#সে_ছিলো_অন্যরকম
#পুষ্পিতা_মেহরীন_তিশা
#পর্ব- ২৯ (শেষাংশ)
হিয়ার কোলে মাথা রেখে এক অদ্ভুত শান্ত স্বরে, কিন্তু গলায় অটল আত্মবিশ্বাস মেখে রুদ্র বলতে শুরু করল—
'পয়েন্ট নাম্বার ওয়ান- 'তুমি বলেছিলে- তোমার আপুকে রেপ করা ওই রেপিস্ট গুলো আমার বন্ধু ছিলো, আর আমি তাদের চামচা।অথচ, আমি জানতাম- তারা আমার র্যাগার ছিলো, আর আমি তাদের র্যাগিংয়ের শিকার।
তুমি যাওয়ার পরেও যেমন সবাই আমাকে টিজ করতো, তুমি যাওয়ার আগেও তেমন সবাই আমাকে টিজ করতো। ইনফ্যাক্ট, তখন আরো বেশি করতো। জুনিয়র ছিলাম কিনা। তাই, হুটহাট নিজেদের বিনোদনের আশায়- আমাকে তারা হোস্টেল থেকে জোর করে তুলে নিয়ে যেতো। ফলস্বরূপ, সেদিন রাতেও আমি ওই পি*চাশ গুলার সাথে ছিলাম!"
'পয়েন্ট নাম্বার টু- 'তুমি বলেছিলে- আমার শরীর ঘামার্ত ছিলো, কারণ আমি তোমার আপুকে রে*প করে গাড়ি থেকে বের হয়েছি। অথচ, আমি জানি- আমি গাড়ির ভেতরে ঢোকার পূর্বেই তারা আমাকে মারধর করে ফেলে দিয়েছিলো। তাই আমার শরীর এলোমেলো ছিলো।"
হঠাৎ হিয়া কিছু বলতে নিলো, কিন্তু তার আগেই রুদ্র হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল, গলার স্বর আরেকটু গম্ভীর করে বলল,,
"পয়েন্ট নাম্বার থ্রি—তুমি বলেছিলে, তোমার আম্মু ঘটনাস্থলেই মারা যান। অথচ আমি জানি—শেষ পর্যন্ত তিনি আমার সাথেই ছিলেন।"
রুদ্রর এই কথায় হিয়ার দৃষ্টি হঠাৎ বদলে গেল। অবিশ্বাস, বিভ্রান্তি, আর ভেতরে জমে থাকা পুরোনো কষ্ট—সবকিছু যেন একসাথে মুখে ভেসে উঠল। সে কাঁপা গলায় একবার জিজ্ঞেস করল—
"মানেহ? আম্মু.. আম্মু কোন শেষ পর্যন্ত তোমার সাথে ছিলো?"
রুদ্র মাঝ পথেই তার কথা থামিয়ে দিলো। একচোখে তাকিয়ে হিয়ার কথার জবাব দিলো-
"তোমার আপুকে তোমাদের বাসায় নিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্ত অবদি!"
মুহূর্তেই হিয়ার কপালের ভাঁজ মুছে গেল। চোখে পানি জমে উঠে তার শ্বাস ঘন হয়ে এলো- যেন বুকের ভেতরের চাপ তার নিঃশ্বাস কেড়ে নিচ্ছে। কাঁপা গলায় সে আবার জিজ্ঞেস করল—
"আপুকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার আগ অবদি মানে? আপুকে বাসায় কে নিয়ে গেছিলো? তু.. তুমি..?"
কথা শেষ হবার আগেই হিয়া হাঁপাতে লাগল, বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। অথচ তার কোলে মাথা রেখে রুদ্র শান্তভাবে, যেন বহু পুরনো ঘটনার নিরপেক্ষ বর্ণনা দিচ্ছে—
"হ্যাঁ। গাড়ি থেকে বেরোনোর পর তোমার আম্মুকে নিয়ে একটা ঝোপের আড়ালে ছিলাম আমি। ঘন্টা দু’য়েক পর যখন ওরা তোমার আপুকে ফেলে চলে যায়, তখন আমি আর আন্টি মিলে তোমার আপুকে তোমাদেরই বাসায় নিয়ে যাই। তখন রাত তিনটা থেকে সাড়ে তিনটা হবে বোধহয়। তোমার চাচ্চু তখন বাইরে পায়চারি করছিলেন। আমাদের দেখে তিনি দৌড়ে আসলেন। আর নিজের মেয়ের ওই অবস্থা দেখে তিনি থম মেরে বসে পড়লেন…"
রুদ্র কথা বলার সাথে সাথে তার চোখের কোণে চাপা অস্বস্তি জমে উঠছিল। হাতের আঙুলগুলো হিয়ার পায়ের ওপর নিঃশব্দে নড়ছিল, যেন স্মৃতিটা ঝেড়ে ফেলতে চাইছে।
"…বেশ কিছু সময় পর আমি তাকে সবটা খুলে বলি। আর তিনি এই সবকিছুর জন্য আমাকে দায়ী করেন। পুলিশের হাতে তুলে দিতে চান আমাকে। কয়েকটা থাপ্পড়ও মারেন। ভয়ে আমি সেখান থেকে পালিয়ে আসি। অবশ্য তোমার আম্মু তোমার চাচ্চুকে আমার ব্যাপারে বলেছিলেন। আর তার পরই আমি তার হাত থেকে মুক্তি পাই।"
রুদ্র থামল এক মুহূর্ত, শ্বাস নিল গভীর করে।
"এর পরে একদিন কেটে যায়— দুর্বল আমিটা আরো বেশি নিস্তব্ধ হয়ে যাই। হোস্টেল থেকে বেরই হতাম না জানো। কোনো ক্লাস করতাম না। শুধু চুপচাপ এক কোণায় বসে থাকতাম। এরপরে একদিন তোমার চাচ্চু আমার সাথে দেখা করতে আমার হোস্টেলে আসেন!…"
রুদ্র শেষ কথাটা বলা মাত্রই হিয়ার আঙুলগুলো অসচেতনভাবে নিজের শাড়ির প্রান্ত চেপে ধরল। ভয়ার্তভাবে ঠোঁট দিয়ে জিহ্বা ভিজিয়ে নিলো সে। ততোসময়ে রুদ্র আবার বলতে শুরু করলো,,
"প্রথমে আমি খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম জানো, ভেবেছিলাম উনি আমাকে পুলিশে দেবেন, নয়তো খুব মারধর করবেন। কিন্তু, আমার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে তোমার চাচ্চু আমাকে রাজসাক্ষী হওয়ার দাবী করেন!"
রুদ্রর কণ্ঠে এক অদ্ভুত তিক্ত হাসি মিলল।
"তবে আমি তার দাবীকে অস্বীকার করি। কারণ, আমি জানতাম, এই ঢাকা শহরে আমি যদি কোনো ফাইলে পড়ি— তাইলে আমাকে বাঁচাতে কেউ আসবে না। দিনশেষে, হয়তো সবাই এই শহরে টিকে থাকবে— কিন্তু, আমার অস্তিত্ব ধুলায় মিশে যাবে!"
রুদ্রর কথাগুলো যেন ঘরের ভেতর ছায়ার মতো নেমে এলো। হিয়া চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইলো- চোখে অশ্রুর কুয়াশা।
"এই সবকিছু থেকে বাঁচার আশায়- ভয়ে আমি ঢাকা ছেড়ে খুলনায় চলে যাই। প্রায় পাঁচ মাস আমি খুলনায় থাকি… পাঁচ মাস পরে যখন আমি ঢাকা ফিরলাম, তখন সবকিছু ঠান্ডা। সেই ছেলেগুলো তখন আর ভার্সিটিতে পড়তো না। তোমার চাচ্চুর ছায়াও আর কখনো আমি দেখলাম না। ভেবেছিলাম, সবটা হয়তো চুকিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে আমি সবটা ভুলতে শুরু করলাম। আর ঠিক তখন-ই, তুমি...."
রুদ্র কথাটা শেষ করার আগেই- হিয়া দীর্ঘ নীরবতার পর শান্ত, প্রায় নিস্পৃহ গলায় বলল—
"এতোকিছুর মাঝে, আমার আম্মু কিভাবে মারা গেলো?"
রুদ্র কিছুক্ষণ ভেবে, গলার স্বর একদম সাধারণ রেখে বলল—
"উমম! তোমার আম্মুর অবস্থা কিন্তু তখন ওতোটাও খারাপ ছিলো না। যতোটা খারাপ থাকলে, তিনি মারা যাবেন।"
টুপ করে হিয়ার চোখের একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল রুদ্রর কপালে। রুদ্র কপাল কুঁচকে নিলো সঙ্গে সঙ্গে। হিয়া দীর্ঘশ্বাস নিয়ে শান্ত স্বরে বলল—
"রুদ্র! আমার কি তোমার কাছে ক্ষমা উচিত?"
রুদ্রর দৃষ্টি হঠাৎ বদলে গেল। সে এক লাফে তার কোল থেকে উঠে বসে গেল সোফায়। স্বর কেটে, চট করে বলল—
"না।"
হিয়া অশ্রুসিক্ত চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে রুদ্রর দিকে তাকাতেই সে বলল—
"যদি তুমি এই কথা ভেবে আমার কাছে ক্ষমা চাও— যে আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব! তাইলে, আমি বলবো যে তুমি আমার কাছে ক্ষমা চেয়ো না। কারণ, আমি অলরেডি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি!"
এতেটুকু বলেই রুদ্র অপ্রত্যাশিতভাবে হিয়ার দিকে একটা ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিলো। আর হিয়া কপাল কুঁচকে বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল— কারণ, রুদ্রর এমন উত্তর সে কল্পনাও করেনি। তার চোখে অবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠলো।
রুদ্র সোফাতে শরীর দু-হাত মেলে এলিয়ে দিল, গলার স্বরে খানিক হালকা খুনসুটি মিশিয়ে বলল—
"যেহেতু, আমি তোমাকে প্রচন্ড রকমের ভালোবাসি! সেহেতু, আমি তোমার এই ভীষণ রকমের ভুলও ক্ষমা করতে পারি। ব্যাপার নাহ!"
হিয়া দ্বিধা আর অবাক ভাব নিয়ে ধীরে ধীরে প্রশ্ন করল—
"তোমার কোনো অভিযোগ নেই আমার ওপর?"
রুদ্র মুখে নির্লিপ্ত একরকম শান্ত ভাব নিয়ে দু’পাশে মাথা নাড়ল, গলার স্বর ঠাণ্ডা—
"উমহু! একদমই না। তোমার জায়গায় আমি থাকলেও হয়তো, এই সেইম কাজটাই করতাম!"
হিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর সামান্য থেমে বলল—
"কিন্তু, আমার একটু সময় চাই রুদ্র!"
রুদ্র সোফায় এলিয়ে থাকা ভঙ্গি ভেঙে সোজা হয়ে বসল, কপালে কৌতূহলের ভাঁজ—
"কিসের জন্য?"
"নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য।"
রুদ্র এবার ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে নিল, চোখে বিদ্রুপ—
"গুছিয়ে নিবে? কিন্তু, কিসের জন্য?"
হিয়া অবাক হয়ে তাকাতেই, রুদ্র ঠাণ্ডা অথচ সুরে খানিক ধার এনে বলল,—
"হিয়া আমি তোমাকে বলেছি— তোমার ওপর আমার কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু, এটা বলিনি— তোমার ওপর আমার কোনো ঘৃণাও নেই!"
হিয়া এবার ঘাড় ঘুরিয়ে বড় বড় চোখে তাকাল, ঠোঁট সামান্য ফাঁক হয়ে গেল তার। রুদ্র দৃষ্টি স্থির রেখেই এগিয়ে বলল,—
"হিয়া! আমি বলেছি— তুমি আমার সাথে যেটা করেছো, আমি তার জন্য তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। এটা বলিনি— তুমি আমার সন্তানের সাথে যা করেছো, তার জন্যও তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি!"
রুদ্র একটু থামল, তারপর গলার স্বর আরও দৃঢ় করে বলল,—
"হিয়া! আমি তোমার ওপর কোনো অভিযোগ করিনি। তার কারণ— তোমার ওপর আমার কোনো অভিমান জন্মেনি, জন্মেছে ঘৃণা! আর ঘৃণাকে নিশ্চয়ই অভিযোগ বলে অবিহিত করা যায় না?"
রুদ্রর কণ্ঠের ধার হিয়ার বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দিল। তার মুখে শূন্য দৃষ্টি, চোখের পলক পড়ছে না।
রুদ্র ফাঁকা হেসে হিয়ার পাশে এসে বসলো। হিয়ার চোয়ালে হালকা হাত রেখে গলার স্বর শান্ত আর চোখের দৃষ্টি শীতল করে বলল,—
"আচ্ছা, একটা কথা বলো— তুমি কি ভাবছো? যে আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছি তোমাকে? নিজের ভুলগুলো বুঝতে পেরে— অতীত ভুলে সারাজীবন তুমি যেন আমাকে ভালোবাসতে পারো, আমার পাশে থাকতে পারো, আর আমরা দু’জনে মিলে একটা সুখী সুন্দর সংসার সাজাতে পারি— সেজন্য আমি আমার হয়ে তোমার সামনে এতো সময় ধরে সাফাই গাইলাম? হুম? এসব ভাবছো তুমি?"
হিয়া কোনো উত্তর দিল না। তার ঠোঁট নড়ল না, শুধু চোখ স্থির হয়ে রইল রুদ্রর মুখে। রুদ্র হঠাৎ উচ্চস্বরে একগাল হাঁসল। হাসির ভেতরে ব্যঙ্গ আর কষ্ট মিলেমিশে একরকম অদ্ভুত শব্দ তৈরি করল। তারপর হিয়ার পাশ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত রেখে ঝুঁকে বলল,—
"কিলারহার্ট…! যদি তুমি এমন কিছুই ভেবে থাকো— তাহলে আমি বলবো তুমি বোকার স্বর্গে বাস করছো! কারণ, আমি তোমাকে ভালোবেসে তোমার বাকি জীবন সুন্দর করে তুলতে নয়— তোমাকে ঘৃণা করে তোমার বাকি জীবন নরক করে তুলতেই তোমাকে বিয়ে করেছি!"
কথাটা শুনে যেন হিয়ার সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। তার নিঃশ্বাস যেন গলায় আটকে গেলো, চোখে আতঙ্কের ছায়া স্পষ্ট হলো। রুদ্র ঠাণ্ডা স্বরে ব্যঙ্গ টেনে বলল—
"দেখো, হিয়া। তুমি কি চেয়েছিলে? তুমি চেয়েছিলে, আমার সন্তানকে হত্যা করে আমাকে শেষ করে আহনাফকে বিয়ে করতে… আহনাফের সাথে সুখের সংসার গড়তে… আহনাফের ভালোনাসায় নিজেকে মুড়িয়ে রাখতে…! আর আমি? আমি চেয়েছিলাম— আমার সন্তানকে মারার অপরাধে তোমাকে সারাজীবন একা করে রাখতে! আর সেই জন্যই আমি তোমাকে বিয়ে করেছি!"
রুদ্রর কণ্ঠ স্থির, কিন্তু প্রতিটি শব্দ যেন ছুরির মতো ধারালো হলো,—
"তবে চিন্তা করো না। আমি যেহেতু, আমার সাথে করা অন্যায়ের জন্য তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি— সেহেতু, আমি তোমাকে হাতে বা ভাতে মারবো না। আমি শুধু তোমাকে একা করে রাখবো… স্বামীর আদর, সোহাগ, ভালোবাসা আর একটা সুখের সংসারের স্বপ্ন দেখা থেকে তোমাকে বঞ্চিত রাখবো!"
রুদ্র এক মুহূর্ত হিয়ার চোখে গভীরভাবে তাকাল, তারপর আবার বলল,—
"তুমি আমার সন্তানকে পাপ বলেছিলে, হিয়া। আমার ছোঁয়াগুলো ভুল বলেছিলে। যদিও এখন তোমার জন্য আমার ছোঁয়াগুলো বৈধ। তবুও, এখন থেকে আমি আর তোমাকে স্পর্শ করবো না… আমি আর কখনো তোমাকে মাতৃত্বের স্বাদ নিতে দিবো না, হিয়া! কখনো কারো ‘মা’ হয়ে উঠতে দিবো না তোমাকে। আমি তোমাকে সারাজীবন একা করে রাখবো, হিয়া। সবদিক থেকে একা করে রাখবো তোমাকে। আর এটাই হবে তোমার কর্মের জন্য তোমার সর্বশ্রেষ্ঠ শাস্তি!"
তারপর ধীরে, ঠোঁটের কোণে বিষ মাখা হাসি এনে বলল—
"So, get ready to spend the rest of your life with loneliness, humiliation, disgrace, and despair as your companions. God bless you… my killerheart!"
কথাটা শেষ করে রুদ্র রুম থেকে বের হতে পা বাড়াল। হিয়া স্থির হয়ে বসে রইল, হাত-পা যেন অবশ হয়ে গেছে তার।
কিন্তু হঠাৎ থেমে রুদ্র আবার ফিরে এলো। আঙুলে ছক কষার মতো ভঙ্গি করে বলল—
"ওহ! আরেকটা কথা। আমার না করা যে অপরাধের জন্য তুমি আমাকে এই নির্মম শাস্তি দিয়েছো, তার জন্য তোমাকে নিজের হয়ে সাফাই দেওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার ছিলো না… বিশ্বাস করো, একটুও ইচ্ছে ছিলো না আমার। তারপরেও, কেন এতো সময় ধরে নিজের সেই সাফাই আমি দিলাম জানো?"
হিয়া নিষ্পলক চোখে তার দিকে তাকাল। রুদ্র ঠাণ্ডা গলায় বলল,—
"যাতে তোমার অনুশোচনা হয়! আমার আম্মু বলে— মানুষের জন্য অনুশোচনার থেকে বড়ো শাস্তি আর হয় না। আর আমি চাই— তুমি সেই শাস্তিটাই পাও।"
তারপর হঠাৎ ঠোঁটে ব্যঙ্গের বাঁক এনে বলল—
"যদিও, তুমি কিলারহার্ট! তোমার অনুশোচনা হওয়ার কথা নয়। তবুও আমি বলবো— তোমার অনুশোচনা হোক। একটু অনুশোচনা হওয়া উচিত তোমার!"
এটুকু বলেই রুদ্র হিয়ার উদ্দেশে আরেকটা কিস ছুড়ে দিল, তারপর দরজার দিকে পা বাড়াল।
দরজার কাছে যেতেই ওয়ারড্রবের ওপর রাখা হিয়ার ফোনের ভাইব্রেশনের শব্দ তার কানে এলো। রুদ্র ঘুরে গিয়ে ফোনটা তুলে নিল। স্ক্রিনে জ্বলছে— আহনাফ ৯২ বার কল করেছে। রুদ্র ভ্রু কুঁচকে, ঠোঁট বাঁকিয়ে ভেংচি কাটল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল— রাত ১:০২।
রুদ্র কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আহনাফের উত্তেজিত, শ্বাসকষ্টমাখা কণ্ঠ ভেসে এলো—
"হিয়া, কোথায় আছো তুমি? সেই কখন থেকে তোমাকে কল করছি, ধরছো না কেন? হিয়া, তুমি ঠিক আছো তো? তোমার কোনো বিপদ হয়নি তো? কই আছো তুমি? আরে কথা কেন বলছো না?"
আহনাফের উদ্বিগ্ন স্বর যেন রুদ্রর কানে খোঁচা মারল। সে ভ্রু কুঁচকে সামান্য কান চুলকাল, তারপর বিরক্তি মাখা বাঁকা হাসি টেনে বলল,—
"আসসালামু আলাইকুম! ভাইজান। আমি আপনার অতীতের প্রেমিকার বর্তমান স্বামী আর ভবিষ্যৎ বাচ্চার বাপ বলছিলাম… আসলে, আমরা এই মুহূর্তে বাসর করতে খুব ব্যস্ত আছি। আপনি বড়ো শালা হয়ে, বারবার কল করে ডিস্টার্ব করছেন— বিষয়টা ভালো দেখাচ্ছে না।"
সে হালকা হাসল, তারপর ঠাণ্ডা ব্যঙ্গভরা গলায় বলল—
"দয়া করে আর কখনো আমার বউকে কল করে রোমাঞ্চে ব্যাঘাত ঘটাবেন না। কারণ, আজ থেকে তার ধ্যান-জ্ঞান, চিন্তা-ভাবনা সবকিছুতে শুধু আমিই থাকবো… না কোনো বাবা, না কোনো ভাই, না কোনো প্রেমিক— আর মা? সে তো আগে থেকেই নাই। অতঃপর, আপনি ভালো থাকবেন ভাইজান। আল্লাহ হাফেজ!"
বলেই রুদ্র কল কেটে দিল। একটুও দেরি না করে ফোনটা তুলে পাশের পানিভর্তি জগে ছুড়ে দিল। তারপর দরজার দিকে পা বাড়িয়ে নিজের ফোন বের করে শুভ্রকে কল করল—
"শুভ্র, শোন! কাল সকালেই আমরা বাড়ি ফিরছি। মা’কে বলিস তার বড়ো ছেলে আর তার কিলার বউকে বরণ করার ব্যবস্থা করতে!"
শুভ্রর বিস্মিত কণ্ঠ ভেসে এল—
"ভাইয়া, তোমরা বিয়ে নিয়েছো?"
রুদ্র ঠাণ্ডা হেসে বলল—
"বিয়ে না করলে বাসর’টা হারাম হয়ে যাবে। সেই ভয়ে হালকা-পাতলা বিয়ে করেছি। বাকিটা ওখানে গিয়ে করবো। সব ব্যবস্থা করে রাখিস!"
তারপর কল কেটে দিয়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
------
বর্তমানে....
#চলবে~