পর্ব- ১৫

"আমরা হয়তো একটু বেশিই করে ফেলেছি রুদ্র। মেয়েটা হয়তো অনেক কষ্ট পেয়েছে। এতোটা ব্যাড বিহেভ না করলেও চলতো!"

রুদ্রর দিকে তাকিয়ে কাতর স্বরে কথাগুলো বলল লারা। রুদ্র চোখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে তাকালো তার দিকে। শান্ত স্বরে বলল,,

"আমি তো চাই ও কষ্ট পাক। অনেক কষ্ট পাক। তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে দূরে সরে যাক আমার থেকে!"

"কিন্তু, তাই বলে এভাবে...."

লারা তার কথা শেষ করতে পারলো না। তার আগেই রুদ্র উঠে বসতে বসতে ব্যাথিত সুরে বলল,,

"জানিস লারা! হিয়ার এই চাঞ্চল্যরুপ আমাকে অনেক প্যারা দেয়। ওর এই হাসি, এই দুষ্টামি, এই কেয়ার, ভালোবাসা আমাকে বারবার ওর কাছে টানে। নিজেকে সামলানো দায় হয়ে পড়ে আমার। বারবার মনে হয়, ওকে একটু ভালোবাসি। কাছে টেনে বুকে আগলে রাখি ওকে। নিজের সবটা উজার করে ভালোবাসি ওকে। কিন্তু... "

"কিন্তু, কি রুদ্র? তুই যখন হিয়াকে এতোই ভালো বাসিস, এতোই চিন্তা করিস ওকে নিয়ে। তাহলে বারবার কেন ওকে কষ্ট দিস? কেন দূরে ঠেলে দিস নিজের থেকে? এ তোর কেমন ভালোবাসা রুদ্র?"

একদমে কথাগুলো বলল লারা। অন্যদিকে রুদ্র সামান্য হাসলো মাত্র। অদ্ভুত হাসি, কিছু একটা ছিলো ওই হাসিতে। সে একটু সময় নিয়ে ধীরে বলল,,

"বিষয়টা এমন নয়, যে আমি হিয়াকে চাই না! বিষয়টা এমন আমি চাইলেও ওর কাছে যেতে পারি না।"

লারা কপালে ভাজ ফেলে গভীর দৃষ্টিতে তাকালো রুদ্রর দিকে। রুদ্র আবার বলল,,

"আমি যখনই সবটা ভুলে ভালোবাসার চেষ্টা করি,ওর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করি! ঠিক তখনই!তখনই আমার সামনে অতীতের এমন কিছু স্মৃতি ভেসে উঠে যে আমি চাইলেও ওকে ছুঁতে পারি না। ভালোবাসতে পারি না ওকে। বুকের ভেতরটা জ্বলে উঠে ভীষণ ভাবে। বারবার মনে হয়, এই মেয়েটা একটা খুনী! একে ঘৃণা তো অবশ্যই করা যায়, কিন্তু ভালোবাসা যায় না!"

রুদ্র থামলো। টুপ করে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো তার গাল বেয়ে। লারা শান্ত কন্ঠে বলল,,

"তোদের মাঝে কি নিয়ে এতো দূরত্ব রে? কি এমন অতীত আছে তোদের? যা তোদের মাঝে এতোটা ভালোবাসা থাকর পরও তোদেরকে এক হতে দেয় না?"

"শুনতে চাস তুই?"

"ভীষণ ভাবে!"

রুদ্র মলিন হাসলো। একটু থেমে বলল,,

"বলবো নাহয়! পরে কোনোদিন। আজ বরং থাক!"

লারা কিছু বললো না, চুপ করে রইলো। রুদ্র আবার বলল,, "থ্যাংস লারা!"

"কিসের জন্য?" কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করলে লারা।

"এই যে, তুই আমাকে এতো বড়ো হেল্প করলি। তুই সাহায্য না করলে তো আমি হিয়াকে আমার থেকে দূরে করতেই পারতাম না। উল্টো, আমি হয়তো আবার ওকে ভালোবাসার মতো বড়ো ভুল করে ফেলতাম!"

"আফসোস হচ্ছে আমার!"

"কেন?"

"তোকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য! মেয়েটা অনেক কষ্ট পেয়েছে রুদ্র। কাজটা তুই মোটেই ভালো করিস নি.."

"আমি তোকে থ্যাংস দিয়েছি! জ্ঞান দিতে বলিনি!" একটু বিরক্ত গলায় বলল রুদ্র।

"তাহলে, আমিও তোকে থ্যাংস দিতে বলিনি!"

রুদ্র হালকা হাসলো লারার কথায়। মনে করলো সেদিন অফিসের কথা। যখন সে লারার সাথে হিয়াকে নিয়ে ডিল করেছিল!

~

সেদিন হিয়া অফিস থেকে বের হওয়ার বেশ খানিকটা পর লারা রুদ্রর কেবিনে যায়। রুদ্র তখন কিছু ফাইল চেক করছিলো। লারা চেয়ার টেনে বসতে বসতে উদগ্রীব হয়ে রুদ্রকে বলল,,

"ভাই রে ভাই! আমি আজকে শেষ! আমি সহ আমার সম্মান সব আজ ফুরুৎ!"

লারার কথায় রুদ্র ফাইল থেকে চোখ তুলে তাকালো তার দিকে। শান্ত স্বরে বলল,,

"কেন? কি হয়েছে?"

"আরে ভাই! কি হয়নি সেটা বল। তোর বউ আজ আমাকে যেই থ্রেট দিয়েছে। তাতে আমার মান-মর্যাদা সব ওপর ওয়ালার কাছে চলে গিয়েছে!"

রুদ্র মুচকি হাসলো। ফাইলের ওপর চোখ রেখে ধীরে বলল,,

"আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় কর! যে ও তোকে ঠান্ডা মাথায় কথাগুলো বলেছে। গালিগালাজ করেনি!"

"মানে? হিয়া কি গালিগালাজ ও করে?" অবাক হয়ে বলল লারা।

"না ঠিক গালি দেয় না। তবে যে উগ্র আচরণ করে।" কপাল টানলো রুদ্র। তারপর আবার বলল,, একদিন রেকর্ড করে এনে শোনাবো তোকে! ঠিক আছে?"

"সে নাহয় বুঝলাম। কিন্তু, হিয়া আমাকে কি বলেছে সেটা তুই কিভাবে জানলি? তার মানে তুই কি....?"

চোখ ছোট করে বলল লারা। তবে তার কথা কেড়ে নিয়ে রুদ্র বলল,,

"তোর কেবিনের সামনেই দাড়িয়ে ছিলাম!"

"ওরেহ! বাটপার! যাইহোক, রুদ্র হিয়া কিন্তু তোকে অনেক ভালোবাসে। ও তোর প্রতি খুব প্রসেসিভ!"

রুদ্র চমকে উঠে ডেস্কে থাবা দিয়ে বলল, "ভাগ্যিস তুই বললি! নাহলে, তো আমি জানতেই পারতাম না!"

লারা যেন একটু লাফিয়ে উঠলো। বুকে হাত দিয়ে বলল, "ফাজিল ছেলে!"

তারা দুজনেই এক সাথে হাসলো। একটু থেমে রুদ্র বলল,, "লারা তোর থেকে আমার একটা হেল্প চাই। করবি?"

"কি হেল্প?"

"প্রেম করবি আমার সাথে?" খাপছাড়া ভাবে বলল রুদ্র।

লারা চমকে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। হালকা চিল্লিয়ে বলল,, "কিহ? মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর? মজা নিস আমার সাথে?"

রুদ্র লারার কথার উত্তর দিলো না। চেয়ার ছেড়ে উঠলো সে। দু'আঙুলে কলম ঘোরাতে ঘোরাতে ঠান্ডা মাথায় বলল,,

"দেখ! হিয়া তোকে নিয়ে জেলাস! ও মনে করে আমি আমি তোকে পছন্দ না করলেও, তুই আমাকে ভালোবাসিস। আমার পিছে ঘুরিস তুই। আর আমি ওর এই সন্দেহ টাকেই কাজে লাগাতে চাই।"

কথা শেষ করে রুদ্র ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো লারার দিকে। লারা ইমোশনাল হয়ে বলল,,

"হিয়া তো ঠিকই ভাবে রুদ্র। আমি তো সত্যিই তোকে পছন্দ করি!"

"ইমোশনাল কথা বলে, ইমোশন ড্যামেজ করিস না। যেটা বলছি সেটা শোন!"

লারা পুনরায় চেয়ারে বসে বলল, "আচ্ছা বল!"

"দেখ! তুই তো জানিস হিয়ার সাথে আমার কিছু পার্সোনাল সমস্যা আছে। যেই কারণে, আমি হিয়ার প্রতি আমার ভালোবাসা টাকে প্রকাশ করি না। অলওয়েজ ওকে হার্ট করার চেষ্টা করি।"

"হুম।" সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো লারা। রুদ্র তার চেয়ারে বসে, আঙুলে কলম ঘোরাতো ঘোরাতে আবার বলল,,

"কিন্তু, ইদানীং না হিয়াটা বদলে গেছে। ও আর আগের মতো চুপচাপ থাকে না। ওর ভেতরে আমার প্রতি সেই ভয়, সেই সংকোচ আর কাজ করে না। উল্টো, ও এখন আমাকে অনেক জ্বালায়। ঠেক সেই ভার্সিটি লাইফের মতো। আর ওর এই সব আচরণ আমাকে আগের পুরনো সুন্দর স্মৃতি গুলো মনে করায়। দুর্বল করিয়ে দেয় ওর ওপর, যেটা আমি হতে চাই না।"

"কেন?" ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো লারা। তার দিকে চেয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললো রুদ্র। মৃদু স্বরে বলল,

"সেই কেন কথার উত্তর আমি তোকে দিতে চাই না। এখন বল তুই আমাকে সাহায্য করবি কিনা?"

"কিভাবে?"

"এই যে, তুই আমার প্রেমিকার চরিত্রে অভিনয় করবি। যদিও, এতে আমিও তোকে সঙ্গ দিবো। এরপর হিয়া আমাকে ভুল বুঝবে, কষ্ট পেয়ে দূরে সরে যাবে। তখন আমার আর ওপর দুর্বল হওয়ার কোনো চান্সই থাকবে না। যদিও আমি শুরু থেকেই ওর ওপর দুর্বল, কিন্তু এখনকার মতো সচারাচর ভুল করতে ইচ্ছে হবে না। এই আরকি..!

" ভুল মানে?" কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করলো লারা। রুদ্র বিরক্তিকর চোখে তাকিয়ে, টেনে টেনে বলল,,

"রোমাাাাাাঞ্চ!"

লারা ভ্রু দুইটা উপরে টানলো রুদ্রর কথা শুনে। সিরিয়াস হয়ে বলল,,

"আচ্ছা, রুদ্র তোর ভয় লাগছে না?"

"কেন?" ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো রুদ্র।

"এইযে, আমি তোকে সত্যি সত্যি পছন্দ করি। এটা জেনেও, তুই আমাকে অভিনয় করতে বলছিস। আমি যদি সত্যি সত্যি তোদের মাঝে দূরত্ব বাড়িয়েই দেই। যদি ফাঁসাই তোকে?"

লারার কথায় হো হো করে হাসলো রুদ্র। লারা হয়তে তাতে বিরক্ত হলো। জিজ্ঞেস করলো,

"এভাবে হাসছিস কেন?"

"তোর কথা শুনে!" হাসতে হাসতে উত্তর দিলো রুদ্র।

"আমি কি হাসির কোনো জোঁকস বলেছি?"

রুদ্র এবার হাসি থামালো। সিরিয়াস মুডে এসে মুখে হাসি নিয়ে বলল,,

"ভয় তো দূর। তোকে একটু সন্দেহও করছি না আমি লারা। কারণ, আমি জানি তুই কেমন!"

রুদ্রর কথায় মলিন হাসলো লারা। রুদ্রর কথাটা হয়তো ছোট, তবে তার গভীরতা অনেক বেশি। সেখানে আছে বিশ্বাস, আছে ভরসা আর কিছুটা ভালোবাসা।

হঠাৎ লারা আগের রুপে ফিরলো। উঠে দাড়িয়ে হাত নাড়িয়ে বলল,

"হুমমম বুঝলাম! কিন্তু এ ব্যাপারে আমি তোকে সাহায্য করতে পারবো না।"

"কেন?"

"কারণ, জীবন একটাই ভাই। তোর বউ অনেক ডেঞ্জারাস, অলরেডি মান-সম্মান খেয়ে দিয়েছে। এখন লাইফটা নিয়ে আর রিস্ক নিতে চাই না।"

রুদ্র হাত দিয়ে ডেস্কে হালকা শব্দ করে, চাঞ্চল্য সুরে বলল,,

"আরে কুছ নেহি হো'গা তেরা। মে হু না?"

~

রুদ্রর ভাবনার সুতা ছিঁড়ল লারার কথায়। লারা ফোন দেখতে দেখতে বলল,

"আমি কাল রাত ৮টার দিকে তোকে কয়েকবার কল করেছিলাম। কিন্তু, কল কানেক্টেড হলো না কেন?"

রুদ্র হেঁসে বলল,, "হিয়া ব্লক করেছিলো তোকে!"

লারাও হেসে উঠে বলল, "কিহ?"

"হ্যাঁ, আজ সকালে এখানে আসার কথা বলার জন্য, কাল রাত ২টার দিকে যখন তোকে কল করতে গিয়েছি। দেখি তোর নাম্বারের আগে, গোল ক্রস চিহ্ন ঝুলছে। পরে আনব্লক করে তোকে কল করেছি।"

লারা আবারো হাসলো। একটু থেমে বলল, "রুদ্র হিয়া নিচে নেমেছে বেশ অনেকটা সময় হলো। এখনো কিন্তু আসলো না।"

রুদ্র কোলের ওপর বালিশ নিতে নিতে বলল,, "ডাক দে তো ম্যাডামকে!"

"আমি ডাকলে আসবে ও?"

"তাহলে গিয়ে নিয়ে আয়।"

"অপমান করবে আমাকে!" মুখটা মলিন করে বলল রুদ্র।

"সহ্য করে নিবি! খবরদার, আমার বউকে কিন্তু, আর একটুও চেতাবি না!"

শেষ কথাটা সর্তক করে বলল রুদ্র। লারা হাসলো। এরপর হিয়াকে ডাকতে ডাকতে নিচে নামলো।

হিয়া বসারঘরে সোফায় গুটিসুটি মেরে বসে আছে। দু'হাটুর ওপরে দু'হাত ভাজ করে রেখে, তাতে মাথাটা এলিয়ে দিয়েছে। তবে, কাঁদছে কিনা সেটা বোঝা যাচ্ছে না। লারা সিঁড়ি থেকে নেমে ধীর পায়ে এগোলো হিয়ার দিকে। তার বেশ খারাপ লাগছে হিয়াকে এভাবে দেখে। কিন্তু, তার তো কিছুই করার নাই।

সামনে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে মাথা তুলে তাকালো হিয়া। লারা দেখা মাত্রই মুখটা ঘুরিয়ে নিলো। লারার চোখের দিকে তাকাতে যে তার বড্ড লজ্জা লাগছে। নিজের আত্মসম্মানে বাঁধছে। অসহায় মনে হচ্ছে নিজেকে।

বেশ অনেকটা সময় হয়ে গেলো হিয়া কোনো রেসপন্স করলো না। অগত্যা লারা গিয়ে বসলো তার পাশে। হিয়া আরও গুটিয়ে নিলো নিজেকে। লারা একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো জোরে। এরপরে সোফায় মাথা এলিয়ে দিয়ে বলল,,

"কখনো বাঘিনী,কখনো বিড়াল! অবহেলার কি নিষ্ঠুর পাওয়ার!"

হিয়া কোনো কথা বললো না। শুধু একটু নড়ে উঠলো। লারা একটু থেমে আবার বলল,,

"তো! মিসেস মেহেজাবিন চৌধুরী আপনি কাঁদছেন নাকি? কষ্ট হচ্ছে আপনার?"

লারার কটাক্ষ করা কথাটা হিয়া বুঝলো। পাশাপাশি এটাও বুঝলো, সে ভাঙলেও তাকে মচকানো যাবে না। কারণ, হিয়া বিশ্বাস করে, মানুষ শক্তের ভক্ত নরমের যম! নরম জায়গা পেলেই তারা সেখানে থাবা বসায়। হিয়া মাথা তুলে গম্ভীর স্বরে বলল,,

"কেন এসেছেন এখানে? কি চাই আপনার?"

"চাই তো অনেক কিছু। কিন্তু, চাইলেই কি দিবেন আপনি?"

"একবার চেয়েই দেখুন না! হিয়ার আবার দান-খয়রাতের হাতটা বেশ ভালো। হতেই পারে, সে আপনার চাওয়াকে দান করলো!"

হিয়ার মুখে এক অদ্ভুত বিদ্রুপের হাসি। তার কথাটা শুনে লারাও মলিন হাসলো। মনে মনে বললো,,

"তুমি অনেক স্ট্রং হিয়া। তোমাকে ভাঙা আমার কর্ম না। সেটা হয়তো, একমাত্র রুদ্রই করতে পারবে।"

এরপর মুখে বলল,,

"নাহ! আপাতত বড়সড় কিছু চাই না। এক কাপ কফি করে দিলেই হবে৷ দিবেন নাকি এক কাপ কফি?"

হিয়া চোখ তুলে তাকালো তার দিকে৷ এরপর গম্ভীর স্বরে বলল,,

"কফি নাই। শেষ হয়ে গেছে।"

"ওহ আচ্ছা! তাহলে এক কাপ চা করে দিন!"

"বাসায় চিনি নাই।"

লারা বুঝলো হিয়া জেলাসে এসব বলছে। সে মুচকি হাসলো তবে হাসিটা হিয়াকে আড়াল করলো মুখে হাত দিয়ে। থেমে আবার বলল,,

"আচ্ছা সমস্যা নাই। আমি চিনি ছাড়া চা খাইতে জানি।"

"কিন্তু, আমি চিনি ছাড়া চা দিতে জানি না!"

দাঁত চেপে বলল হিয়া। লারা যেন বেশ মজা পেলো। আবার বলল,,

"তাহলে, এক কাপ সরবত করে দিন। গরমে ওটাই বেস্ট হবে।"

"লেবু নাই।"

লারার এবার খুব জোর হাসি পেলো। কিন্তু, হাসতে পারলো না। সে হিয়াকে আরেকটু জ্বালাতে বলল,,

"আপনাদের বাসায় কি কিছুই নেই?"

হিয়া গর্জে বলে উঠলো,,

"না কিছুই নেই। আর যেটা আছে, সেটা তো আপনি কোলে নিয়েই বসে আছেন!"

_

কেটে গেলো আরও চার'দিন। রুদ্র এখন অনেকটা সুস্থ। যদিও সামান্য জ্বরে তার এই চারদিনে ভালো ভাবে সুস্থ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু হিয়ার অবহেলায় সেটা আর হয়ে ওঠেনি। সেই দিনের পর থেকে হিয়া চুপচাপ হয়ে গেছে। এখন তাকে হাজারটা কথা বললে সে খুব ভেবে চিন্তে দু'একটা উত্তর দেয়। হুটহাট আর দুষ্টামি করে না। রুদ্রকেও আর জ্বালায় না। ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া টাও করে না। হিয়া নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। যতোটা পেরেছে, ততোটা বদলেছে নিজেকে।

এই যেমন, আজ চারিদন পরে রুদ্র অফিসে যাবে। এটা রুদ্র তাকে কাল রাতেই বলেছিলো। এজন্য সে সকাল সকাল উঠে, ব্রেকফাস্ট রেডি করেছে। রুদ্রর পোশাক, ঘড়ি, রোমাল সবকিছু গুছিয়ে দিয়েছে। কিন্তু রুদ্রর সামনে যায়নি। তার দায়িত্ব টুকু পালন করেই সে এখানে-ওখানে গিয়ে বসেছে। যাতে সে রুদ্রর চোখে না পড়ে।

রুদ্র একেবারে অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে নিচে নামলো। চার পাশে চোখ বুলিয়ে দেখলো হিয়া কোথাও নেই। একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে সে ড্রাইনিং টেবিলে গিয়ে বসলো। সেখানে সব খাবার সাজানো আছে। নেই শুধু তার বউটা। সে প্লেট উল্টাতে উল্টাতে কয়েকবার ডাকলো হিয়াকে।

"হিয়া....হিয়া..."

হিয়া ধীর পায়ে হেঁটে আসলো ওপরের অন্য একটা রুম থেকে। রুদ্রর সামনে এসে দাঁড়াতেই রুদ্র বলল,,

"কোথায় ছিলে?"

"রুমে।"

"আমিও তো মাত্রই রুম থেকে আসলাম। তাহলে, তোমাকে দেখলাম না কেন?"

"অন্যরুমে ছিলাম।"

"ওহ আচ্ছা! বসো এখানে!"

রুদ্র হিয়াকে তার পাশের চেয়ারেই বসতে বললো। হিয়া সেটা বুঝেও, রুদ্রর পাশে না বসে সামনের চেয়ারে বসলো। রুদ্র বিষয়টা খেয়াল করেও কিছু বলেনি।

সে খাবার খেতে শুরু করলো। বেশ খানিকটা সময় যাওয়ার পরও হিয়া প্লেট উল্টাতে না দেখে রুদ্র জিজ্ঞেস করলো,,

"এখন কি তোমাকে খাওয়ার জন্য আলাদা ভাবে নিমন্ত্রণ করতে হবে?"

"তার প্রয়োজন নেই। খাবো না আমি!"

"কেন?"

"ক্ষুধা নাই!"

"তো তোমাকে কে বলল শুধু ক্ষুধা পেলেই খেতে হয়। আমার একা খেতে ভালো লাগছে না, প্লেটে খাবার নাও!"

"বললাম তো ক্ষুধা নাই। খাবো না!" একটু বিরক্ত হয়েই বলল হিয়া।

"ক্ষুধা না থাকলেও খাও।" রুদ্রর কন্ঠ স্বাভাবিক।

রুদ্রর এই জোরাজোরি হিয়ার কাছে, ন্যাকামি লাগলো। যেন জুতা মেরে গরু দান। সে বিরক্ত হয়ে উঠে গেলো টেবিল থেকে। এক ছুটে চলল ওপরে রুমের দিকে।

হিয়াকে এভাবে যেতে দেখে রুদ্রর খাওয়া আটকে গেলো। হাতে থাকা জুসটা সে মুখ পর্যন্ত নিতে পারলো না। হ্যাঁ, সে চেয়েছিলো হিয়া তার থেকে দূরে সরে যাক। তার দুষ্টামি গুলো বন্ধ হয়ে যাক। কিন্তু, সে এটা কখনোই চায়নি হিয়া গুটিয়ে যাক। নিজেকে এভাবে আড়াল করে নিক।

রুদ্রর কষ্ট হচ্ছে। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তার। বুকের বাঁ পাশটা যেন দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। কিন্তু কি করবে সে? রুদ্র নাতো হিয়ার চঞ্চলতা টাকে নিতে পারছে, আর না হিয়ার এই গুটিয়ে যাওয়া টাকে নিতে পারছে। তাহলে কি করবে সে? কি করা উচিত তার? নিজেকে কেমন যেন পাগল পাগল লাগছে তার।

রুদ্র আর খেতে পারলো না। উঠে চলে গেলো অফিসের উদ্দেশ্য। এখানে দম আঁটকে আসছে তার।

-

প্রায় বিকাল নাগাদ। হিয়া শুয়ে আছে তার রুমে। পরপর কয়েকবার কলিং বেল বাজলো। তবে হিয়া উপরে থাকায় টের পেলো না। ছকিনা খালা দৌড়ে গিয়ে দরজাটা খুললেন।

ওপারে একজন সুদর্শন পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে ফর্মাল ড্রেস। চুলগুলো জেল দিয়ে সুন্দর ভাবে সেট করা। চোখে সানগ্লাস মুখে লাজুক হাসি। ছকিনা খালাকে উদ্দেশ্য করে মিষ্টি হেঁসে বলল,

"আসসালামু আলাইকুম!"

"তুমি কেডা বাবা। তোমারে তো চিনলাম না।" কপালে ভাজ ফেলে জিজ্ঞেস করলো ছকিনা খালা।

লোকটা ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, "আমি আহনাফ মির্জা। রুদ্রনীল চৌধুরীর বন্ধু!"

ছকিমা লম্বা হেঁসে বললেন, "ও আইচ্চা তুমি তাইলে নীল বাবাজির বন্ধু।"

"জ্বি!"

"কিন্তু, নীল বাবাজি তো বাসায় নাই বাবা। ওয় অপিসে গেছে। তুমি বরং বসো। আমি বউমারে ডাইকা লই আইতাছি।"

ছকিনা খালা ওপরে গিয়ে হিয়াকে বলা মাত্রই হিয়া ভাবলো কে এসেছে। তবে রুপের বর্ণনা শুনে তার আর বুঝতে বাকি রইলো না, নিচে কে এসেছে! মুহুর্তেই হিয়ার বুকটা কেঁপে উঠলো।

সেদিন সে আহনাফের সাথে ক্যাফেতে গিয়েছিলো বলেই রুদ্র তাকে কতো কথা বলেছিলো। ভুল বুঝেছিলো তাকে। আর আজ কিনা আহনাফ বাড়ি পর্যন্ত চলে এসেছে? এটা যদি রুদ্র জানতে পারে তাহলে? তাহলে কি অবস্থা হবে হিয়ার। তার বুকটা আবারো ধপ করে উঠলো।

কিন্তু যখনই হিয়ার লারা আর রুদ্রর বিহেভিয়ারের কথা মনে পড়লো। তখনই যেন তার সব ভয়, সব সংকোচ ছুটে পালালো। বুকটা ভরে উঠলো ঘৃণায়।

হিয়া নিজেকে পরিপাটি করে বের হলো রুম থেকে। আহনাফ নিচে সোফায় বসে আছে। হিয়া যেতেই আহনাফ বলল,,

"কি ব্যাপার হিয়া রাণী। কেমন আছো তুমি?"

হিয়া হেঁসে জবাব দিলো। "জ্বি আলহামদুলিল্লাহ! আপনি কেমন আছেন আহনাফ ভাই?"

"এইতো! আছি কোনো রকম।"

আহনাফ হিয়াদের বাড়ির ড্রয়িং রুমটা ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে বলল,,

"বাহ! হিয়া। তোমাদের বাড়িটা তো খুব সুন্দর।"

হিয়া হালকা হাসলো। এরপর জিজ্ঞেস করলো,,

"কিন্তু, আমাদের বাড়ির ঠিকানা আপনি কিভাবে পেলেন আহনাফ ভাই! না মানে, আগে তো কখনো আসেননি!"

"তোমাদের বাসা খুঁজে পেতে, তোমার সাহেবের নাম টাই এনাফ হিয়া! মিস্টার রুদ্রনীল চৌধুরী!"

হাত দিয়ে সাইনবোর্ড আকারে দেখিয়ে কথাটা বললেন আহনাফ। এরপর নিজেই হো হো করে হাসলেন। তবে, হিয়া তাতে সঙ্গ দিতে পারলো না।

ছকিনা খালা বললেন, "আইচ্ছা তোমরা তাইলে গপ্পো করো, আমি কিছু নাস্তার ব্যবস্থা করি!"

ছকিনা খালা চলে যেতেই হিয়া গিয়ে বসলো আহনাফের পাশে।

"তা হঠাৎ কি মনে করে আসলেন আহনাফ ভাই!"

আহনাফের মুখটা কেমন যেন ছোট হয়ে গেলো। মলিন হেঁসে বলল,,

"কেন? আমি কি আসতে পারি না?"

হিয়া অপ্রস্তুত হয়ে এমন কথায়। তড়িঘড়ি করে বলল,,

"আরে! না না আমি সেটা বলতে চাই নাই। আসলে আপনি...."

হিয়ার ব্যবস্থা দেখে আহনাফ হাসলো। এরপরে বলল,,

"আরে রিলাক্স হিয়া। রিলাক্স! এতো ব্যস্থ হওয়ার কি কিছু হয়নি। আমি তো জাস্ট এমনিই বলছি।" একটু থেমে আবার বললেন,

"আসলে আমি একদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ মনে পড়লো তোমার কথা। সেদিনের পর তো আর দেখা হয়নি। তোমার নাম্বারে অবশ্য কল করেছিলাম কয়েকবার, বন্ধ দেখাচ্ছিলো। ভাবলাম আবার কোনো সমস্যা হলো নাকি। তাই দেখা করতে আসলাম।"

এরই মাঝে ছকিনা খালা তাদের জন্য নাস্তা নিয়ে এলেন। আহনাফ কফিতে চুমুক বসাতে বসাতেই বলল,,

"তোমার চোখ-মুখ কেমন শুকনো লাগছে হিয়া। তুমি ঠিক আছো তো? কিছু কি হয়েছে?"

"কই নাতো! আমার আবার কি হবে আহনাফ ভাই! আমি তো একদম পারফেক্ট আছি।"

"না আসলে। সেদিন রাস্তায় তোমাকে যেমন চঞ্চল লাগছিলো, আজ তেমনই মলিন লাগছে তাই বললাম কথাটা!"

"ওহ তাই নাকি? তাহলে তো আমি বলবো, আপনার চোখের ডাক্তার দেখাতে আহনাফ ভাই। কারণ, আপনার চোখে কু-নখ হয়েছে।"

"চোখে কু-নখ?"

"জ্বি!" তারা দুজনেই এক সাথে হাসলো। এরপর আর কিছু সময় থেকে আহনাফ বিদায় নিলো। তখন প্রায় সন্ধ্যা হবে হবে ভাব।

-

রুদ্র অফিসে একটা ডিলের ব্যাপারে কিছু ক্লাইড দের সাথে কথা বলছিলো। কথা শেষে তারা বেরিয়ে যেতেই, রুদ্র যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো। ক্লান্তিতে মাথাটা এলিয়ে দিলো চেয়ারে। হঠাৎ-ই তার মনে হলো হিয়ার কথা। মেয়েটা অনেক বদলে গেছে। আর এই বদলের পর আজই রুদ্র অফিসে এসেছে। একা একা বাসায় কি করছে কে জানে।

রুদ্র আর অপেক্ষা করলো না। ল্যাপটপ টা অন করলো। বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজের ভেতরে গেলো। হিয়া ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে কার্টুন দেখছে। দেখে মুচকি হাসলো রুদ্র। যাক, মেয়েটা তাহলে ঠিক আছে।

হঠাৎ কিছু একটা মনে করে রুদ্র একটু আগের ফুটেজ গুলো রিপ্লে করলো। সেখানে আহনাফ কে দেখেই তার হাত মুষ্টি বদ্ধ হয়ে আসলো। রুদ্র তো এমন কিছু আশাই করেনি। এমন অপ্রত্যাশিত কিছু দেখে রাগে তার চোখটা লাল হয়ে আসলো। সে আর এক মুহুর্তে ও দেরী করলো না। ছুটলো বাড়ির উদ্দেশ্য!!

#চলবে~

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন