ফন্ট সাইজ:
থিম:
সে ছিলো অন্যরকম

১৬তম পর্ব

লেখক: পুষ্পিতা মেহরীন তিশা

#সে_ছিলো_অন্যরকম🥀

#পুষ্পিতা_মেহরীন_তিশা

#পর্ব- ১৬ (নতুন অধ্যায়)

আজকের আবহাওয়া টা খুব একটা ভালো না। সকালে রোদের দেখা মিললেও দুপুর থেকে আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন হয়ে আছে। এই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে তো এই থেমে যাচ্ছে। আজকাল বৃষ্টির গতিবিধি দেখলে সবার বুঝতে বেগ পেতে হয়, যে এটা জৈষ্ঠ্যমাস নাকি আষাঢ়-শ্রাবণ মাস।

সন্ধ্যা নেমেছে কিছুক্ষণ আগেই। আর সেই সাথে নেমেছে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, হালকা বাতাসও ছেড়েছে আজ। হিয়া জানালার সামনে দাঁড়িয়ে উপভোগ করছিলো সেই বৃষ্টি। মাঝেমধ্যে হালকা হাওয়া তার তার চোখে-মুখে আছড়ে পড়ছিলো, এলোমেলো চুলগুলো যেন আরও এলোমেলো করে দিচ্ছিলো, হিয়ারও বেশ ভালোই লাগছিলো সেই হাওয়াকে নিজের মাঝে নিতে। হিয়ার মনে হচ্ছিলো, তার দুঃখগুলোও যেন এই বৃষ্টির মতোই। কখনো খুব করে নেমে আসে, আবার কখনো হঠাৎ থমকে যায়।

হঠাৎ-ই রুদ্র হিয়ার সামনে আসলো। খুলে থাকা জানালা গুলো বন্ধ করতে করতে নরম সুরে বলল,,

"এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন? ভিজে যাচ্ছো সে খেয়াল আছে? জ্বর বাঁধানোর শখ হয়েছে নাকি?"

হিয়া চোখ তুলে দেখলো রুদ্রকে। মাত্রই অফিস থেকে এসেছে সে। কাপড়টাও বদলাইনি। হিয়া বুকে দুহাত বেঁধে বলল,,

"জানালাটা খোলাই থাক।"

"ঠান্ডা লেগে যাবে!"

রুদ্র আর কোনো কথা বললো না। ফ্রেশ হওয়ার উদ্দেশ্য চলে গেলো ওয়াশরুমে। হিয়া এসে বসলো বিছানায়। হাতে একটা উপন্যাসের বই। বেশ কিছু সময় পর রুদ্র চুলে টাওয়াল চালাতে চালাতে বের হলো। একেবারে গোসল করেই বেরিয়েছে সে।

"আহনাফ কেন এসেছিলো? এই বাসার ঠিকানা কে দিয়েছে ওকে?" শান্ত স্বরে প্রশ্ন করলো রুদ্র।

রুদ্রর কথায় বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলে তাকালো হিয়া। সে অবাক হয়নি, একটুও অবাক হয়নি। সে তো জানতোই তাকে এমন পরিস্থিতি পার করতে হবে। সেও ঠান্ডা স্বরে বলল,,

"জানি না!"

জানি না" শব্দটা রুদ্র কেমন ভাবে নিলো কে জানে। শান্ত মুখাবয়ব টা, মুহুর্তেই কঠিন হয়ে গেলো। হালকা হাসলো সে। ঠোঁট কামড়ে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে বলল,,

"জানো নাহ? তাহলে, ওর সাথে এতো হেঁসে হেঁসে কথা বলছিলে কিভাবে?"

"তাহলে কি, বাড়িতে মেহমান আসলে মুখ কালো করে থাকবো? অপমান করবো তাদের? ভুলে যেও না আহনাফ আমার বন্ধু!"

"আমার কথা আমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছো?বাহ!" নিজের রাগ চাপিয়ে কপাল সটান করে বলল রুদ্র।

হিয়া অদ্ভুত ভাবে হেঁসে বলল, "হ্যাঁ! তোমার থেকেই তো শিখেছি।"

রুদ্র একটু থেমে ঠোঁট কামড়ে বলল,

"লজ্জা লাগে না,না? একটুও লজ্জা লাগে না? আমার অবর্তমানে আমার বাড়িতে নিজের পুরনো প্রেমিক কে ডেকে আনতে একটুও ভয় লাগেনি তাই না?"

হিয়া তাচ্ছিল্য হাসলো। কেন জানি তার আজ রুদ্রকে ভয় লাগছে না। শুধুই আফসোস হচ্ছে, নিজের ওপর। সে বইটা রেখে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,,

"ভয় কেন পাবো? তুমি বাঘ নাকি ভাল্লুক যে তোমাকে ভয় পেতে হবে? আর লজ্জা? লজ্জাই বা কেন পেতে যাবো? তুমি যদি নতুন প্রেমিকার সামনে ঘরের স্ত্রী'কে অপমান করতে লজ্জা না পাও, তাহলে আমি কেন আমার পুরনো প্রেমিককে ডাকতে লজ্জা পাবো?"

রুদ্র কপালে এক আঙুল স্লাইড করতে করতে অদ্ভুত হাসলো। বিড়বিড় করলো হয়তো কিছু একটা,যেটা হিয়ার বোধগম্য হলো না। রুদ্র আরো কিছুটা সময় নিয়ে বলল,

"আহনাফের ঠিকানা দাও। থাকে কোথায় ও?"

"কেন? মারবে নাকি ওকে? অবশ্য পারো তো শুধু ওটাই, গুন্ডামী করে মানুষ পেটাতে।" (ঠোঁট বাকিয়ে বলল হিয়া।) কিন্তু, কোন অপরাধে মারবে ওকে? ও তো লারার মতো কোনো সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্য এ বাড়িতে আসেনি?তাহলে... "

হিয়া তার কথা শেষ করতে পারলো না। তার আগেই রুদ্র তার গলা চেপে ধরে ঠেলতে ঠেলতে ওয়ালের সাথে লাগিয়ে দিলো। হিয়ার গলাটা সে এতো জোরে ধরেছে, মুহূর্তেই হিয়ার মুখ লাল হয়ে গেছে। দু’চোখে পানি জমে গেছে, যেন চোখ দুইটা বের হয়ে আসবে এখনি।

এতো সময়ে জমিয়ে রাখা রাগটা, রুদ্র যেন একবারে বের করতে চাইছে। রুদ্র হিয়ার মুখের কাছে মুখ নিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে বলল,,

"কেন? কষ্ট হচ্ছে নাকি তোমার? প্রেমিকের গায়ে আঘাত লাগবে এটা ভেবে ফেটে যাচ্ছে বুকটা?খুব কষ্ট হচ্ছে ভেতরে?"

হিয়া কোনো রকমে রুদ্রর হাত সরানোর চেষ্টা করলো। তবে মুখে কিছু বললো না। রুদ্র আবার বলল,,

"ঘর বাঁধবি আহনাফর সাথে?বিয়ে করবি ওকে? ভেতরের নারীস্বত্তা জেগে উঠেছে? কষ্ট হচ্ছে একা থাকতে? বিরক্ত হয়ে গেছিস আমার ওপর?"

হিয়া কোনোরকমে বলতে নিলো, "মুখে লাগাম দিয়ে.."

তবে তার আগেই রুদ্র তার গলা আরো শক্ত করে ধরলো। সঙ্গে সঙ্গে কাশি শুরু হলো হিয়ার। আরো একটু পরে রুদ্র তাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে ছুড়ে দিলো। হিয়া গলায় হাত দিয়ে কাশতে লাগলো।

"যেই আহনাফের সাথে দেখা করায় আমি তোমাকে সেদিন, এতো কথা বললাম আজ তুমি সেই আহনাফ কে আমার বাড়িতে ঢুকিয়েছো? আবার তার হয়ে আমার মুখে মুখে তর্কও করে যাচ্ছো। কে দিয়েছে এই সাহস? আহনাফ?আহনাফ দিয়ে গেছে এই সাহস? কি বলেছে, এখান থেকে বের হতে পারলে সে তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যাবে আমার থেকে? আমার নাগালের বাইরে চলে যাবে তোমরা?হাহ! তোমার সাহস দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি আমি হিয়া! ইচ্ছে করছে তোমার কলিজাটা বের করে মেপে দেখি!"

ফের হিয়ার কাছে গিয়ে তাকে ওয়ালের সাথে ধরে বলল,, "ভয় লাগে না?একটুও ভয় লাগে না আমাকে? বা*ল দিয়েও ধরতে ইচ্ছে হয় না আমার কথাগুলো! ইচ্ছে করছে তোমাকে..."

রুদ্র আর কিছু বলার আগেই হিয়া স্বজোরে তার বুকে হাত রেখে ধাক্কা দিলো। আকস্মিক ধাক্কায় কিছুটা দূরে সরে গেলো রুদ্র। হিয়া গর্জে উঠে বলল,,

"একদম না রুদ্র! একদম না! (একটু থেমে) জানোই তো, শাসন করা তারই সাজে- সোহাগ করে যে! তার নয় যে, বাইরের মেয়ের সামনে বউকে ছোট করে।

হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি মানছি! আমি অনেক বড়ো ভুল করেছি। আমি জানি, আমার সেই ভুলের কোনো ক্ষমা হয়না। কিন্তু, তুমি? তুমি কি একেবারেই সাধু ছিলে রুদ্র? আমার ভুলের জন্য এতোগুলো বছর ধরে তুমি আমাকে যে অত্যাচার করেছো, সেগুলো কি এনাফ ছিলো না? হাহ! আরে তুমি তো এটাও জানো না, আমার যে ভুলের জন্য তুমি আমাকে এতো শাস্তি দিয়েছো,সেটা পুরোটা সত্যি নাকি তার আংশিক সত্যি! সেসব না জেনেই তুমি আমাকে দিনের পর দিন শাস্তি দিয়েছো!

আচ্ছা বাদ দাও! এটা বলো, যদি কখনো জানতে পারো, আমার যে ভুলের জন্য তুমি আমাকে এতো কষ্ট দিচ্ছো, সেই ভুলটা আমি কখনো করিই-নি! তখন পারবে তো আমার সামনে এসে দাঁড়াতে? পারবে, ইদানীং করা কর্মের জন্য নিজেকে ক্ষমা করতে? এই রাগ, এই তেজ,জেদ নিয়ে আমাকে মেকাবেলা করতে পারবে সেদিন?

রুদ্র এবার ঠান্ডা গলায় বলল,,

" এই ওয়েট! ভুল? ভুল কোনটাকে বলছো তুমি? না মানে, তোমার কাছে কোনটাকে ভুল মনে হচ্ছে? প্রতিশোধের আগুনে, একটা ছেলের জীবনকে নরকে পরিণত করাটাকে ভুল মনে হচ্ছে? নাকি বিশ্বাসঘাতকতা করে ভালোবাসার বুকে ছুরি বসিয়ে তাকে খাদ থেকে ফেলে দেওয়াকে ভুল মনে হচ্ছে? নাকি...

রুদ্রর গলাটা যেন মুহূর্তেই ভিজে উঠলো, দম আটকে আসতে লাগলো তার। টুপটুপ করে কয়েক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো দু'চোয়াল বেয়ে.. নিজেকে সামলে সে আবার বলল,

"নাকি একটা অনাগত নিষ্পাপ শিশুকে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তাকে খেয়ে ফেলা টাকে ভুল মনে হচ্ছে? ঠিক কোনটাকে তুমি ভুল মনে করছো হিয়া? একটু বুঝিয়ে বলবে প্লিজ?"

হিয়া কেনো উত্তর দিলো না। তার ভেতরে থাকা রাগটা যেন মুহুর্তেই চুপসে গেলো। দু'হাতে নিজের ওড়নার দুপাশ চেপে ধরলো। মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ করলো। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না তার।

রুদ্র হাঁটু ভেঙে বসে পড়লো ফ্লোরে। ভাঙা গলায় আওড়ায়,

"আরে ভুল যদি কেউ করেই থাকে, সেটা করেছিলাম আমরা। ভুল নয় পাপ করেছিলাম পাপ। আর সবথেকে বড়ো পাপ আমি করেছিলাম তোমাকে ভালোবেসে! কিন্তু, আমার সন্তান? আমার সন্তান তো কোনো পাপ করেনি হিয়া। ও তো নিষ্পাপ ছিলো, তাহলে তুমি ওকে কেন ছাড়লে না? কেন, আমার সন্তানকে এই পৃথিবীর আলো দেখতে দিলে না হিয়া? কেন?"

একটু থেমে নরম হয়ে বলল,,

"আচ্ছা! প্রতিশোধের নেশা কি কাউকে এতোটা অন্ধ করতে পারে,যে সে তার গর্ভের সন্তানকেও পাপ বলে? নিজের ভেতরে বেড়ে ওঠা স্বত্তাকে হত্যা করে? প্রতিশোধের নেশা কি এতোটা নিঠুর হয় হিয়া? আচ্ছা! তাহলে আমি কেন ওতোটা নিঠুর হতে পারছি না? আমিও তো তোমার থেকে প্রতিশোধ নিতে চাই, তাহলে আমি কেন তোমার বুকে ছুরি বসাতে পারছি না? কেন তোমাকে হার্ট করলে, আমার এইখান টায় ব্যাথা হয়? (বুকের বা পাশে আঙুল রেখে) কেন হিয়া কেন? কেন হয় এমন?

শেষ দিকের কথাগুলো চিৎকার দিয়ে বললো রুদ্র। কিছুটা সময় নিয়ে চিৎকার দিয়ে কাঁদল। কষ্ট হচ্ছে তার, ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু, সেই কষ্টের কথা কাকে বলবে সে? কার সামনে খোলা বই হবে? হিয়ার সামনে? হিয়া কি বুঝবে তাকে? হিয়া কি বুঝবে তার ভেতরের কষ্টটা। নাহ! বুঝবে না। কারণ, তার হিয়া নিষ্ঠুর। ভীষণ রকমের নিষ্ঠুর ভালোবাসা।

রুদ্র কাদঁছে, চিৎকার করে কাঁদছে। আর সেই কান্নার আওয়াজ গুলো তীরের মতো গিয়ে বিঁধছে হিয়ার বুকে। বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আচ্ছা, হিয়ারও তো কষ্ট হচ্ছে। অনুশোচনা হচ্ছে নিজের কৃতকর্মের জন্য। আজ এক বছর ধরে ভেতরে ভেতরে ধুঁকে মরছে সে। কিন্তু, রুদ্র কি সেই খবর জানে? রুদ্র কি বোঝে তার কষ্ট? হয়তো না। একজন খুনীর কি কখনো কষ্ট হয়? নাহ,রুদ্রর মতে, খুনীরা পাথর হয়। তারা কাঁদতে জানে না তবে কাঁদাতে জানে। তারা কষ্ট পেতে জানে না, তবে কষ্ট দিতে জানে।

হিয়া নিজের মুখে ওড়না পুরে দিলো। এভাবেই সে নিজের কান্নার আওয়াজ আটকালো। এছাড়া, তার কাছে আর কোনো উপায় নেই। সে রুদ্রর সামনে কন্না করা মানেই, সেটা রুদ্রর কাছে ন্যাকামি। তামাশা লাগে সেটা। তাইতো, রুদ্র কখনো হিয়ার চোখের জলের দাম দেয় না। হিয়া ওভাবেই মুখে ওড়না দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। এক ছুটে পালালো ছাঁদে।

বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে ধরণীতে। সন্ধ্যার ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফোঁটা এখন বড়ো বড়ো ফোঁটায় রুপ নিয়েছে! মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি ও দেখা দিচ্ছে। কিন্তু কেন জানি, আজ হিয়ার এই বিদ্যুৎ চমকানোতে ভয় লাগছে না। চোখ বন্ধ করে দোয়া পড়তে ইচ্ছে করছে না। রুদ্রর হাতটা ধরে বসে থাকার ইচ্ছেও হচ্ছে না। তার, কেবলই ইচ্ছে হচ্ছে, এই খোলা আকাশের নিচে দাড়িয়ে ভিজতে।

যেন বৃষ্টির পানির মতোই তার দুঃখ তার পাপগুলো ঝরে পড়ে যায়। আর কোনো এক সময়- বৃষ্টি শেষের উজ্জ্বল আকাশের মতোই, তার জীবনেও, সুখ নামক আকাশটা ধরা দেয়। হিয়া শুনেছে, কাঁদলে নাকি মন হালকা হয়? কিন্তু হিয়া তো তার পাপকে হালকা করতে চায়! আচ্ছা, এই অন্ধকার রাত আর এই বৃষ্টি কি পারবে তার পাপকে হালকা করতে? নাকি রুদ্রর মতো তারাও তাকে দোষী বলে মুখ ফিরিয়ে নিবে?

হিয়া হাঁটু ভেঙে বসে পড়লো সেখানে। রুদ্রর মতো সে ও চিৎকার করে কাঁদলো। তবে তার সেই কান্নার আওয়াজ, বৃষ্টির ঝমঝম শব্দতেই মিশে গেলো। কারো কান অবদি পৌঁছালো না সেই কান্নার শব্দ।

-

রুদ্রর রুমেই মাঝেই ডান কর্ণারে একটা ছোট্ট পুল আছে। সেখানে সচারাচর যায় না রুদ্র। তবে, আজ গিয়েছে। সেই পুলের পাশে থাকা ডিভানে বসে এক নাগাড়ে রেড ওয়াইন খেয়ে চলেছে। কষ্ট ভুলতে এটা নাকি খুব কার্যকরী। কিন্তু, আজ যেন এই ওয়াইন টাও রুদ্রর সাথে বেইমানী করছে। এতোটা নেশা করার পরও, তার বারবার মনে হচ্ছে..

যদি হিয়া সেইদিন সবটা শেষ না করতো, তাহলে কি আজ তারা একটা সুখী পরিবার হতে পারতো? তাহলে, কি আজ রুদ্র হিয়াকে মন উজার করে ভালোবাসতে পারতো? এতোদিনে নিশ্চয়ই তাদের সন্তান পৃথিবীতে চলে আসতো। আচ্ছা তার মেয়ে সন্তান হতো, নাকি ছেলে? সে আর হিয়া তো ঠিক করেছিলো, মেয়ে হলে তারা নাম রাখবে "রুহি" আর ছেলে হলে "রুহান"! তাদের নামের সাথে মিলিয়েই সন্তানের নাম রাখবে তারা।

সব ঠিক থাকলে, তার সন্তান হয়তো এতোদিনে গুটি গুটি পায়ে হাটতে শিখতো একটু। রুদ্র কি তার ছোট্ট আঙুল গুলো ধরে তাকে নিয়ে হাঁটতে বের হতো?তার সন্তান যখন তাকে আব্বু আব্বু বলে ডাকতো! তখন কেমন অনুভূতি হতো রুদ্রর। তখন কি সে নিজেকে পৃথিবীর সবথেকে সুখী আর পূর্ণ মানুষ বলে মনে করতো?

হঠাৎ রুদ্রর মনে পড়লো, সেই বিভীষিকা দিনের কথা। তার চোখ দু'টো আবারো লাল হয়ে উঠলো। বোতল ধরে ঠকঠক করে আরো কিছুটা ওয়াইন খেয়ে নিলো সে। আর মনে করলো! এই সবকিছু শুরুর দিনটা।হিয়ার সাথে তার প্রথম দেখার দিনটা-।

এই সবকিছু শুরু হয়েছিলো সেইদিন—

✍✍🏼

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে তখন হালকা রোদের মিষ্টি ছোঁয়া। টিএসসি চত্বর যেন প্রাণের মেলা—চারপাশে ছড়িয়ে আছে হাসি, আড্ডা আর গানের সুর।চারপাশে সবুজ গাছ, পাখির ডাক, আর ছায়াঘেরা পথ যেন হিয়াকে আহ্বান করছে এক নতুন জীবনের দিকে।

ভার্সিটিতে আজ মোমো আর হিয়ার প্রথম দিন।

তারা টিএসসি হয়ে হাঁটছে— তবে খুব ধীরে পা ফেলছে তারা, আর চোখ বোলাচ্ছে চার পাশের পরিবেশে। সবটা যেন তাদের কাছে স্বপ্নময় লাগছে। ভার্সিটির সৌন্দর্য মুগ্ধ করছে তাদের। দুজনের মুখেই লেগে আছে এক মিষ্টি হাসি। তবে হঠাৎ-ই তাদের হাসিটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। মুখটা মলিন হয়ে ভ্রুটা কুঁচকে গেলো তাদের।

তাদের থেকে বেশ কিছুটা দূরে, ৭-৮জন ছেলে কোনো একটা কিছু মাঝখানে রেখে গোল গোল ঘুরছে। দূর থেকে দেখে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না জিনিসটা আসলে কি? তবে হিয়ার এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, ওটা হয়তো কোনো মানুষ!

হিয়া আর মোমো কৌতুহল নিয়ে এগিয়ে গেলো সেদিকে। হ্যাঁ, তারা ঠিকই ধরেছে। মাঝখানে একটা ছেলে বসে আছে। হিয়া আরো একটু ভালো করে দেখার জন্য ছেলেগুলোর মাঝখান দিয়ে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করলো। দেখলো—

ছেলেটা সবার মাঝখানে উপুড় হয়ে বসে আছে। মাঝে মাঝে আবার ফ্যালফ্যাল চোখে তাকাচ্ছে ছেলেগুলোর দিকে। নরম সুরে বলছে-

"আমাকে যেতে দিন না ভাই! একটু পরে আমার ক্লাস আছে। এখন আমাকে ছেড়ে দিন!"

কিন্তু, ছেলেটার কথা কেউ শুনছে না। উল্টো সবাই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে। কেউ চুল তো কেউ চশমা ধরে টানছে। কেউ বা পাঞ্জাবি ধরে। কেউ বা আবার তার মুখে মাটি ছুড়ছে। কিন্তু ছেলেটা কোনো প্রতিবাদই করছে না। বরং, করুণ সুরে তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছে।

বিষয়টা হিয়ার কাছে কেমন জানি লাগলো। মনে মনে ভাবলো, এরা কারা? আর পড়ে থাকা ছেলেটাই বা কেন এদের কাছে কাকুতি করছে এভাবে? কৌতূহল বশত সে একটা ছেলেকে ডেকে বলল,,

"এক্সকিউজ মি ভাইয়া! এখানে কি হচ্ছে?"

পরপর ছেলেগুলো চোখ ফিরে তাকালো তার দিকে। হিয়ার মাথা থেকে পা অবদি তারা তাদের চোখ দিয়েই স্ক্র্যান করে নিলো। বিষয়টা বুঝতে পেরেও হিয়া চুপ থাকলো। সে যে তাদের এমন চাহনিতে অকোয়ার্ড ফিল করছে সেটা বুঝতে দিলো না। সেখান থেকে একজন ছেলে বলে উঠলো,,

"কিরে আপারা! নতুন নাকি?"

তাদের কথায় যে বাজে ইঙ্গিত আছে, সেটা বুঝতে আর হিয়া বা মোমোর দেরী হলো না। মোমো হিয়ার হাতটা ধরে বলল,,

"হিয়া চল এখান থেকে। এদেরকে ভালো ঠেকছে না।"

হিয়া তার কথায় পাত্তা না দিয়ে, ঠান্ডা স্বরে বলল,,

"জ্বি! আমরা ফ্রেশার!"

"ওহ আচ্ছা ফ্রেশার!" বলেই হো হো করে হাসলো ছেলেগুলো। অন্য একজন বলে উঠলো,,

"তা মামুনি, ফ্রেশার হয়ে এভাবে একা একা ঘুরছো ভয় লাগছে না তোমাদের?"

মোমো আবার হিয়াকে নিয়ে যেতে চাইলো। ছেলেগুলোকে সুবিধার লাগছে না তার। কোনো গন্ডগোলে পড়লে কি হবে তখন? তবে হিয়া তার কথায় পাত্তা দিলো না। বুকে হাত বেঁধে, আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলল,,

"ভয় পাবো কেন ভাইয়া? এটা তো ভার্সিটি এখানে এসেছি পড়াশোনা করতে, চুরি করতে তো আসিনি যে ভয় পাবো!"

ছেলেগুলো তার এমন কথায় একটু অবাক হলো। বিশ্রী হেঁসে বলল,,

"ওরে বাবারে! চেংরী নতুন হইলে কি হবে। চেংরীর দম আছে!" অন্য একজন বলল,,

"ফ্রেশার যখন, তখন র‍্যাগিং তো একটু করতেই হয় মামুনি। নয়তো আবার আমাদের পেশা নিয়ে টানাটানি পড়বে।"

হিয়া হালকা হেঁসে বলল,, "ওহ আচ্ছা! র‍্যাগিং দিবেন? তো দিন না। বলুন কি করতে হবে আমাকে?"

"আরেহ ব্যাস! শালির সাহস তো অত্যাধিক!"

"আচ্ছা, মামুনি তুমি তাহলে একটা কাজ করো, আমার এই দাড়ি গোফ ওয়ালা গালে একটু চু*মু খাও। দেখি তোমার কতো সাহস!"

হিয়া চোখ গরম করে তাকালো ছেলেগুলোর দিকে। আঙুল তুলল কিছু বলার উদ্দেশ্য, হঠাৎ একটা ছেলে তার আঙুল ছুঁতে নিলো। তার আগেই অন্য একটা ছেলে এসে তার হাতটা খপ করে ধরে নিলো।

ছেলেটা চোখ তুলে তাকালো কে তার হাত ধরেছে দেখতে, তখনই হাত ধরা ছেলেটা তার আঙুলটা মুচরে দিলো। ব্যাথায় আওয়াজ করে উঠলো সে। তবে তাকে বাঁচাতে তার সঙ্গীরা এগিয়ে এলো না। পিছিয়ে গেলো এক এক করে।

হিয়া ছেলেটার দিকে হাস্যউজ্জব চোখে তাকিয়ে বলে উঠলো,,!

#চলবে~

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন