ফন্ট সাইজ:
থিম:
সে ছিলো অন্যরকম

২১তম পর্ব

লেখক: পুষ্পিতা মেহরীন তিশা

#সে_ছিলো_অন্যরকম

#পুষ্পিতা_মেহরীন_তিশা

#পর্ব- ২১

হিয়ার হাতে রিং পড়ানোর জন্য আহনাফ যখনই তার হাতটা আলতো করে ধরলো, হিয়া মৃদু হেঁসে আস্তে করে তার হাতটা সরিয়ে নিলো। শান্ত স্বরে ডাকলো,

"আহনাফ ভাই!"

হিয়ার এমন কাজে আহনাফ অবাক হলো। পরক্ষণেই হিয়ার ডাকে আহনাফ চমৎকার ভাবে তাকালো তার দিকে। আশেপাশের কয়েকজন বলে উঠলো,,

"কিরে হিয়া! নিজের হবু প্রেমিককে কেউ ভাই ডাকে? নাম ধরে ডাক!"

"নাম কেন রে? এদেশে কি ঢঙ্গী নাম লাইক, জান,পরাণ,কলিজা,দিল,ফ্যাকশা,নাড়িভুড়ি- এর অভাব পড়েছে? যে নাম ধরে ডাকবে।"

ছেলেটার কথায় উপস্থিত সবাই হেঁসে ফেললো। আহনাফ লজ্জা পেয়ে এক আঙুলে ভ্রু চুলকাতে লাগলো। হিয়াও হাসলো হালকা। তবে সেটা যেন হাওয়ায় উড়ানো হাসি। সে সবার দিকে একবার তাকিয়ে আহনাফের উদ্দেশ্য বলল,,

"আ'ম সরি আহনাফ ভাই!"

হিয়ার কথায় সবার হাসিটা যেন বিলীন হয়ে গেলো। আহনাফের মুখের লজ্জা উড়ে গিয়ে মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো। তবুও সে হাসার চেষ্টা করে বলল,,

" হঠাৎ সরি কেন?"

হিয়া হাসলো। তবে সেটা ভদ্রতার হাসি।

"আমি আপনাকে অনেক ছোটবেলা থেকে দেখছি আহনাফ ভাই। যখন আমি প্রাইমারিতে তখন থেকে আপনাকে চিনি আমি। তবে সেই চেনাটা অবশ্যই নিজের বড়ো ভাই রূপে। আমি সব সময় আপনাকে নিজের বড়ো ভাইয়ের চোখেই দেখে আসছি আহনাফ ভাই। আজ আপনি আমাকে যে প্রস্তাবটা দিলেন, তাতে সায় দেওয়ার মতো অনুভূতি আপনার প্রতি আমার কখনোই ছিলো না।"

হিয়া থামলো। সেই সাথে থামলো আশেপাশের মানুষের মুখের হাসিও। আহনাফ নিষ্পলক চেয়ে আছে নিচের দিকে। আহনাফের চোখে পানি টলমল করছে। টুপ করে একটা ফোঁটা পানি পড়লো নিচে। সে দ্রুত হাতে পানিটা মুছে তাকালো হিয়ার দিকে। জোর করে হাসার চেষ্টা করে বলল,,

"কিন্তু.. হিয়া আমি তো সেই ছোটবেলা থেকেই তোমাকে...."

আহনাফের কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই হিয়া তাকে থামিয়ে বলল,,

"আমাকে ক্ষমা করবেন আহনাফ ভাই! আমি সবার সামনে আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলতে চায়নি। কিন্তু, আপনি যেহেতু, সবার সামনেই আমাকে প্রোপোজ করেছেন তাই আমাকেও বাধ্য হয়ে কথাগুলো সবার সামনেই বলতে হলো। আপনি তো জানেন না, আমি স্পষ্ট ভাষায় কথা বলতে পছন্দ করি। ইনিয়েবিনিয়ে কথা বলা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। আশা করি, আপনি আমার কথায় কষ্ট নিবেন না!"

আহনাফকে থামিয়ে একদমে টানটান স্বরে কথাগুলো বলে ফেললো হিয়া। চারিদিকের সবাই যেন হিয়ার এমন আচরণে অবাক হলো। এক-অপরের দিকে তাকা-তাকি করলো তারা।

অন্যদিকে, আহনাফ বুঝলো হিয়ার এমন আচরণের উদ্দেশ্য। হিয়া যখন বলেছে সে তার প্রতি কোনো অনুভূতি রাখে না, তার মানে রাখেই না। আর সে তার প্রতি আহনাফের অনুভূতিটাও শুনতে চায় না। সে আহনাফ কে রিজেক্ট করছে মানে, তার অনুভূতিকেও রিজেক্ট করছে। আহনাফ হোক বা আহনাফের অনুভূতি, কোনোটার ওপরই হিয়ার তেমন কোনো ইন্টারেস্ট নেই। তাইতো, সে আহনাফের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ না দিয়েই তার মতামত জানিয়ে দিলো। আহনাফকে কিছু বলার অবকাশ অবদি দিলো না।

নিজের ওপর হাসি পেলো আহনাফের। সেইসাথে হাসি পেলো, নিজের অনুভূতি গুলোর ওপরেও। যেগুলো প্রকাশ করার অবকাশ টুকুও সে পেলো না। পেলো না মানে, তাকে অবকাশ দেওয়া-ই হলো না।

আহনাফ হিয়ার দিকে একবার তাকালো এরপর তার বন্ধু-বান্ধবদের দিলেও তাকালো। যারা এই মুহুর্তে করুণ দৃষ্টিতে আহনাফের দিকে তাকিয়ে আছে। আহনাফ হাসলো তাদের দৃষ্টি দেখে। হাসিটা কেমন ঢ়েন অদ্ভুত, যেন এই হাসি দিয়ে সে ভেতরের কষ্ট গুলো আড়াল করতে চাইছে। তাইতো, তার চোখে জল,মুখে হাসি।

"সরি হিয়া..!"

"সরি কেন বলছেন আহনাফ ভাই? ভুল তো মানুষ মাত্রই হয়। আপনি যে আপনার ভুলটা বুঝতে পেরেছেন এটাই অনেক!"

"ভুল??" ভ্রু কুঁচকে একটা ব্যাথিত হাসি হেঁসে বাক্যটা উচ্চারণ করলো আহনাফ।

এবারে তো আহনাফের নিজের ওপর তীব্র হাসি পেলো। চিৎকার করে হাসতে ইচ্ছে হলো তার নিজের ওপর। তার অনুভূতি গুলোকে হিয়া 'ভুল' বলে সম্মোধন করলো? আহনাফ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো,

"ভুল? আসলেই কি ভুল?" তার ভেতর থেকে হঠাৎ যেন উত্তর আসলো,

"হ্যাঁ, ভুলই তো ভুল ছাড়া আরকি?সে তো ছোটবেলা থেকে হিয়াকে চেনে, সে জানে হিয়া নিজের আর নিজের পছন্দের মানুষ গুলো ব্যতীত কারো অনুভূতির ধার ধারে না। তাহলে, সে কিভাবে হিয়ার অনুভূতির ব্যাপারে সিওর না হয়ে, সবার সামনে হিয়াকে প্রপোজ করার মতো ভুলটা করলো। এটা তো আসলেই তার 'ভুল' অনুভূতির পরোয়ানা তো এখানে নেই।

-

হিয়া একবার তার হাতঘড়ির দিকে তাকালো। অলরেডি তার প্রথম ক্লাস শেষ হতে চলেছে। কয়েকদিন পরই তার এক্সাম এই মুহুর্তে তার ক্লাস মিস দেওয়াটা একদমই উচিত হয়নি। বিষয়টা মাথায় আসতেই বিরক্তিতে হিয়ার চোখ-মুখ কুঁচকে গেলো।

সে আহনাফের থেকে বিদায় নিয়ে সামনের দিকে পা বাড়াতে চাইলো। তার আগেই আহনাফ তাকে করুণ সুরে ডেকে উঠলো,,

" হিয়া..! তুমি তো প্রায়ই মানুষের জন্য তোমার ক্লাস মিস দাও। আজ আমার জন্য একটা ক্লাস মিস দিবে প্লিজ! শুধু কয়েকটা কথা বলতে চাই তোমাকে! বেশি সময় নিবো না প্রমিস!"

আহনাফের কথায় হিয়া চোখ বন্ধ করে ফেললো। বিরক্ত হলো কিনা বোঝা গেলো না। তবে, আহনাফ যে 'মানুষের জন্য' বলতে রুদ্রকে বুঝিয়েছে সেটা বুঝতে হিয়ার সময় লাগলো না। তবুও, সে এ ব্যাপারে আর কথা বাড়ালো না। চুপচাপ আহনাফের সাথে গিয়ে বসলো পুকুর পাড়ে।

-

"হিয়া তুমি কি কাউকে পছন্দ করো?"

"কাউকে বলতে?"

"আ... নীলকে?" বেশ কিছুটা সময় ভেবে, ইতস্তত করে নামটা বলল আহনাফ।

"নাহ! রুদ্রকে নিয়ে কখনো ওভাবে ভেবে দেখি নাই।"

একটু থেমে হিয়া আবারো উৎসাহ নিয়ে বলল,

"তবে ওর সাথে কথা বলতে, হাঁটাহাঁটি করতে, সময় কাটাতে আমার বেশ ভালোই লাগে। ও সাথে থাকলে নিজেকে ম্যাচিউর-ম্যাচিউর লাগে। অন্য রকম ফিল হয় ওর সাথে থাকলে! যদিও জানি না এটাকে কি বলে!"

আহনাফ আনমনে উত্তর দিলো, "হয়তো এটাকেই প্রেম বলে!"

"হু! কিছু বললেন আহনাফ ভাই?"

হিয়ার কথায় আহনাফ ভাবনা থেকে বের হলো। নড়েচড়ে বসে হালকা হাসলো। আবার বলল,,

"আচ্ছা! নীল কি তোমাকে পছন্দ করে? কখনো ভেবে দেখেছো ওর মনে তোমাকে নিয়ে কি আছে?"

"না-তো! এসব নিয়ে তো কখনো ভাবিনি।"

"তাহলে, সময় করে ভেবে দেখো। আমি যদি খুব বেশি ভুল না হই তাহ......"

"আচ্ছা! ঠিক আছে। আমার এক্সাম টা আগে শেষ হোক। তারপর এসব নিয়ে ভেবে দেখবো। কেমন?"

আহনাফ হাসলো। আবারো সেই অদ্ভুত ভাবে হাসলো সে। যেন কিছু লুকাতে চাচ্ছে এই হাসির মাধ্যমে। বেশ কিছু সময় দুজনেই চুপ থাকলো। তারপর আহনাফ একটা কাঠি দিয়ে ঘাসের ওপর আঁচড় কাটকে কাটতে মৃদু স্বরে বলল,,

"আমি ভেবেছিলাম, তুমি পারফেক্ট কাউকে চুজ করবে!"

আহনাফের এমন কথায় হিয়া গভীর দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে। মিষ্টি হেঁসে শান্ত স্বরে জবাব দিলো,,

"আমি মেহেজাবিন রাহমান হিয়া! পারফেক্ট কাউকে পছন্দ করার থেকে, কাউকে পারফেক্ট বানিয়ে নিতে বেশি পছন্দ করি। আমি বিশ্বাস করি, যে মৃত গাছটিকে আমি সজীব করবো, সেই গাছের ফুল-ফল বা ঘ্রাণ শুধু আমিই উপভোগ করতে পারবো। যা বাকিদের কাছে বিষের সমান হবে!"

"শুরু থেকেই সজীব হওয়া গাছের ফুল-ফল, ঘ্রাণ কি তুমি উপভোগ করতে পারবে না!"

"অবশ্যই পারবো। তবে সেই গাছের গুণাবলি শুধু আমি না বাকিরাও উপভোগ করতে পারবে। যা আমার জন্য মধু হবে তা তাদের জন্যও মধু-ই হবে। যেখানে আমি চাই— যা আমার জন্য মধু হবে তা বাকিদের জন্য বিষ হোক!"

"তোমার চিন্তাভাবনা অনেক নিষ্ঠুর হিয়া। খুব যুক্তি দিয়ে চলো তুমি!"

"শুধু আমার চিন্তাভাবনা নয়, আমি মানুষটাই অনেক নিষ্ঠুর! আহনাফ ভাই!"

হালকা হেঁসে কথাটা বলে প্রস্থান করলো হিয়া। আর আহনাফ জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে দেখলো তার যাওয়া।

~

প্রথম ক্লাস বাদ। পরপর দুইটা ক্লাস করে আবারো বের হলো হিয়া। বারান্দার রেলিং ধরে উঁকি ঝুঁকি দেওয়ার চেষ্টা করলো রুদ্রদের ক্লাসে। তখনই মোমো এসে তার কাঁধে হাত রাখতেই হকচকিয়ে উঠলো হিয়া। মোমো মুখ ভেংচি দিয়ে বলল,,

"কিরে চুরি-ঠুরি করবি নাকি? এভাবে উঁকি দিচ্ছিস যে!"

"এখানে আবার কি চুরি করবো? তোর বরের জাঙ্গিয়া নাকি?"

"ওই হিয়া না প্লিজ! আমার না হওয়া জামাইয়ের ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করবি তো.. আমি তোর ফিউচার জামাইয়ের প্যান্ট খুলে ক্যাম্পাস ঘুরাই আনমু!"

"আর আমি তোরে এক লাথি দিয়া নর্দমায় ফেলমু!"

"তোর মুখে..."

মোমোকে থামিয়ে দিয়ে হিয়া সিরিয়াস মুডে এসে বলল,, "আচ্ছা মোমো মজা বাদ দে। আমার একটা সিরিয়াস কথার উত্তর দে।"

"কি কথা?"

"ভার্সিটিতে আজ রুদ্রকে দেখেছিস?"

"কই নাতো! মনে হয় আজ বেডা আসে নাই!"

"আসেনি?" মন খারাপ বলে কথাটা রিপিট করলো হিয়া।

"কেন তোকে বলেনি?"

"বললে নিশ্চয়ই এখানে দাঁড়িয়ে থাকতাম না!"

"তাহলে কোথায় দাঁড়িয়ে থাকতিস?" এক ভ্রু উঁচু করে দুষ্টু হেঁসে বললো মোমো। তবে হিয়া রেসপন্স করলো না। মোমো বুঝতে পারলো হিয়ার আসলেই মন খারাপ।

"কল করেছিস ওনাকে?"

"করেছি। সুইচ অফ বলছে।"

"যাহ! শালা। আবার কোনো আপদবিপদ হলো না তো?"

মোমোর কথা শেষ হতে না হতেই হিয়া তার মাথায় একটা গাট্টি দিলো। মোমো কিড়মিড় করে বলল,,

"মারলি কেন শালী?"

"আমার থেকে তোর বেশী চিন্তা কেন হচ্ছে শুনি?"

-

সেদিনের মতো রুদ্রর সাথে আর হিয়ার দেখা হলো না। হিয়া তাকে অনেকবার কল করেছে, বারবার ব্যস্ত বলেছে। অর্থাৎ, ফলাফল শূন্য। হিয়া কয়েকবার ভাবলো, রুদ্রর হোস্টেলে যাবে। কিন্তু, তাকে কি সেখানে ঢুকতে দিবে? অবশ্যই না। আর তাছাড়া, পরিচয় চাইলেই বা হিয়া কি উত্তর দিবে? সে তার বন্ধু্? কিন্তু, তারা তো সেইম ইয়ার নয়। তারমানে, বিষয়টা ঘেঁটে যাওয়ার সম্ভবনা আছে।

ভার্সিটি শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় হিয়ার দেখা হলো রিফাতের সাথে। তাকে দেখা মাত্রই রিফাত ডেকে উঠলো,,

"আরে ভাবিজান একা কেন ভাই কোথায়?"

রিফাতের ডাকে হিয়া ঘুরে দাঁড়ালো। রিফাতের দিকে তাকিয়ে নিজের দিকে আঙুল দিয়ে বলল,, "কথাটা কি আমাকে বললেন রিফাত ভাই!"

রিফাত এগিয়ে আসলো তাদের দিকে। হেয়ালি করে বলল,, "জ্বি আপনাকেই বলেছি ভাবিজান! আপনি একা কেন আমার প্রিয় ভাই কোথায়?"

"ভাই? কোন ভাই?" ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো হিয়া।

"আরেহ ব্যাস! সকালে প্রেম হলো আর বিকালেই ভুলে গেলেন? যাহ শালা! এই জন্য আমি মেয়ে জাতিকে বিশ্বাস করি না!"

হিয়া যেন বিরক্ত হলো রিফাতের এমন কথায়। চেতে উঠে বলল,,

"দূর বা*ল! কি তখন থেকে কি ভাই-ভাবি করে যাচ্ছেন কিছুই তো মাথায় ঢুকছে না। কি বলতে চাচ্ছেন, একটু ক্লিয়ার করে বলবেন প্লিজ! আপনার কোন ভাইয়ের সাথে প্রেম করেছি আমি!"

হিয়ার তেজে রিফাত কিছুটা চুপসে গেলো। নিচু স্বরে বলল,,

"সকালেই তো দেখলাম আহনাফ ভাইয়ের সাথে আপনার প্রেম হলো। আর এখনই ভুলে গেলেন। আমার সামনে কিন্তু অস্বীকার করে লাভ নেই। রুদ্র আর আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছি আপনাদের প্রপোজাল।"

রিফাতের এতোগুলো কথার মাঝে রুদ'র নাম টাই যেন হিয়ার মস্তিষ্ক ক্যাচ করলো। সে হকচকিয়ে তাকিয়ে তড়িঘড়ি করে বলল,,

"এক মিনিট! এক মিনিট! রুদ্র আর আপনি দেখেছেন মানে? রুদ্র কি আজ এসেছিলো ভার্সিটিতে?"

"হ্যাঁ, এসেছিলো তো!"

পাশ থেকে মোমো হঠাৎ বলে উঠলো, "তাহলে আমরা কেন দেখলাম না?"

"দেখবে কি করে, সে তো আহনাফ আর হিয়ার প্রোপোজালটা দেখেই হনহন করে বের হয়ে গেলো ক্যাম্পাস ছেড়ে।"

"এরপরে আর আসেনি ক্যাম্পাসে?"

"নাগো ভাবিজান!"

"আচ্ছা, আপনি কি বলতে পারবেন ও কোথায় আ...."

হিয়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই রিফাতের গার্লফ্রেন্ড তাকে ডাকলো। রিফাত হাত উঁচু করে তাকে সাড়া দিলো।

"আসছি ডার্লিং।" এরপরে হিয়ার উদ্দেশ্য বলল,,

"আসছি ভাবিজান। পরে কথা হবে বায়!"

হিয়া পেছন থেকে ডাকলো, "আরে রিফাত ভাই আমার কথাটা তো শুনুন!"

রিফাত যেতে যেতে হাত নাড়িয়ে বলল,, "এখন আর শোনার সময় নেই ভাবিজান! জানেমান ডেকেছে তাকে সঙ্গ দিতে হবে ইমিডিয়েটলি!"

রিফাত চলে যেতেই হিয়া 'সীট' বলে হাত ঝাঁকি দিলো। কিছু সময় পর ভ্রু কুঁচকে তাকালো মোমোর দিকে। দেখলো মোমোও সেইম ভাবেই তার দিকে তাকিয়ে আছে। হিয়া এক ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,,

"আমি যা বুঝেছি.. তুই ও কি তাই বুঝেছিস?"

মোমো ওপর-নিচ মাথা নাড়ালো, "হুমম! রুদ্র ভাই জেলাস?"

হিয়া হালকা হাসলো। এরপরে ঠাট্টা স্বরে বলল, "শালা জাতে মাতাল, তালে ঠিক! বোধে ঢিল হলে কি হবে, উল্টা-পাল্টা বুঝে আবার জেদ দেখাতে জানে।"

হিয়া আর মোমো এবারে একসাথে হাসলো উচ্চ স্বরে।

~

পরেরদিন, মোমো আর হিয়া তাড়াতাড়ি ভার্সিটিতে এলো। উদ্দেশ্য রুদ্রর সাথে দেখা করা। তবে সারা ক্যাম্পাস খুঁজেও তারা রুদ্রকে পেলো না। সবশেষে তারা রুদ্রর ক্লাসের বাইরে উঁকি দিলো। রুদ্র ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসে আছে। সামনে টিচার লেকচার দিচ্ছে আর সে বসে বসে খাতায় আঁকিবুঁকি করছে।

কিছু সময় পর লেকচারার বের হয়ে যেতেই। হিয়া রুদ্রকে ডাকলো। তবে রুদ্র যেন শুনেও শুনলো না।রুদ্রদের এখন অফ টাইম। পরের ক্লাস ৪০মিনিট পর। তাই যে যার মতো বেরিয়ে গেলো ক্লাস থেকে। সেই সুযোগে হিয়া গিয়ে বসলো রুদ্রর সামনে।

রুদ্র তাকে দেখে একটু ভড়কালো ঠিকই তবে বুঝতে দিলো না। শান্ত স্বরে সালাম দিলো হিয়াকে। তবে হিয়ার চোখের দিকে তাকালো না। এদিক-ওদিক তাকিয়ে ব্যাগ থেকে বই-খাতা বের করতে লাগলো।

তার কান্ডে হিয়া মুচকি হাসলো। জোরে হাসা যাবে না এখন। রুদ্রর সামনে বসে বেঞ্চের ওপর দুহাত রেখে তার মাঝে নিজের ছোট্ট মুখটা রাখলো হিয়া। রুদ্র তার দিকে তাকাতেই সে ঠোঁট ফুলিয়ে পরপর কয়েকটা পলক ফেললো।

রুদ্র একটা শুষ্ক ঢোক গিলে চোখ সরালো। হিয়া ঠোঁট উল্টে বাচ্চামো স্বরে বলল,,

"কাল ভার্সিটিতে আসোনি কেন রুডি বয়। বাচ্চার প্যাম্পাস কিনতে গিয়েছিলে বুঝি!"

রুদ্র হকচকিয়ে তাকালো তার দিকে। মুখটা কুঁচকে বলল,, "বাচ্চা.. প্যাম্পাস..?"

"তাহলে বুঝি তোমার বউয়ের জন্য প্যাম্পাস কিনতে গিয়েছিলে? ভাবি কি এখনো রাতে বিছানা ভেজায় রুডি বয়?"

"আরে! আমার আবার বউ আসলো কোথথেকে?"

"ওহ বউ নেই! তাহলে কি... " এতোটুকু বলে থামলো হিয়া। চরম অবাক হওয়ার ন্যায় মুখে হাত দিয়ে 'ওওয়াাা' জাতীয় শব্দ করলো। এরপরে ব্যাঙ্গ করে বলল,,

"এমা রুডি বয়! তুমি এতো বড়ো দামড়া ছেলে হয়ে এখনো বিছানা ভেজাও? নিজের জন্য প্যাম্পাস আনতে গিয়েছিলে কাল, তাই ভার্সিটিতে আসোনি? আচ্ছা, তুমি প্যাম্পাস পড়ে এসেছো তো?"

গন্ধ লাগার ন্যায় নাক এঁটে ধরে বলল,, "না মানে তোমার প্যান্ট আবার ভেজা-ঠেজা নাতো? গন্ধ বের হবে না তো আবার! যদি আমি কোলে উঠি তোমার! ছ্যাহঃ"

রুদ্র এতো সময় হিয়ার কথায় অবাকের ওপর অবাক হচ্ছিলো। মুখটা হা করে হিয়ার কথা শুনছিলো। তবে এবার যেন তার ভ্রম ভাঙলো। একটু চেতে বলল,,

"আরে ধূর! কিসব বলছো তখন থেকে? নতুন প্রেমে পড়ে মাথার স্ক্রু খুলে গেছে নাকি? নাকি ওই আহনাফ তোমার মনের সাথে সাথে মগজ টাও খুলে নিয়েছে!"

একদমে কথাগুলো বলে থামলো রুদ্র। সে কি বলেছে বুঝতে পেরেই চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো। অন্য দিকে, তাকে চেততে দেখে হিয়া ঠোঁটের ওপর আঙুল চেপে মুচকি হাসলো। তার বেশ ভালোই লাগছে, রুডি রুদ্রকে দেখতে। এক অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করছে তার। রুদ্রকে নতুন রুপে আবিষ্কার করছে সে। মুগ্ধতা বাড়ছে যেন।

রুদ্র নিজেকে শান্ত করে বলল,, "আ..আ'ম সরি! তোমার পার্সোনাল ব্যাপারে কথা বলাটা আমার উচিত হয়নি!"

রুদ্রর কথায় হিয়ার মারাত্মক হাসি পেলো। কিন্তু, বেচারি হাসতে পারলো না। গলা খাঁকারি দিয়ে হাসি আটকালো সে। রুদ্রর সামনে এসে গম্ভীর হয়ে বলল,,

"তুমি আমাকে বলেছিলে, আমার হিসাববিজ্ঞান বুঝিয়ে দিবে। তা কবে থেকে দিবে সেটা?"

রুদ্র কিছুটা সময় নিলো। শান্ত হয়ে বসতে বসতে বলল,,

"আ.. সামনে তো আমার পরীক্ষা হিয়া। ভেবে দেখলাম আমার সময় হবে না। তুমি বরং আহনাফের থেকে বুঝে নিও সাবজেক্ট টা!"

"আরে দূর! আমার আহনাফ বেপি তো সায়েন্স এর স্টুডেন্ট। ও আমাকে কিভাবে একাউন্টিং বোঝাবে? আর তাছাড়া...

হিয়া নিজের গলার স্বর পরিবর্তন করলো এখানে, ন্যাকামি সুরে লজ্জা মাখিয়ে বলল,,

" তোমার মনে হয়, আমার ডার্লিং আমাকে পড়াতে আসলে আমার পড়ায় মন থাকবে? আমার মন তো তখন নুমাঞ্চ নুমাঞ্চ করবে। বাই এনি চান্স যদি কোনো ভু...."

রুদ্র আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। আউট অফ কন্ট্রোল সে বেঞ্চে থাবা দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। চোখের চশমাটা জোরে টেনে খুলল। তার গলার রক গুলো ভেসে উঠেছে। তাকে দেখে বোঝাই যাচ্ছে না,এই রুদ্র কখনো নীল ছিলো। মনে হচ্ছে, যেন এমন রাগ তার জন্ম থেকেই নেওয়া।

হিয়া মারাত্মক অবাক হলো রুদ্রর এমন বিহেভে। তার নিজের কাছেই রুদ্রকে অচেনা লাগলো। বুঝলো, দুষ্টামি গুলো এখানেই থামানো উচিত।

রুদ্র গম্ভীর স্বরে হিয়াকে বলল,, "হিয়া আমার কিছু নোটস নিতে হবে। আমি যাই কেমন!"

রুদ্র সামনের দিকে পা বাড়াতেই হিয়া তার গিয়ে দুহাত মেলে দাঁড়ালো। রুদ্র ভ্রু কুঁচকালো, জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে অন্য দিকে তাকালো। হিয়া বলল,,

"আজ সারাদিনে তোমার সাথে আমার আর দেখা হবে না। বিকাল ৫:০০ তুমি আমার সাথে পার্কে দেখা করবে!"

"কেন?"

"আমি বলেছি তাই!"

"বিকালে আমার কিছু কাজ আছে হিয়া!"

"তাতে আমার কি? আমি বলেছি দেখা করতে, দেখা করবে। ঠিক বিকাল পাঁচ টায়!"

হিয়া সামনে থেকে সরে গিয়ে বলল, "এবার তুমি যেতে পারো!"

রুদ্র গেলো না। হিয়া হালকা হেঁসে নিজেই সামনে দিকে পা বাড়ালো। কলম ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,,

"বিকালে আমার সাথে দেখা না করলে কিন্তু, অনেক বড়ো সারপ্রাইজ মিস করবে রুডি বয়। সেই সাথে আমাকেও! সো নো Compromise! টাইমলি চলে আসবে!"

রুদ্র একটু চেচিয়ে বলল, "নতুন প্রেমের পার্ট রেখেছো নাকি বিকালে?"

হিয়া যেতে যেতে হেঁসে বলল,, "পার্ট রাতে হয়, বিকালে নয়। দেখতে চাইলে চলে এসো। চ্যাম্মাকচ্যালো ডান্স দেখাবো তোমায়!"

-

হিয়া ক্লাসরুমে পা রাখতেই মোমো দৌড়ে এসে তাকে জরিয়ে ধরে বলল,, "কিরে কি অবস্থা?"

হিয়া মোমোকে সরাতে সরাতে বলল,, "কঠিন,তরল,বায়বীয় অবস্থা!"

"দূর শালী! ভাইয়া আসবে তো বিকালে? সেটা বল!"

"হাহ! আমি ডেকেছি আর ওনি আসবে না? হাসালি রে মতিনের বউ হাসালি। যা গিয়ে সৌরভদের ফোন করে বল সবটা এরেন্জ করতে। বিকালে খেলা হবে!"

হিয়া আর মোমো একো-অপরের দিকে তাকিয়ে চোখ মারলো। পরক্ষণেই হেঁসে উঠলো।

#চলবে~

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন