ফন্ট সাইজ:
থিম:
সে ছিলো অন্যরকম

২৯তম পর্ব

লেখক: পুষ্পিতা মেহরীন তিশা

#সে_ছিলো_অন্যরকম

#পুষ্পিতা_মেহরীন_তিশা

#পর্ব- ২৮ (শেষাংশ)

হঠাৎ ধাক্কায় কয়েক কদম পিছিয়ে গেলো রুদ্র। তার সারা শরীর ঘেমে একাকার হলো। না চাইতেও, যেন হাত দুইটা পেটের ডান পাশ চেপে ধরলো। যেখান থেকে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত আসছে। রুদ্র একবার ঘাড় নিচু করে তার পেটের দিকে চাইলো আর ভয়ে আরো কয়েক কদম পিছিয়ে গেলো। একহাত হাতড়ে নিজেকে পড়ে যাওয়া থেকে আটকালো। আর অন্য হাতে স্বজোরে পেট টা চেপে ধরে একটা চাপা স্বরে ডাকলো,,

"হিয়াহ..."

রুদ্রর এমন স্বরে হিয়ার সারা শরীর কাঁপুনি দিয়ে উঠলো। হিয়া একবার তাকালো তার দিকে- যার শরীর একাংশ এই মুহূর্তে রক্তে ভিজে আছে। দাঁড়িয়ে থাকা পা'দুটো ক্রমশ টলছে। অথচ, তার স্থির দৃষ্টি হিয়ার মুখেই আঁটকে আছে। নিষ্পাপ চোখ দুইটা যেন বলতে চাচ্ছে—

"আমি কি স্বপ্ন দেখছি হিয়া? এটা কি দুঃস্বপ্ন? ঘুম ভাঙলেই আবার সবটা আগের মতো হবে? তাহলে, আমাকে একটা চিমটি কাটো তো!"

হিয়ার মুখে এক বিন্দু আবেগ নেই। চোখে জল নেই। কেবল-ই ঠোঁটের কোণে লেগে আছে এক বিদ্রও হাসি। সে রুদ্রর কাছে এগিয়ে গিয়ে তার পেটে নিজের ওড়নাটা বাঁধতে বাঁধতে বলল,,

"আমি জানি তুমি দুর্বল,তবে বোকা নও! তাই এতোটাও বোকা সেজো না, যতোটা বোকা সাজলে তোমাকে হাস্যকর লাগবে!"

কথাটা শেষ করেই হিয়া রুদ্রর পেটের বাঁধনে স্বজোরে শেষ গিট টা দিলো। সাথে সাথে রুদ্র ব্যাথায় কুঁকড়ে গেলো। মুখ থেকে এক ফিনকি রক্ত বেরিয়ে আসলো তার। হিয়া তার সামনে এসে দাঁড়াতেই সে হাওয়ায় ভাসালো গলায় বলল,,

"এক্সপ্লেইন!"

হিয়া একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে অল্প হাসলো।

"আমি শুরু থেকেই জানি রুদ্র— 'তুমি বোকা নও, তুমি দুর্বল। আর নিজের দুর্বলতাকে লুকাতেই তুমি বোকা সেজে থাকার অভিনয় করো মাত্র! আসলে তুমি কিন্তু, হেব্বি চালাক! আর আজ আমি আবারো সেটার প্রমাণ পেলাম!"

রুদ্র পেট চেপে রাখা অবস্থায় চোখ ছোট ছোট করে তাকালো হিয়ার দিকে। হিয়া আরেকটু হেঁসে পরে গম্ভীর গলায় বলা শুরু করলো,,

"আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগে— তখন হয়তো তুমি মাত্রই তোমার ছোট্ট খুলনা শহর থেকে ঢাকা শহরে এসেছিলে। উদেশ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়া। কিন্তু, তুমি জানতে তোমার ওই দুর্বলতা নিয়ে তুমি কখনোই ঢাকা ভার্সিটিতে টিকে থাকতে পারবে না। এজন্য তোমার শক্তিশালী কারোর সাপোর্ট দরকার! এজন্য তুমি বেছে বেছে তোমার সিনিয়র কিছু বখাটে দের সাথে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করলে। রোজ রোজ তাদেরকে সিগারেট এনে দেওয়া,ফ্রি'তে ট্রিট দেওয়া, তাদের সব কথা শোনা— আর এভাবেই এক সময় তুমি তাদের খুব বিশস্ত চামচা হয়ে গেলে। এরপর থেকে তাদের সাথে রোজ রোজ আড্ডা দেওয়া, ঘুরতে যাওয়া, তাদের চামচা'মি করা এ সবকিছুই তোমার কাছে নিত্যদিনের রুটিন হয়ে দাঁড়ালো। আর একদিম সেই রুটিন মাফিক—'

এ পর্যায়ে এসে হিয়ার কন্ঠটা হঠাৎই যেন কেঁপে উঠলো। নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো তার। আর মুহুর্তের মধ্যেই চোখ দুইটা ভরে উঠলো নোনাজলে।

"ঠিক এরকমই একটা শুনশান নির্জন রাতে ম'দ খেয়ে ড্রাইভিং করতে গিয়ে তোমরা একজন বয়স্ক মহিলাকে মেরে দিলে।"

এতোটুকু বলেই নিজের চোখের পানি ছেড়ে দিলো হিয়া। ফের চোখের পানি মুছে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করলো,,

"রুদ্র তুমি জানো- ওই মহিলা কে ছিলো??"

যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া রুদ্র কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই হিয়া বলে উঠলো,,

"ওই মহিলা আমার মা ছিলো! হ্যাঁ, আমার মা! আমার জীবনের সবথেকে ভালো আর বিশস্ত বন্ধু ছিলো সে। সে, সে আমার আম্মু ছিলো জানো?"

রুদ্র যেন অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছালো। কেন জানি, পেটের ক্ষতের যন্ত্রণার থেকে তার কাছে এবার অনুশোচনার যন্ত্রণা'টা বেশি তীব্র মনে হলো। সে ভাঙা আর ভয়ার্ত গলায় আওড়ালো,,

"তোমার আম্মু..?"

হিয়া একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে উত্তর দিলো,,

"হ্যাঁ। আমার আম্মু। আর আমার আম্মুকে তোমরা মেরে দিলে। তবুও, এতোদূর পর্যন্ত ঠিক ছিলো জানো তো রুদ্র। ঠিক ছিলো এতোদূর পর্যন্ত। কিন্তু, যখন তোমরা—

'তুমি আমার আম্মুকে সাহায্য করার জন্য গাড়ি থেকে বের হলে, তকন আমার আম্মুর পাশে- আমার আপুও ছিলো। তোমার বন্ধুরা হয়তো সেদিন তোমাকে রেখেই চলে যেতে চেয়েছিলো। কিন্তু,কিছুদূর যাওয়ার পরই যখন তারা গাড়ির কাঁচের ফাঁকা দিয়ে আমার আপুকে দেখলো। তখন আমার আপু তাদের নোংরা লোলুপ দৃষ্টির স্বীকার হলো। আর কোনোরকম পূর্বাভাস ছাড়াই তারা চারজন আমার আপুকে তোমাদের সামনে থেকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে গেলো।

আমার আপু সেদিন তাদের হাত থেকে বাঁচার জন্য কতোই না আর্তনাদ করেছিলো তাই না? টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার সময় ও খুব কেঁদেছিলো না? আমার আম্মুর হাতটা ধরে রেখেছিলো? ভয়ে ওর কলিজাটা বের হয়ে যাচ্ছিলো না? কতোটা অসহায় ছিলো ও!

আমার আম্মুর মাথা দিয়ে তখনো চুইয়ে চুইয়ে রক্ত বের হচ্ছিলো, কিন্তু চেতনা ছিলো! আমার আপুকে ওভাবে নিয়ে যেতে দেখে আম্মু হয়তো হামাগুড়ি দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলো তাই না? নিজের শরীরকে টানতে টানতে গাড়ির কাছে নিয়ে গেছিলো। বারবার গাড়িতে ধাক্কা দিয়ে মাফ চেয়েছিলো তোমার বন্ধুদের কাছে? ভিক্ষা চেয়েছিলো আমার আপুকে! কিন্তু, তোমার বন্ধুরা ভিক্ষা দিলো না রে!

যখন আম্মু তার নিজের শক্তির সাথে পারলো না। তখন নিশ্চয়ই আম্মু তোমার কাছে সাহায্য চেয়েছিলো? তাই না? কি বলেছিলো বলো তো? তোমার পা ধরে বলেছিলো-

"বাবা আমার মেয়েটাকে বাঁচাও। ওই নরপশু গুলোর হাত থেকে আমার মেয়েটাকে রক্ষা করো। ও তিনমাসের অন্তঃসত্ত্বা!ওর গর্ভের সন্তানরা বাঁচবে না!"

এসব কিছুই বলেছিলো না তোমাকে? তাই তুমি আরেকবার আমার আপুকে বাঁচাতে গিয়েছিলে। তোমাকে যেতে দেখে হয়তো আম্মু কিছুটা সাহস পেয়েছিলো তাই না? একটু শান্ত হয়ে বসেছিলো সে? হয়তো, ভরসা পেয়েছিলো- তার মেয়েটা প্রাণে বাঁচবে। কিন্তু, বেশ কিছুক্ষণ পর যখন তোমাকে গাড়ি থেকে বেরোতে দেখলো-

তোমার পুরা শরীর ঘামার্ত ছিলো। শার্টের ইন এলেমেলো ছিলো। চোখ দুইটাও লাল। আমার আম্মু হয়তো বুঝেছিলো- তার শেষ ভরসা টাও এবার শেষ হলো! আর সঙ্গে সঙ্গেই সে প্রাণ দিলো। আমার আম্মু হয়তো স্ট্রোক করেছিলো বলো? হুম। স্ট্রোকই করেছিলো। তাই না?"

পুরোটা সময় মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে, কখনো তীব্র জোরে আর কখনো বা মিইয়ে যাওয়া স্বরে কান্না করতে করতে কথাগুলো শেষ করলো হিয়া। অন্যদিকে, গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো রুদ্র যে কখন হতবাক হতে হতে মাটিতে বসে পড়েছে টেরই পায়নি সে। সে যেন পুরা স্টাচু হয়ে গেছে। কি বলবে, কি করবে কিছুই তার মাথায় আসছে না। শুধু চোখের ওপরে ভেসে উঠছে, সেই নির্মম কাহিনি। অসহ্য আর্তনাদ। আর নিজের কাপুরুষ হীনতার কথা।

এবারে নিজেকে একটু শক্ত করে হিয়া আবারো বলতে শুরু করলো,,

"তারপর এখানেই কিন্তু কাহিনী শেষ হয়নি রুদ্র। এরপরে আরো আছে। 'তো ওইদিন রাত ১২টার পরে আব্বু আর চাচ্চু মিলে আম্মু আর আপুকে অনেক খুঁজেছিলো। কিন্তু, কোথাও পায়নি। অবশেষে তারা বাসায় ফিরে আসে। তখন মাত্রই আমার এসএসসি এক্সাম শেষ হয়েছিলো। এজন্য সকালে অনেক দেরীতে ঘুম থেকে উঠতাম আমি। কিন্তু, ওইদিন সকালে অনেক নিচে মানুষের চেঁচামেচির কারণে, ভোর ছ'টায় আমার ঘুম ভেঙে যায়। তড়িঘড়ি করে নিচে এসে দেখি—

নিচে যেন কান্নার রোল পড়েছে। আমাকে দেখা মাত্রই আব্বু দৌড়ে গিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। কপালে একটা চুম্বন দিয়ে বুকের ভেতরে শক্ত করে জড়িয়ে রাখলেন। যেন ছেড়ে দিলেই আমি পালিয়ে যাবো। আব্বুকে ছাড়িয়ে সামনে এগিয়ে আসি আমি। দেখি খাটিয়ার ওপরে সাদা কাপড়ে মোড়ানো একটা লাশ। আমি তখনো জানতাম না ওইটা কার লাশ। তবে হুট করেই কেন যেন আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। মনে হলো, কেউ যেন আমার কলিজাটা ছিঁড়ে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। মুহূর্তেই আম্মুর মুখটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো।

ভাবলাম,আম্মু? আম্মু ঠিক আছে তো? দৌড়ে গিয়ে লাশের ওপর থেকে কাপড়টা সরাতেই আমি থমকে গেলাম। পায়ের নিচ থেকে যেন মাটিটা সরে গেলো।প্রথমে তো অজ্ঞানই হয়ে গেছিলাম। এরপরে যে কতো কেঁদেছিলাম ঠিক খেয়াল নেই।

তিনদিন হয়ে গেলো- এর মাঝে চাচা-চাচিকে আমি বাসায় দেখলাম না। এমনকি আম্মু মারা যাওয়ার দিনও তারা কেউ ছিলো না। যা ছিলো সব প্রতিবেশী, আত্নীয়-স্বজনরা। আপুর কথাটাও তখন খুব একটা মাথায় আসলো না। তিনদিন পর যখন আব্বুকে তাদের কথা জিজ্ঞেস করলাম, আব্বু সোজাসাপ্টা উত্তর দিলো,

'তারা হসপিটালে!' আমি যেতে চাইলেই আব্বু সোজা নাকোচ করে দিলো। সাতদিন পরে আপুকে বাসায় আনা হলো। আপু তখন ঠিকমতো হাঁটতে পারছিলো না জানো। কি বিধস্ত অবস্থা ছিলো আপুর। কিন্তু, আমি তখনো জানতাম না আপুর এমন অবস্থার কারণ কি। তবে এতোটুকু বুঝেছিলাম- আপুর পেটে থাকা বেবিটা হয়তো আর নেই।

সকালে আপুকে বাসায় আনা হলো- বিকালে অয়ন ভাইয়া তাকে দেখতে আসলেন। তবে একা আসলেন না। সাথে করে ডিভোর্স পেপারও নিয়ে আসলেন। আপু আর ভাইয়ার রিলেশনের বিয়ে ছিলো। টানা পাঁচ বছরের রিলেশনের পর তাদের বিয়ে হয়। আপু ভাইয়াকে খুউব ভালোবাসতো। কিন্তু, সেই মানুষ টা যখন তাকে ছেড়ে দিতে চাইলো- আপু নিজেকে সামলাতে পারলো না। ওই অসুস্থ শরীরে সবার সামনে আপু তার পা ধরে কেঁদেছিলো। বারবার বলেছিলো,

'আমাকে ছেড়ে যেওনা অয়ন। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না!'

প্রতিউত্তরে অয়ন ভাইয়া বলেছিলো,,

'একজন ধ*র্ষি*তা মেয়ে। যাকে ভোররাতে অর্ধ-উলঙ্গ অবস্থায় শহরের অর্ধেক মানুষ দেখে নিয়েছে। তাকে আমি আমার ঘরে তুলে, নিজেকে হাসির খোরাক বানাতে চাই না। আর তাছাড়া, ডক্টর বলেছে তুমি আর কোনোদিন 'মা' হতে পারবে না। তাহলে, তোমার মতো একটা কাঠের পুতুল কে নিয়ে আমি কি আলমারি তে সাজিয়ে রাখবো? সরি টু say- অয়ন চৌধুরীর এতোটাও খারাপ সময় আসেনি যে তাকে একজন ধ*র্ষি*তা বন্ধা নারীর সঙ্গে বাকি জীবন কাটাতে হবে!'

ভাইয়ার শেষ কথাতে আপু সেদিন অনায়াসে ভাইয়ার পা দুইটা ছেড়ে দিয়েছিলো। আর তার পর থেকেই আমাদের পুরা পরিবারটা ভেঙে গেলো। রাস্তা-ঘাটে, হাট-বাজারে, যেখানে-সেখানে আব্বু বা চাচ্চুকে দেখলে লোকেরা নোংরা কথা বলতো। কতোজন তো বাড়ি বয়ে এসে নোংরা কথা বলে যেতো। আবার মাঝে মাঝে বাড়ির ভেতরে ইট-পাথর ও ছুড়ে মারতো জানো!

এই সবকিছুর মধ্যে আব্বুর আমাকে নিয়ে খুব চিন্তা হতে লাগলো। সবেমাত্র এসএসসি শেষ করেছি আমি, আমার ভবিষ্যৎ তো এখনে ফেলানো। কিন্তু, এখানে থাকলে আপুর সাথে সাথে এরা হয়তো আমাকেও বাঁচতে দিবে না। এমন শঙ্কা শুরু হতেই আব্বু-চাচ্চু মিলে আমাদের বাড়িটা বিক্রি করে দিলেন। আব্বু আমাকে আর ভাই কে নিয়ে এই শহরেরই একটা ছোট্ট ভাড়া বাড়িতে থেকে গেলন। আর চাচ্চু তার মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে এই শহরের থেকে দূরে চলে গেলেন। যেখানে তার মেয়েকে কটু কথা বলার মতো আর কেউ থাকবে না। তারা শান্তিতে থাকতে পারবে। কিন্তু, শান্তি আর মিললো কই? এই সবকিছুর মাঝে আপু তো ধীরে ধীরে ট্রমায় চলে গেলো। শান্তির নামে এক নতুন অশান্তির সূচনা হলো।"

একটা গল্প বলার মতো করে কথাগুলো বলে অবশেষে থামলো হিয়া। অন্যদিকে, রুদ্রর অবস্থা ততোক্ষণে আরো খারাপ হয়ে গেলো। তার চোখের সামনে সবকিছু ক্রমশই ঝাপসা হতে শুরু করেছিলো। সে এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হিয়াকে হয়তো কিছু বলতে চেয়ছিলো- কিন্তু তার কাছে আর বেশি সময় ছিলো না। তবুও সে হাঁপিয়ে যাওয়া গলায় খুব কষ্ট আওড়ালো,,

"হিয়াহ! আমি, আমি তোমার বোনকে..."

আরকিছু বলার আগেই হিয়া তাকে থামিয়ে বলে উঠলো,,

"কোনো এক্সপ্লেইন নয় রুদ্র। আমি কোনোরকম কোনো এক্সপ্লেইন শুনতে চাই না। কারণ, আমার যা করার ছিলো- তা করা হয়ে গেছে। এখন তুমি এক্সপ্লেইন দিলেও আমি যেখানে, না দিলেও সেখানে। কোনো কিছুই আর বদলানোর মতো নেই।"

রুদ্র আর কিছু বলতে পারলো না। হুট করেই গাছের সাথে হেলান দিয়ে মাথাটা এলিয়ে দিলো। তার শরীর যেন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। চোখ দুইটা বন্ধ হওয়ার জন্য খুব বেশি তাড়া দিচ্ছে। কিন্তু, তবুও যতোটুকু সময় চোখটাকে খোলা রাখা যায়।

"তবে একটা কথা কি জানো রুদ্র! শুরু থেকেই তোমাকে হত্যা করার কোনো প্রি-প্লান আমার ছিলো না। চাচ্চু অবশ্য শুরুতেই বলেছিলো, তোমাকে মেরে দিতে। কিন্তু, আমি সেটা চায়নি। আমি শুধু তোমাকে ভাঙতে চেয়ছিলাম! তোমাকে মারাটা আমার উদ্দেশ্য ছিলো না।

যেহেতু, অন্যায় তোমরা সবাই করেছো, সেখানে শুধু তোমাকে হত্যা করলে সেটা বেইমানি হয়ে যেতো। এজন্য, আমি শুধু চেয়েছিলাম- তোমার সাথে প্রেমের অভিনয় করে তোমার দুর্বলতাকে কাটাতে। তোমাকে নিজের প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে তোমার পৃথিবীর একমাত্র আলো হতে। আর সবশেষে, তোমার পৃথিবীকে অন্ধকার করে বিদায় নিতে!' কিন্তু, মাঝখানে তুমি শালা আরেকটা ঘাপলা মেরে বসলে। বাই এনি চান্স- আহনাফ ভাইয়ের জন্মদিনে তুমি আমার সাথে ইন্টি*মেট হয়ে গেলে।'

যার জন্য আমি আমার মা'কে হারালাম, আমার আপুকে শেষ হয়ে যেতে দেখলাম। তার সাথেই কিনা আমি স্ব-ইচ্ছায় ইন্টি*মেট হয়ে গেলাম? আআআআ! ভাবতে পারছো- ঠিক কতে বড়ো অন্যায় করেছি আমি। আর সেই অন্যায়ের সুযোগ নিয়েছো তুমি। নিজের ওপর নিজেরই খুব ঘৃণা লাগতো আমার। ঘৃণায় সারা শরীর গিজগিজ করতো। একজন মেয়ে আর একজন বোন হিসেবে নিজেকে অযোগ্য মনে হতো আমার।

আর তারওপর তোমার সেই এক ঘ্যানঘ্যানানি 'বিয়ে করো, বিয়ে করো' তো আছেই। সবকিছু মিলিয়ে এক সময়ে দারুণভাবে অতিষ্ঠ হয়ে গেলাম আমি। 'যেখানে আমি তোমাকে শূন্য করতে চেয়েছিলাম,-সেখানে আমি নিজেই তোমাতে পূর্ণ হতে শুরু করলাম!' এমনকি, এমনকি আমি তোমার অস্তিত্ব কে-ও নিজের শরীরের মাঝে বয়ে বেড়াতে শুরু করলাম! ভাবা যায়, কতোটা লুজার আমি?

দিনশেষে, পাগল-পাগল মনে হতো নিজেকে। আর আমার জন্য আতঙ্ক মনে হতো তোমাকে! আর তখন-ই আমি ঠিক করলাম, এবার হয়তো তোমাকে শেষ করা উচিত! এখন হয়তো তোমাকে মারা'টা খুব বেশি ভুল হবে না। আর অবশেষে, অবশেষে আমি তোমাকে মেরেই দিলাম!'

হিয়ার এতোগুলো কথার প্রতিউত্তরে রুদ্র ভাঙা গলায় শুধু একটা প্রশ্নই করলো,,

"তারমানে.. তুমি কখনো আমাকে ভালোবাসোনি?"

"যেখানে শুরু থেকেই আমার বিয়ে আহনাফ ভাইয়ের সাথে ঠিক হয়ে আছে, সেখানে আমি তোমার মতো কাউয়া কাদেরকে কিভাবে ভালোবাসি বলো?"

হিয়ার কথায় রুদ্র অবাক হলো না। একটুও অবাক হলো না সে। উল্টো, ক্লান্ত চোখ দু'টোকে খোলা রাখার চেষ্টা করে করুণ স্বরে বলল,,

"আমার জন্য কি কখনো তোমার মনে কোনো ফিল আসেনি হিয়া?"

"একটুও না!"

রুদ্র একটু হাসার চেষ্টা করলো। তবে সে হাসিতে শব্দ করতে পারলো না।

"কিন্তু, তোমার গর্ভে আমার সন্তান আছে!"

"অ্যাবর্শোন করিয়ে নিবো!"

হিয়ার এমন স্বাভাবিক কথায় রুদ্র যেন আঁতকে উঠলো। তার গলাটা যেন শুকিয়ে গেলো। বন্ধ হতে চাওয়া চোখ দুইটা এবার পানি ভরে উঠলো। সে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,,

"এটা তুমি কি বলছো হিয়া? তুমি ওর মা হও!"

"সো হোয়াট? যার জন্য আমার আপুর সন্তান এই পৃথিবীর আলো দেখতে পারেনি! তার সন্তানকে আমি এই পৃথিবীর আলো দেখাবো? এটা তুমি ভাবলে কিভ করে রুদ্র?"

রুদ্রর বুকের ভেতরটা আবারো ধক করে উঠলো। চোখের সামনে ভেসে উঠলো তার ছোট বেলার স্মৃতি। বাবা না থাকাতে কতো কষ্ট করে বড়ো হতে হয়েছে তাদের। তার মা দিনের পর দিন কিভানে পরিশ্রম করেছে তাদের জন্য। একটু বাদেই রুদ্র হঠাৎ করে হিয়া একটা পা বুকে জড়িয়ে নিলো। করুণ স্বরে বলল,,

"এভাবে বইলো না হিয়া প্লিজ! ও তো শুধু আমার সন্তান নয়, তোমার ও সন্তান। তাহলে, ওর ব্যাপারে এসব কথা তুমি কিভাবে বলতে পারো?'

একটু থেমে,

"আচ্ছা হিয়া! তোমার মনে হয় তো, তোমার আম্মু আর তোমার আপুর এই অবস্থার জন্য আমি দায়ী? এই সবকিছু চমার জন্য হয়েছে? আচ্ছা, ঠিক আছে। তাহলে আমি মেনে নিচ্ছি। এই সবকিছুর জন্য আমি-ই দায়ী। এই সবকিছু আমারই পাপ। কিন্তু ও? ও তো নিষ্পাপ হিয়া। তুমি ওকে বাঁচতে দাও। ও এখনো এই পৃথিবীর আলো দেখেনি। আমাকে দেখেনি, তোমাকে দেখেনি। তুমি একবার ওকে এই পৃথিবীর আলো দেখতে দাও। ও নিষ্পাপ হিয়া। ও নিষ্পাপ। ওর গায়ে কোনো পাপ নাই, কোনো কলঙ্ক নাই..."

রুদ্রর কথ শেষ না হতেই হিয়া শক্ত গলায় বলে উঠলো,, "ও নিষ্পাপ নয় রুদ্র!"

হিয়ার কথায় রুদ্রর কান্না হঠাৎ থেমে গেলো। সে চোখ তুলে তাকাতেই হিয়া বলল,,

"ওর সব থেকে বড়ো পাপ- ও তোমার সন্তান। ও তোমার রক্ত, তোমার অস্তিত্ব, তোমার সত্তা! আর এতোটুকু কারণই যথেষ্ট ওকে শেষ করার জন্য!"

রুদ্র বেশ কিছুটা সময় নিস্তব্ধ হয়ে রইলো। এরপরে ভেঙে যাওয়া স্বরে বলল,,

"আচ্ছা ঠিক আছে,যদি এটাই ওর পাপ হয়৷ তাহলে, ওকে আমিই বড়ো করবো। তুমি শুধু ওকে ভূমিষ্ট হওয়ার আগ-পর্যন্ত তোমার গর্ভে জায়গা দাও। কথা দিচ্ছি ও আসা মাত্রই আমি ওকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবো। আর কখনো তোমার সামনে আসবো না। নিজের ভালোবাসার দাবী দেখাবো না। নিজের হয়ে সাফাই গাইতেও আসবো না। আর তুমি যে ওর গর্ভধারী মা এই কথাটাও, আমি কখনোই ওকে বলবো না। 'তুমি শুধু ওকে এই পৃথিবীর আলোটা দেখতে দাও হিয়া।"

শেষ কথাগুলো বলার সময় রুদ্র যখনই কান্না করে দিলো। হুট করেই তার গলা দিয়ে আরেক ফিনকি রক্ত বেরিয়ে আসলো। কয়েকবার রক্ত ফেলার পর সে একহাতে মুখের রক্তটা মুছে নিলো। এরপরে অল্প হেঁসে কাতর গলায় বলল,,

"আর আজকের পর যদি আমি বেঁচে না থাকি! তাহলে, ওকে প্লিজ আমার আম্মুর কাছে পৌঁছে দিও। আমার আম্মুই ওকে বড়ো করবে। ওর সব দায়িত্ব নিবে। কখনো তোমার কাছে আসবে না, ওর মায়ের দাবী নিয়ে। আমি কসম করছি হিয়া!"

রুদ্রর মুখ দিয়ে আবারো রক্ত আসলো। সে আর কিছু বলতে পারছিলো না। তবে তার চোখ যেন অনেক কিছুই বলছিলো। হিয়া তা দেখে হাসলো অল্প। এরপরে পড়ে থাকা রুদ্রর কোমরের কাছে গেলো। যেখানে সে তার ওড়নাটা বেঁধে দিয়েছিলো। আর আস্তে আস্তে ওড়নার গিট-টা খুলতে শুরু করলো। রুদ্রর প্রাণটা যেন তখন বেরিয়ে যাচ্ছিলো। গিট টা খোলা হয়ে গেলেই হিয়া তার ওড়ানা'টা টান দিলো।

আর পড়ে থাকা রুদ্রর জানটা যেন বেরিয়ে যেতে চাইলো। ব্যাথ্যায় সে লাফিয়ে চিৎকার দিলো। এরপরে আস্তে আস্তে জ্ঞান হারাতে শুরু করলো বোধহয়। হিয়া তখন তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,,

"রুদ্র আমি চাই না- তুমি মারা যাও! আমি চাই তুমি বেঁচে থাকো। তবে আমার থেকে দূরে থাকো!"

আর তারপরই হিয়া সেখান থেকে উঠে উল্টো দিকে পা বাড়ালো। রুদ্র জ্ঞান হারানোর আগে আপমনে একবার আওড়ালো,,

"এটা স্বপ্ন হলেও পারতো!"

আর এরপর নিজে থেকেই রুদ্রর চোখ দুইটা বন্ধ হয়ে গেলো। জোরে একটা শ্বাস পড়লো তার। রক্তে যেন মাটি ভিজতে শুরু করলো এবার। রুদ্রর চারপাশ অন্ধকারে ডোবানো। আর সেঃ অন্ধকারেই পড়ে রইলো তার নিথর দেহ!..'

#চলবে~

(রিচেক দেই নাই। বানান ভুল থাকতে পারে। একটু কষ্ট করে পড়ে নিবেন।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন