#সে_ছিলো_অন্যরকম
#পুষ্পিতা_মেহরীন_তিশা
#পর্ব- ৩১
অন্যদিকে, রুদ্রর কথায় লারা গলা খাঁকারি দিয়ে কাশি দিলো। মুচকি হেঁসে বলল,,
"বিপদ সংকেত সামনে আছে নাকি?"
হিয়া বেলকনিতে চলে যেতেই রুদ্র যেন দম নিয়ে বাঁচলো। লম্বা একটা শ্বাস ছেড়ে সে স্বাভাবিক হয়ে বলল,,
"এতো সময় ছিলো, মাত্রই বেলকনিতে গেলো। আচ্ছা, এসব বাদ দে। কি বলার জন্য কল করেছিস সেটা আগে বল!"
"তোর সাথে প্রেমালাপ করার জন্য কল করেনি রে। এতো ভাব নিয়ে লাভ নেই!"
"তাহলে, কি জন্য কল করেছিস শুনি?"
লারা একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলল,,
"তারপর? কেমন যাচ্ছে ওখানে তোর দিনকাল। এখন তো তুই আবার চাচ্চু হয়ে গেছিস!"
একটু থেমে লারা আবার বলল,,
"আচ্ছা তোকে চাচ্চু ডাকবে ওই পিচ্চিটাকে তো দেখালি না। সুস্থ আছে তো সে?"
রুদ্র নখ কামড়ে কিছু একটা ভাবলো, এরপরে হুট করেই বলল,,
"তুই দেখতে চাস ওকে? তাহলে, চলে আয় কাল সকালে।"
রুদ্রর হুট করে বলা এমন কথায় লারা চমকে উঠলো। অবাক হয়ে চোখ-মুখ কুঁচকে বলল,,
"কিহহহ?"
"হুম। আজ রাত ১১টার ট্রেনে উঠবি, ভোর চারটায় আমার বাসায় সেইফলি পৌঁছে যাবি। ওকে?"
"এই তুই কি বলছিস রে?"
"বলছি- তুই আবার একা আসতে যাস না। মেয়ে মানুষ কোথায় আবার কি হয়ে যায়। তারচেয়ে রাহাদ কে তোর করে নিয়ে আসিস। তোর সেইফটির জন্যই কিন্তু আনতে বলেছি! বুঝেছিস?"
"রুদ্র! তোর মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে?"
"না, আমি একদম সুস্থ আছি। পিচ্চি টাকে দেখতে চাইলে, কাল ভোর ভোর চলে আসিস। তাইলে, তোকে সুন্দরবন টাও ঘুরিয়ে দেখাবো। আর পছন্দ হলে, কোনো বাঘের কেয়ারটেকারের সাথে তোকে হাঙ্গা করিয়ে দিবো!"
শেষ কথাটায় হয়তো লারা কিছুটা চেতে উঠলো। দাঁত চেপে বলতে নিলো,,
"তোর তো...."
"আচ্ছা এখন রাখছি। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। গুড আফটারনুন এন্ড সি ইউ কাল ভোর। ওকে লারা'পু?"
লারা কোনো প্রতিউত্তর করার আগেই রুদ্র কলটা কেটে দিলো। ফোনটা টি-টেবিলের ওপর রেখে ধপাস করে শুয়ে পড়লো বেডে। এখন চার হাত-পা চারদিকে ছুড়ে নাক ডেকে একটা ঘুম দিবে সে।
-
সন্ধ্যায় যখন সবাই সিরিয়াল দেখার উদ্দেশ্য টিভির সামনে বসে আছে। হিয়া তখন এক প্লেট ভর্তি পকোড়া আর চা নিয়ে সবার মাঝে হাজির হলো। সাবিলা বেগম তখন নতুন অতিথি কে পায়ের ওপরে রেখে দোল দিচ্ছেন। আমিনা বেগম রিমোট হাতে বসে আছেন। আর মোমো চোয়ালে হাত রেখে মুচকি হেঁসে তার বাচ্চাটার দিকে চেয়ে আছে।
হিয়া কিছু সময় স্তব্ধ হয়ে অপলক চোখে মোমোর সেই চাহনিকে দেখলো। কেন জানি, তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ-ই খাঁখাঁ করে উঠলো। কোথাও জানি একটা তীব্র শূন্যতা অনুভব করলো সে। আর মুহূর্তেই তার চোখ দুইটা পানিতে ভরে উঠলো। তাকে এমন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, সাবিলা বেগম ডাক পারলেন,,
"কিরে হিয়া। তুই ওখানে ওভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?"
সাবিলা বেগমের হঠাৎ কন্ঠে কিছুটা কেঁপে উঠলো হিয়া। একহাতে চোখের পানিটা আড়াল করে, অল্প হাসার চেষ্টা করলো সে। যেন কিছুই হয়নি।
"কই কিছু না তো আম্মু!"
এরপরে হিয়া এগিয়ে এসে সবাইকে চা দিতে দিতে মোমোর উদ্দেশ্য হেয়ালি সুরে বলল,,
"আপনার'ই তো বাচ্চা আপা। ওভাবে তাকিয়ে থাইকেন না। নয়তো, নজর লেগে যাবে।"
হিয়ার কথায় হঠাৎ যেন ঘোর ভাঙলো মোমোর। সে একটু নড়েচড়ে বসে বলল,,
"লাগবে নারে খালাম্মা। দেখছেন না, কপালে ইয়াাাা বড়ো একটা চাঁদ এঁকে দিয়েছি। নজর লাগার চান্স-ই নাই।"
"তা অবশ্য ঠিক। কপাল জুড়ে যে চাঁদ তুই আঁকছিস- তাতে নজরের 'ন' ও লাগবে বলে মনে হয় না।"
তাদের কথার মাঝেই সাবিলা বেগম খেয়াল করলেন, তার কোলে থাকা পুঁচকিটা ঘুমিয়ে পড়েছে। আর ঘুমের মাঝেই সে হঠাৎ হঠাৎ মুঁচকি হাসি দিচ্ছে। কখনো বা মুখটা দুঃখী দুঃখী করছে। আবার কখনো এক আঙুল মুখে পুরে দিয়ে সেটা টানছে। যেন সে মায়ের দুগ্ধ পান করছে। মুখে একগাল হাসি নিয়ে পিচ্চিটার এই কান্ড বেশ কিছু সময় দেখলেন সাবিলা বেগম। খানিক বাদে পুচকি টাকে কোলে তুলে,মোমো কে বললেন,,
"ও ঘুমিয়ে পড়েছে মোমো। যা ওকে রুমে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দে। গায়ের ওপরে একটা পাতলা কাঁথা রাখিস, যেন ঠান্ডা না লেগে যায়।"
মোমো অতি সর্তকভাবে বাচ্চাটাকে বুকে নিলো। সে চলে যেতেই সাবিলা বেগম হিয়ার উদ্দেশ্যে বললেন,,,
"রুদ্র কোথায় রে হিয়া? বেরিয়েছে নাকি কোথাও? ওকে তো সেই দুপুর থেকে আর দেখলাম না!"
হিয়া চায়ে চুমুক বসাতে বসাতে বলল,,
"সে রুমে নাক ঢেকে ঘুমাচ্ছে!"
"এই ভরা সন্ধ্যায়? রাতে আর ঘুম হবে ওর?"
একটু থেমে তিনি আবার বললেন,,
"যা গিয়ে রুদ্র কে ডেকে দে। এখন আর ঘুমাতে হবে না। পরে চাতক পাখির মতো সারারাত জেগে থাকবে।"
হিয়া চা খাওয়া থামিয়ে একটু ভীত স্বরে বলল,,
"আমি ডাকবো?"
সাবিলা বেগম অপ্রস্তুত হয়ে একটু ভ্রু কুঁচকাতেই হিয়া আবার বলল,,
"হ্যাঁ। আমিই তো ডাকবো। আমি এককাপ কফি বানিয়ে নিয়ে এখনই যাচ্ছি আম্মু।"
-
হিয়া কফি বানিয়ে নিয়ে রুমে যেতেই দেখলো- বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে রুদ্র। হিয়া বার কয়েক তাকে ডাকলো। তবে রুদ্রর কোনো রেসপন্স না পেলো না। বিরক্ত হয়ে সে কফির মগটা রেখে চলে যাবে- এমন সময় তার মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি উঁকি দিলো। সে ফিরে এসে বেডের কাছে এসে দাড়ালো। ঠোঁটের কোণে দুষ্ট হাসি আর হাতে গরম কইর মগ নিয়ে উপুড় হয়ে থাকা রুদ্রর ফর্সা পিঠ-টা ভালোভাবে পরখ করে নিলো। পিঠের ঠিক মাঝ বরাবর একটা কালো তিল যেন তার দৃষ্টি কাড়লো। আর কিছু সময় পর- হিয়া ঠিক সেই তিলের স্থানেই সর্তক ভাবে কিছুটা গরম কফি উপুড় করে ঠেলে দিলো।
হঠাৎ পিঠের ওপরে খুব গরম কিছু অনুভব করায় রুদ্র চোখ-মুখ কুঁচকে পিঠের দিকে হাত বাড়ালো- কি আছে সেটা বোঝার জন্য। আর তখনই তার হাতটাও যেন জ্বলে উঠলো। রুদ্রর চোখে-মুখে স্পষ্ট ভয় ফুটে উঠতেই সে ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়লো। পিঠ-টা খুব জ্বলছে তার। যেন কেউ পুড়িয়ে দিয়েছে।
হঠাৎ- সামনে হিয়াকে দেখেই সে থমকে গেলো। হিয়া একহাতে কফি আর অন্যহাত মুখে দিয়ে ঠোঁট চেপে মুচকি হাসছে। রুদ্র চোখ গরম করে তাকাতেই হিয়া হাসি থামিয়ে সুন্দর করে বলল,,
"তোমার কফি!"
রুদ্র নাক ফুলিয়ে আড়চোখে তাকিয়ে দাঁত চেপে প্রশ্ন করলো-
"আমার শরীরে গরম কফি ঢেলেছো তুমি?"
হিয়া যেন কিছুটা ভড়কে গেলো। একটা ঢোল গিলে আমতা আমতা করে জবাব দিলো-
"কতোবার ডাকলাম তোমাকে। তুমি তো উঠছিলে না।"
"তাই আমার শরীরে গরম কফি ঢেলেছো? যাতে আমাকে পুড়িয়ে মারতে পারো?"
রুদ্রর কথায় হিয়া যেন গাছ থেকে পড়লো। চেতে উঠে মুখ বাঁকিয়ে বলল,,
"এতোটুকু গরমে কেউ পুড়ে না রুদ্র। এটুকু গরমে কিচ্ছু হয় না। হুদাই এতো পাট নিয়ো না।"
হিয়ার কথায় রুদ্র একবার মুখ বাঁকিয়ে ভ্রু সটান করলো। মুখে শয়তানি হাসি নিয়ে বলল,,
"ওহ, তাই নাকি? তাহলে, চলো তোমার ওই সুন্দর মুখেও একটু এই কফিটা ছুঁড়ে দেখি। কিছু হয় নাকি!"
কথাটা বলতে বলতে রুদ্র বেড থেকে নামতে উদ্যত হলো। হিয়ার চোখ যেন কপালে উঠলো। সে কোনো রকমে কফির মগটা জোরে চেপে রেখে ভয়ে ভয়ে বলল,,
"ওই রুদ্র! না প্লিজ।"
রুদ্র দ্রুতপায়ে এগিয়ে এসে একহাতে হিয়ার হাতের কব্জি চেপে ধরলো। আর অন্যহাতে, কফির মগটা কেড়ে নিলো। হিয়ার ভয়টা যেন তখন আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেলো। সে কফির মগের দিকে চোখ রেখে রুদ্রর হাত সরানোর চেষ্টা করতে করতে, ভয়ার্ত গলায় বলল,,
"দেখো রুদ্র! মুখের স্কিন কিন্তু খুব পাতলা হয়। তারওপর আমি মেয়েমানুষ। সেহেতু, আমার শরীরের চামড়া আরো পাতলা, তোমার মতো গন্ডারের চামড়া আমার না।"
রুদ্র অবাক হওয়ার ভান করে, চোখ-মুখ গোলগোল করে বলল,,
"তারমানে, তুমি বলতে চাইছো- আমার শরীরে গন্ডারের চামড়া??"
হিয়া রুদ্রর হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বলল,,
"না গন্ডারের গায়ে তোমার চামড়া!"
রুদ্র আর কিছু বলতে যাবে। তবে তার আগেই হিয়া তার হাত ছাড়িয়ে জোরে পালালো। রুদ্র কোমরে দু'হাত বেঁধে হিয়ার যাওয়ার পানে তাকিয়ে দাঁত চেপে বলল,,
"যতো বড়ো ফেস নয়, ততো বড়ো ওয়াশ? রাতে শুধু একবার তোমায় একা পাই- তখন বোঝাবো কোনটা গন্ডারের চামড়া, আর কোনটা রুদ্রর চামড়া।"
-
এখন সময় ভোর ৪:২৬ মিনিট....
রুদ্রদের বাসার সামনে ল্যাম্পপোস্টের মতো কোমরে দু'হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে সমানে রুদ্রকে গালাগাল করে চলেছে লারা। প্রায় আধঘন্টা হতে চলল, সে রুদ্রদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে সমানে রুদ্রকে কল করে চলেছে। কিন্তু, অপরপাশের ব্যক্তির ফোনটা মনে হয় টয়লেটের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে। আর এদিকে রাগে-দুঃখে লারার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আবার অচেনা একটা জায়গায়, এভাবে একা দাঁড়িয়ে থাকতেও তার বেশ ভয় লাগছে।
এই নিস্তব্ধ নির্জন রাতে মাঝেমাঝে কিছু পোকার আওয়াজ যেন, তার ভয়টা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। বারবার মনে হচ্ছে, এই বুঝি কোনো সাদা শাড়ি পরা পেত্নী এসে তাকে টেনে নিয়ে যাবে। এই এতো ভয়ের মাঝেও লারার কয়েকবার মনে হলো,
'রুদ্রর বাড়িটা বোমা মেরে উড়িয়ে দিবে'। তাইলে, সেই বোমার আগুনে সব পেত্নী গুলো পালাবে। কিন্তু, পরক্ষণেই আবার তার মনে হলো, এটা করলে তো আর তার চাকরি থাকবে না!' তাই এই প্লান বাদ। তাকে নতুন কিছু ভাবতে হবে।
এই রকম হাজারো সু আর কু চিন্তা করতে করতে সে রুদ্রকে কল করে যাচ্ছিলো। প্রায় ৩০-৩৫ বার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো। আর সঙ্গে সঙ্গেই লারা উত্তেজিত গলায় বলে উঠলো,,
"গোলামের পুত তুই মরার ঘুমান ঘুমাচ্ছিস নাকি? আধঘন্টা ধরে তোর খুপড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমার ঠ্যাং খুলে গেলো। মাথাটাি মনে হয়, কোনো পেত্নী খুলে নিয়ে গেছে। আর তুই বউ নিয়ে আরাম করে ঘুমাচ্ছিস? তোর ঘুমের মধ্যে এক বালতি প্রস্রাব শালা বদমাশ। তোর...... "
আর কিছুর বলার আগেই টপ করে সদর দরজাটা খুলে গেলো। আর ওমনি লারা হুমড়ি খেয়ে রুদ্রর ওপরে পড়তে নিলে রুদ্র বিজ্ঞের মতো করে লারাকে সাইড দিলো- আর লারা গিয়ে পড়লো সোজা ফ্লোরে!
ব্যাথ্যায় লারা 'উফফ' করতেই রুদ্র চোখ ডলতে ডলতে উত্তর দিলো,,
"ভোর রাতে আমাকে গালাগালি দেওয়ার শাস্তি পেলি! আলহামদুলিল্লাহ!"
"রুদ্র তুই....."
"বেশি কিছু বললে কিন্তু, ধরে বিয়ে দিবো তখন কেন্দে মরে যাবি!"
লারা দাঁত কিড়মিড় করে রাগটা গিলে নিলো। এরপরে দাঁত চেপে বলল,,
"হারাম কি জাত, আমাকে একটু ধরে তোল নাকি?"
"পা ধরে ঝুলে থাক। টানতে টানতে ওপর অবদি নিয়ে যাই? সেখানে গিয়ে আরাম করে ঘুমাতে পারবি।"
"তুই আসলেই একটা হারামজাদা।"
"হালালজাদা'ই বা ছিলাম কবে আপা??"
লারা আর কোনো প্রতিউত্তর না করে একা একাই উঠার চেষ্টা করলো। রুদ্র দরজার ওপাশে একটা উঁকি দিয়ে আবার প্রশ্ন করলো,,
"কিরে আপা। তুই এসেছিস নাকি? আমার রাহাদ ব্রো কোথায়? ওকে আবার মাঝ রাস্তায় ফেলে আসিসনি তো?"
লারা উঠে দাঁড়িয়ে হাত ঝাড়া দিলো। এরপরে কোমরে হাত বেঁধে কিড়মিড় করে বলল,,
"নারে! ওকে আমার ঝোলার মধ্যে করে ভরে নিয়ে এসেছি। এই যে দেখ, এখানে আছে ও!"
নিজের পার্স ব্যাগটা খুলে দেখাতে নিলো রুদ্রকে। আর রুদ্রও ঝুঁকে সেটা দেখতে নিলো। যেন রাহাদ সত্যিই ওই পার্সের মধ্যে আছে। রুদ্রর এমন হেয়ালিপণা দেখে লারার যেন আরো রাগ লাগলো। সে নিজের পায়ে পরা হাইহিল দিয়ে রুদ্রর পা'টা আচ্ছা মতো মাড়িয়ে দিলো।
ব্যাথ্যায় রুদ্র 'উফফফ' করে উঠলো। পা'টা উচু করে সেখানে হাত বোলাতে বোলাতে ন্যাকি সুরে বলল,,
"সকালে উঠে, তোর ওই পা থুক্কু পায়ে পরা নেংটা জুতাটায় যদি আমি আগুন না ধরাইছি। তো আমার নামও 'রুদ্রনীল চৌধুরী' না বলে দিলাম নেংটু আপা।"
"তুই নেংটু আপা কারে কইলি?"
"তোরে! না মানে তোর ওই জুতারে...!"
লারা আরকিছু বলার আগে রুদ্র মুখে একটা হাই তুলে ঘুম ঘুম চোখে বলল,,
"আচ্ছা, চল। তোকে আগে একটা রুম দেই। গিয়ে একটু ঘুমিয়ে নে। আমিও ঘুমাবো- ঘুমের অভাবে আজকাল আমাকে চার-পাঁচ বার বাথরুমে যেতে হচ্ছে।"
-
সকাল থেকেই রুদ্রদের বাড়িটা যেন আজ- অন্য রকম কোলাহলে ভরে উঠেছে। আজকে তাদের পরিবারের নতুন অতিথির নামকরণ অনুষ্ঠান। ছোট্ট বাচ্চাটাকে ঘিরে ঘরে-বাইরে সব জায়গাতেই আজকে শুধু আলোচনার ঝড়। অন্যদিকে, রান্নাঘরে রান্নার ঝড়। বিভিন্ন রকমের খাবারের সুগন্ধে পুরা বাড়ি যেন মো মো করছে। উঠানে টাঙানো রঙিন বেলুন আর ফুলের মালা হাওয়ায় দুলছে, আবার বারান্দার একপাশে লাইট ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, সন্ধ্যায় জ্বলে উঠবে বলে। অনুষ্ঠানটা রাখা হয়েছে বেশ ঘরোয়া—কেবল কাছের আত্মীয় আর কিছু প্রতিবেশীকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে।
সাবিলা বেগম সকালে বাচ্চাটাকে গোসল করিয়ে লাল-টুকটুকে ফ্রক-সদৃশ জামা পরিয়ে কোলে নিয়ে বসে আছেন। পাশে আমিনা বেগমও আছেন। দুজনের মুখেই তৃপ্তি আর প্রশান্তি।
আমিনা বেগম বাচ্চাটার নাকে আলতো ছোঁয়া দিয়ে বললেন,,,
"মাশাল্লাহ! কতো সুন্দর লাগছে আমার নানুভাইকে। কারো নজর না লাগুক!"
সাবিলা বেগম আলতো হেঁসে বললেন,,
"সুন্দর তো লাগবেই। দেখতে হবে না দাদুভাই টা কার!"
এমন সময় হিয়া ছুটে এলো সেখানে। মুচকি হেসে বাচ্চাটার আঙুল টেনে বলল,
"এই রাজপুত্র আজকের দিনটা কিন্তু তোমার জন্য খুব স্পেশাল। তুমি জানো, আজকে তোমাকে একটা কিউট আর ছু্ট্টু মিষ্টি নাম দেওয়া হবে। যেই নামে একদিন তোমাকে সবাই চিনবে। অনেক বড়ো তুমি!"
হিয়ার কথা শুনে সাবিলা বেগম গালভরে হাসলেন। হিয়া বাচ্চাটার কপালে একটা আলতো চুমু রাখলো।
হিয়া বাচ্চাটার কপাল থেকে মুখ তুলতেই হঠাৎ তার চোখ গেলো সিঁড়ির দিকে। প্রথমে ঝাপসা চোখে তাকিয়েই তার মনে হলো—রুদ্রর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা কেমন যেন পরিচিত! কিন্তু ঠিক ধরতে পারলো না। কপালে ভাঁজ ফেলে সে দ্বিতীয়বার ঘাড় ঘুরালো। আর তখনই যেন হিয়ার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠলো, চোয়ালটা অসহায় ভঙ্গিতে ঝুলে এলো নিচের দিকে।
সিঁড়ি বেয়ে নামছে লারা। পারপেল কালারের একেবারে সিল্কি ঝলমলে শাড়ি গায়ে, খোলা চুলে হাওয়ার ছোঁয়া, কপালে টিপ, ঠোঁটে হালকা লিপ কালার, মুখে মিষ্টি হাসি। এক হাতে শাড়ির কুচি সামলে নামতে নামতে রুদ্রর সাথে প্রাণবন্তভাবে কিছু বলছে। সাধারণত লারাকে কখনো এভাবে দেখা যায় না—ওয়েস্টার্ন ড্রেসেই সে সবসময় থাকে। আজ হঠাৎ শাড়ি পরায় তাকে যেন অচেনা সুন্দরী মনে হচ্ছে, একেবারে নতুন বউ-এর মতো!
লারাকে এই রূপে দেখে হিয়ার বুকের ভেতরে যেন একটা অদ্ভুত অস্বস্তি জমে উঠলো সেই সাথে উঁকি দিলো হাজারো প্রশ্ন। আর ঠিক তখনই লারা তার একেবারে সামনে এসে দাঁড়ালো।
হিয়া স্থির চোখে তাকিয়ে অস্ফুটে, প্রায় ফিসফিসিয়ে উচ্চারণ করলো—
"লা… লারা'পু…!"
#চলবে~