#সে_ছিলো_অন্যরকম
#পুষ্পিতা_মেহরীন_তিশা
#পর্ব- ৩৩
সন্ধ্যার শান্তশিষ্ট নির্জন পরিবেশটা যেন মুহুর্তেই কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ভীত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্রর দিকে- ঘৃণা ভর্তি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে সাবিলা বেগম দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের থেকে একহাত দূরে অশ্রুভেজা বড়ো বড়ো চোখ আর হা হয়ে থাকা মুখে একহাত চেপে দাঁড়িয়ে আছে হিয়া।
সাবিলা বেগমের এমন হঠাৎ উপস্থিতি-তে হিয়া যে রুদ্রর থেকেও বেশি ভয় পেয়েছে- তা তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। হিয়া কখনোই চায়নি তাদের এই ব্যক্তিগত সমস্যা গুলো কখনো কারো সামনে আসুক। আর কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে আসুক!
সাবিলা বেগম কয়েক পা হেঁটে রুদ্রর মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালেন। তীক্ষ্ণ গলায় কঠিন শব্দে প্রশ্ন করলেন,,
"কি করছিলে তুমি?"
সাবিলা বেগমের এমন হঠাৎ কন্ঠস্বরে রুদ্র কিছুটা কেঁপে উঠলো। তার দিকে তাকাতে চেয়েও যেন তাকাতে পারলো না রুদ্র। পুনরায় ঘাড় নিচু করে নিলো। সাবিলা বেগম আবার প্রশ্ন করলেন,
"হিয়ার গায়ে কেন হাত তুলেছো?"
রুদ্র এবারেও কোনো উত্তর না দিয়ে- ঘাড় নিচু করে এদিক-ওদিক তাকালো। সাবিলা বেগমের ধৈর্যে যেন কিছুটা টান পড়লো। তিনি একটু চেঁচিয়ে উঠে বললেন,,
"আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি তোমাকে?"
তার উচ্চগলায় রুদ্র হকচকিয়ে উঠে তাকালো তার দিকে। অন্যদিকে, হিয়া উঠলো কেঁপে। পরিস্থিতি সালাম দিতে, হিয়া দু'কদম এগিয়ে এসে কিছু বলতে নিলেই, সাবিলা বেগম হাত উঠিয়ে হিয়াকে থামিয়ে দিলেন। তীক্ষ্ণ গলায় বললেন,,
"উমম! আমি আমার ছেলের সাথে কথা বলছি হিয়া!"
সাবিলা বেগমের কথায় হিয়া তার মুখে আসা কথাগুলো আবার মুখেই আঁটকে নিলো। পুনরায় নিজের স্থানে পেঁছাতে পেঁছাতে অসহায় দৃষ্টিতে একবার রুদ্রর দিকে তাকালো। তখনি সাবিলা বেগম পুনরায় রুদ্রর উদ্দেশ্য বলে উঠলেন,,
"তোমার এসব বেহা*য়াপনা আমি অনেক সহ্য করেছি রুদ্র, আর না। তুমি বড়ো হয়েছো বলে ভেবে না, যে আমি তোমাকে শাসন করতে ভুলে গেছি। কি হয়েছে তোমার বলো? কি সমস্যা হচ্ছে তোমার? হিয়ার সাথে এমন দুর্ব্যবহার কেন করছো তুমি? কি নিয়ে সমস্যা হচ্ছে তোমাদের? তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপারে আমি কখনোই ঢুকতে চাইনি। কিন্তু, তুমি আজ যেটা করলে.....! (একটু থেমে) আমি বেশ অনেকদিন থেকেই;বিষয়টা খেয়াল করছি- মেয়েটা অভ্রনীলকে কোলে নিতে গেলেও তুমি তার সাথে মিসবিহেভ করো। আড়ালে নিয়ে চোখ রাঙাও, দু-চার কথা বেশি শোনাও। কেন করো এগুলো?? কি জন্য তোমার অধঃপতন? হিয়া কি কোনো বিষ? অভ্রনীলকে স্পর্শ করলে কি বিষ নিঃসৃত হবে? নাকি তুমি তার গায়ে হাত তুললে সেই বিষ নিস্ক্রিয় হবে? কোনটা...?"
সাবিলা বেগমের বাকি কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই যেন রাগে গর্জে উঠলো রুদ্র। চিৎকার করে হুংকার দিয়ে বলল,,
" হ্যাঁ, হ্যাঁ বিষ। হিয়া একটা বিষ, তাও কোনো সাধারণ বিষ নয় ও, নরকের একটা জঘন্য বিষাক্ত বিষ ও! নরকের কীটের থেকেও ভয়ংকর ওর ছোঁয়া!"
তীব্র গর্জনে এতোটুকু বলে থামলো রুদ্র। হিয়ার চোখ বিস্ময়ে বড়ো হলেও, সাবিলা বেগম যেন থমকে গেলেন তার কথাতে। রুদ্রকে উচ্চস্বরে কথা বলতে দেখে তিনি সময় নিয়ে শান্ত গলায় বললেন,,
"আমি কি তোমাকে মানুষ করতে পারিনি রুদ্র? এটা কি আমার ব্যর্থতা?"
রুদ্র পূর্বের ন্যায় তেজ গলায় উত্তর দিলো,,
"হ্যাঁ, এটা তোমার ব্যর্থতা। এটা তোমার'ই ব্যর্থতা আম্মু। কারণ, আজ যদি তুমি আমাকে সঠিক ভাবে মানুষ করতে পারতে, তাহলে হয়তো আমি এই নরকের কীটকে চিনতে কখনোই ভুল করতাম না।"
সাবিলা বেগমের থমকে যাওয়া বিস্মিত চোখ দিয়ে এবার কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো আবেশে। কেন জানি, তিনি তার ছেলের এই রুপ মেনে নিতে পারছেন না। বুঝতে পারছেন না, এটা তার ছেলের অধঃপতন নাকি কোনো চাপা কষ্টের বহিঃপ্রকাশ!
-
রুদ্র'র চেঁচামেচিতে এতো সময়ে শুভ্রনীল, লারা আর তাদের নানি এসে হাজির হয়েছে সেখানে। তবে, উপস্থিত অবস্থা দেখে সবাই যেন ভড়কে গেছে। পরিস্থিতি বুঝতে হয়তো তাদের কিছুটা সময় লাগতো। তবে সেই সময়ের আগেই রুদ্র সামনের দিকে একটু এগিয়ে ব্যঙ্গ গলায় বলতে শুরু করলো,,
"হুহ, হিয়া? তোমার আদর্শ বউমা তাই না? ও না সরি, তোমার তো বউমা না, তোমার তো আবার মেয়ে হয় না? বড় মেয়ে, আদরের বড় মেয়ে! তো তুমি কি জানো, তোমার এই আদরের বড় মেয়ে তোমার বড় ছেলের সাথে ঠিক কি কি করেছে? বলো জানো তুমি?"
শেষ কথাটুকু দাঁতে দাঁত পিষে বলল রুদ্র। তার কথা শেষ হতেই, সাবিলা বেগম অশ্রুভেজা চোখে- খুব ধীর গতিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন হিয়ার দিকে। হিয়া সাথে সাথে তার দিক থেকে চোখ নামিয়ে নিলো। মেয়েটা ভয়ে কাঁপছে নাকি অবশ হয়ে যাচ্ছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
এমন সময় রুদ্র হঠাৎ নিজের পেটের কাছের শার্ট'টা এক উঁচিয়ে উঁচু করে তুললো। পেটের ক্ষতস্থানের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে উচ্চস্বরে বলল,,
"এইযে দেখো!"
রুদ্রর পেটের ক্ষতস্থান'টা দেখা মাত্রই সাবিলা বেগমের চোখ দুইটা বড়বড় হয়ে গেলো। না চাইতেও হাতটা উঠে গেলো, হা হয়ে থাকা মুখের ওপরে। শুভ্রনীল, আর তার নানিও বেশ অবাক হলেন। শুভ্র দৌড়ে এসে রুদ্র'র শার্ট আরেকটু উঁচু করে ভাঙা গলায় বলতে চাইলো,
"এ..এটা..এটা কিভাবে হলো ভাইয়া??"
তবে শুভ্র'র কথাকে হয়তো খুব একটা পাত্তা দিলো না রুদ্র। তাকে সরিয়ে দিয়ে তার মায়ের উদ্দেশ্য শীতল গলায় এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল,,
"এইযে ক্ষতস্থান'টা দেখছো- তিন তিনবার ছুরি মারা হয়েছে এখানে। আর ছুরিটা কে মেরেছে জানো?"
সাবিলা বেগম জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই রুদ্র তাচ্ছিল্য সুরে আরো শীতল গলায় বলল,,
"ছুরিটা মেরেছে, তোমার এই আদরের বড় মেয়ে!"
তার কথাটা শেষ হওয়া মাত্রই সাবিলা বেগম যেন কেঁপে উঠলেন! তার কাছে মনে হলো, যেন তার পায়ের নিচ থেকে জমিন'টা সরে গেছে! দাঁড়িয়ে থাকতেও বেশ কষ্ট হচ্ছে তার, আচ্ছা সে কি বসে পড়বে? এসব ভাবতে ভাবতেই কয়েক'পা পিছিয়ে সিঁড়ির রেলিং ঘেঁষে থেমে গেলেন তিনি। ধীর দৃষ্টি দিলেন হিয়ার দিকে।
তখনি রুদ্র আবার বলে উঠলো,,
"এখানেই শেষ না আম্মু! এর আরো কিছু অংশ বাকি আছে।"
এবারে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা, সাবিলা বেগমের মায়ের দিকে এগিয়ে গেলো রুদ্র। শীতল স্বরে বলল,,
"নানু..! তুমি আমাকে বলো না- রুদ্র আমাদের জন্য একটা ছোট্ট ভাই নিয়ে আয়। আমি সারাদিন তার সাথে খেলবো, তার যত্ন নিবো, এই বুড়া বয়সে তার সাথে দুষ্টামি করবো! 'আমি তাকে কিভাবে নিয়ে আসবো বলো নানু! আমি তাকে আনার আগেই তো, তোমাদের নাতবৌ তাকে খু*ন করেছে নানু!"
শেষ কথাটা বলার সময় রুদ্র'র গলা কেঁপে উঠলো। নানু,শুভ্র আর লারা অবাক হলেও সাবিলা বেগম এবারে আরো জোরে কেঁপে উঠলেন। অস্ফুটস্বরে স্বরে শুধু জিজ্ঞেস করলেন,,
"মানেহ..?"
রুদ্র আবার সাবিলা বেগমের দিকে এগিয়ে এলো। ঠান্ডা কন্ঠে উত্তর দিলো,,
"শুভ্র আর মোমোর সন্তান অভ্র, ও তোমার প্রথম নাতি নয় আম্মু। আমার আর হিয়ারও একটা বেবি ছিলো, আমরা তার নামও ঠিক করেছিলাম 'রুহি'! কিন্তু, সে দুনিয়াতে আসার আগেই তোমার বউমা তাকে পরপারে পাঠিয়ে দিয়েছে আম্মু!"
সাবিলা বেগমের হার্ট'টা যেন দুর্বল হয়ে আসছে। হৃৎস্পন্দন ক্রমশ ধীর হয়ে আসছে। চোখের সামনের সবকিছু বড্ড ঝাপসা লাগছে।
সিঁড়ির রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, একহাত মুখে কান্না আটকানোর চেষ্টা করতে থাকা রুদ্রর দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো লারা। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে কাঁপা গলায় বলল,,
"এ..এসব তুই কি বলছিস রুদ্র।"
তার কথার উত্তর না দিয়ে, রুদ্র ফিসফিস কন্ঠে আপনমনে বলে উঠলো,,
"আজ যদি সে বেঁচে থাকতো, তাহলে গুটি গুটি পায়ে হয়তো এই পুরা বাড়ি মাতিয়ে রাখতো!"
শুভ্র এগিয়ে এসে রুদ্রর কাঁধে হাত রেখে 'ভাইয়া' বলা মাত্রই রুদ্রর কি যেন হলো। সে দ্রুততার সাথে একহাতে চোখের পানি মুছতে মুছতে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো। আর মুহুর্তের মাঝেই সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো।
-
রুদ্র যাওয়া মাত্রই- সাবিলা বেগম ধীর পায়ে হিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। হিয়ার দৃষ্টিটা তখন নিচের দিকে। সাবিলা বেগম খুব আস্তে করে ডাকলেন,,
"হিয়া, মাথা তোল। তাকা আমার দিকে!"
সাবিলা বেগমের এই শান্ত স্বাভাবিক কথাগুলো কেন জানি হিয়ার কাছে খুব ভারী লাগলো। সে না চাইতেও তার গলা শুকিয়ে চোখ খিঁচে আসলো। অনুভব করলো, তার শরীর'টা বেশ কাঁপছে। কিন্তু, বুঝতে পারো না, তার শরীর'টা এতো কাঁপছে কেন?কই তার মন তো ভয় পাচ্ছে না, তাহলে শরীর এতো কাঁপছে কেন? তাহলে কি সে ভয় পাচ্ছে? কিন্তু কেন? এটা তো একদিন হওয়ারই ছিলো। আজ বা কাল সত্যিটা তো একদিন না একদিন সবার সামনে আসতেই হতো! তাহলে, এটা নিয়ে এতো ভয় পাওয়ার কি আছে? তাছাড়া, যে কাজ করতে তার ভয় লাগেনি সেই কাজের কথা লোকে জানলে কেন তার ভয় লাগবে?? নাহ, এটা ঠিক হচ্ছে না। তার এভাবে ভয় পাওয়াটা ঠিক মানাচ্ছে না।'
"কিরে তাকা আমার দিকে!"
একটা শুষ্ক ঢোক গিলে হিয়া মাথা তুলে তাকালো সাবিলা বেগমের দিকে। তবে চোখে চোখ পড়তেই, আবার সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নিলো সে।
"রুদ্র যা-কিছু বলল, তা সব কিছু সত্য?"
সাবিলা বেগমের এমন প্রশ্নে হিয়া আবারো চোখ বন্ধ করে নিলো। কেন জানি, সে নিজেকে শক্ত রাখতে চাইলেও, শক্ত থাকতে পারছে না। তার শরীর যেন দুর্বল হয়ে আসছে, নিশ্বাস ভারী হয়ে আসছে যেন কোনো কথাই বের হতে চাইছে না।
হিয়ার থেকে এবারেও কোনোরকম উত্তর না পেয়ে, সাবিলা বেগম পুনরায় শীতল ভাঙা গলায় প্রশ্ন করলেন,
"রুদ্রর পেটে ওই ক্ষতচিহ্ন, ওই ছুরির দাগ! ওটা কি তোর দেওয়া??"
হিয়া কিছুটা সময় নিয়ে সাহস করে ভাবে উত্তর দিলো, "হ্যাঁ।"
সাবিলা বেগমের ভ্রু কিঞ্চিৎ উচু হলো। নিজের অবস্থান থেকে কিছুটা নড়ে উঠলেন তিনি। অতপর, নিজেকে সামলে পুনরায় প্রশ্ন করলেন,,
"তোর গর্ভে রুদ্রর সন্তান ছিলো? এটাও কি সত্যি?"
হিয়া এবারে কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলতে চাইলো,
"হ্যাঁ, ছিলো। এমনটা আ...."
এবারে হিয়ার পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই সাবিলা বেগম কষিয়ে একটা থাপ্পড় দিলো হিয়ার ডান গালে। মূহুর্তেই হিয়ার দু'চোখ নোনাপানিতে ভরে উঠলো। গালে হাত দিয়ে তিনি সাবিলা বেগমের দিকে তাকাতেই, সাবিলা বেগম তেড়ে উঠে হুংকার দিলেন,,
"বেরিয়ে যা। এক্ষুনি এই মূহুর্তে আমার বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যা!"
হিয়ার গাল বেয়ে এবারে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়লো। সে একবার ডাকতে চাইলো, "আম্মু...." বলে। তবে সাবিলা বেগম তাকে থামিয়ে দিয়ে গর্জে বললেন,,
"শুভ্র ওই মেয়েকে বারণ করো। সে যেন আমাকে 'মা' বলে ডেকে আমার ওপরে আমার ঘৃণা টাকে আর বাড়িয়ে না দেয়।"
একটু থেমে যোগ করলেন, "ছিহঃ এটা ভাবতেই আমার নিজের ওপরে ঘৃণা হচ্ছে, যে মেয়েটা আমার ছেলেকে হ*ত্যার চেষ্টা করলো, তার অংশকে কেড়ে নিয়ে, তাকে সর্বশান্ত দিলো। আর আমি কিনা বো'কার মতো এতোদিন সে-ই মেয়েকে মেয়ে সমতুল্য স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখলাম? আমার ছেলের মুখের দিকে তাকিয়েও আমি তার ভেতরের কষ্ট গুলো বুঝতে পারলাম না? উল্টো এই মেয়েটার সাপোর্ট নিলাম? ছিহঃ!!"
এতোটুকু বলেই মাথায় হাত দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন সাবিলা বেগম। তার মাথায় খুব বেশি যন্ত্রণা হচ্ছে। এই তীব্র তিনি আর নিতে পারছেন না। তার চিৎকারে হিয়া তার দিকে এগোতে গেলেই তিনি পূর্বের ন্যায় উচ্চ কন্ঠে বললেন,,
"শুভ্র এই মেয়েকে বেরিয়ে যেতে বলো আমার বাড়ি থেকে। এক্ষুনি বেরিয়ে যেতে বলো। তাকে যতো দেখছি, আমার নিজের ওপর ঘৃণা ততো বাড়ছে। সে এখানে থাকলে, আমি অসুস্থ হয়ে যাবো। তাকে চলে যেতে বলো এখান থেকে। তার মতো একটা জা*লিম মেয়ের মুখ আমি দেখতে চাই না!"
সাবিলা বেগমের অনবরত বলতে থাকা কঠিন কথাগুলো হিয়ার শরীরে যেন কাঁটার মতো বিঁধলো। তবে এই কাঁটাগুলোকে হজম করা ছাড়া, তার আর কোনো উপায় রইলো না।
মায়ের কথায় বাধ্য হয়ে শুভ্র ডাকলো একবার "ভাবি..!" বলে। তবে এই ডাকের মধ্যে কোনো মমতা বা ভালোবাসা ছিলো না। ছিলো এক চাপা সর্তকর্তা! যেটা বুঝতে হিয়ার একটুও দেরী হলো না।
সবশেষে, শুভ্রর উদ্দেশ্য একটা মলিন শুষ্ক হাসি রেখে হিয়া পা বাড়ালো চৌঁকাঠের দিকে। আজকের পর থেকে হয়তো, এই বাড়ির দরজা চিরদিনের মতো তার জন্য বন্ধ হতে চলল! আর সে এটাকেই ভবিতব্য ভেবে সামনের দিকে এগোলো।
:-
হিয়া প্রতিটা কদম ফেলছিলো। আর এই বাড়িতে কাটানো তার সুন্দর স্মৃতি গুলো স্মরণ করছিলো। এই বাড়ির প্রতিটা কোণায় তার স্পর্শ আছে, তার হাসির আওয়াজ আছে, আছে হাজারটা দুষ্টামির সুপ্ত ছায়া। যে সাবিলা বেগম আজ তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছে, সেই সাবিলা বেগমের সাথেই তো তার এই বাড়িতে বেশি স্মৃতি। তার সেই স্নেহ মাখা ডাক, মমতাময়ী স্পর্শ। ভালোবাসাময় শাসন, আর কিছু দুষ্টু-মিষ্টি খুনসুটি। এ-সব কিছুই যেন আজ থেকে হিয়ার জন্য অতীত হলো। শুধু অতীত নয় 'নিষিদ্ধ অতীত!'
-
১৯দিন পর.....
অর্ধ-অনাবৃত শরীরে কোমরে তোয়ালে জড়িয়ে পুরো আলমারি উলটপালট করে ফেলছে রুদ্র। কিন্তু, কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না তার অফিসের ফর্মাল ড্রেস গুলো। বিরক্তিতে তার চোখ-মুখ কুঁচকে এলেও, মাথায় আসছে না- তার শার্ট-কোর্ট গুলো কোন বৃন্দাবনে ঘুরতে গেছে। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে, কোমরে হাত বেঁধে হাঁক ছাড়লো সে,
"হিয়া আমার অফিস ড্রেসগুলো কোথায় রেখেছো? আমি সেগুলো খুঁজে পাচ্ছি না কেন? হিয়াাাা.."
কিছুক্ষণ ডাকাডাকির পরে একহাতে কুরকুরে চিপস আর অন্যহাতে আইসক্রিম নিয়ে রুমে প্রবেশ করলো হিয়া। কিন্তু, রুমে পা দিতেই যেন তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো।
পুরো রুমের ফ্লোর জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আলমারির সব কাপড়। যার সবগুলোই হিয়ার কাপড়। নিজের শখের ড্রেসগুলোর এমন অবস্থা দেখে হিয়া কাঁদো কাঁদো হয়ে রুদ্রকে প্রশ্ন করলো,
"এসব তুমি কি করেছো রুদ্র? তোমার কোনো আইডিয়া আছে এই ড্রেসগুলোর প্রাইজ কেমন?"
রুদ্র যেন তার কথায় পাত্তা দিলো না। বিরক্ত গলায় পাল্টা প্রশ্ন করলো,,
"আমার শার্ট-কোর্ট, টাই-প্যান্ট এগুলো কোথায়?"
রুদ্রর পাল্টা প্রশ্নেই যেন হিয়া তার উত্তর পেয়ে গেলো। চোখ-মুখ টেনে এমন একটা ভাব করলো, যেন সে কোনো মহাসুযোগ পেয়েছে। আরাম করে বেডের ওপরে বসতে বসতে বলল,,
"আগে আমার ড্রেসগুলো তুলে আলমারিতে সাজাও, তারপর তোমার ড্রেসের সন্ধান দিবো।"
"হিয়া আমার অফিসে দেরী হচ্ছে।"
"তো আমি কি করবো?"
"তুমি কি আমার সাথে ফাইজলামি করছো?"
"কেন? তোমার সাথে কি আমার ফাইজলামির সম্পর্ক??"
"আমার দেরী হচ্ছে হিয়া, অলরেডি ৮:১৫বাজে!"
"তো অর্ধঅনাবৃত অবস্থায় চলে যাও অফিসে!"
হিয়ার করা এমন ফাজলামিতে রুদ্রর বিরক্ত'টা হয়তো একটু বেড়েই গেলো। সে দাঁত চেপে বলল,,
"আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না হিয়া। ড্রেসগুলো কোথায় রেখেছো তাড়াতাড়ি বলে দাও।"
"আগে আমার ড্রেসগুলো আলমারিতে সাজাও। নয়তো, সারাদিন নেং*টু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও প্যান্টের সন্ধান পাবে না। হুহ..!"
হিয়ার কথা না শোনা পর্যন্ত হিয়া যে তার কাপড়ের সন্ধান দিবে না, এটা রুদ্র বেশ ভালোভাবেই বুঝে গেলো। অগত্যা কোনো উপায় না পেয়ে, সে রাগে গিজগিজ করতে করতে সব কাপড় পুনরায় আলমারিতে তুলে দিলো। এরপরে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে আবার জিজ্ঞেস করলো,,
"এবার বলো, আমার কাপড়গুলো কোথায় রেখেছো?"
হিয়া মুখে থাকা চিপস চিবোতে চিবোতে হাত দিয়ে ইশারা করে বলল,, "বেডের নিচ থেকে ল্যাগেজ'টা বের করো!"
"কিহ?"
"আরে ওভাবে তাকিয়ে থেকো না। অলরেডি ৮:২০ বেজে গেছে দেখো।"
রুদ্র একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে, নিচু হয়ে ঝুঁকে গেলো ল্যাগেজটা বের করতে। ল্যাগেজটা উঁচু হয়ে বেডের ওপরে রাখতেই হিয়া বলল,,
"এবার এটা খোলো!"
রুদ্র চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই হিয়া ভেংচি কেটে বলল,, "আরে খোলো, খোলো। দেখো ওর ভেতরেই তোমার কাপড় আছে!"
কথাটা শোনা মাত্রই রুদ্র তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলো। "ওয়াট??" বলেই লাফ দিয়ে উঠলো। প্রতিউত্তরে হিয়া শান্ত ভঙ্গিতে ব্যঙ্গ হেঁসে উপরনিচ মাথা নাড়ালো।
"তুমি আমার কাপড়গুলো এই ল্যাগেজের ভেতরে কেন রেখেছো? আমি কি তোমার বাড়ির কাজের লোক??"
"তো আই আর কিতা কইরতাম স্বামী'জান, আন্নে যেই একখান চকলেটের ঘরের মতো আলমারি কিনছেন- সেটাতে আমার কাপড়ই রাখার জায়গা হয় না। তাহলে,তোমার কাপড় কই রাখবো??"
রুদ্র চোখ-মুখ কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে বলল,, "তাই বলে তুমি আমার কাপড় এটার ভেতের রাখবে? তুমি আর কতো ভাবে আমাকে জ্বালাবে বলোতো?"
"ঠিক যতো ভাবে তুমি জ্বলতে চাইবে!"
"ফালতু মেয়ে একটা! হাড়মাস জ্বালিয়ে খেলো আমার!"
হিয়া যেন কিছু বলতে গিয়েও বলল না। আস্তে করে আইসক্রিমের কৌটাটা বেডের ওপরে রেখে, ল্যাগেজের দিকে ঝুঁকে থাকা রুদ্রর বুকের কাছ গিয়ে গুঁড়ি কেটে উঠে, তার গলা জড়িয়ে ধরলো। রুদ্র যেন তার এমন কাজে থতমত খেয়ে গেলো। ভ্রু উচিতে জিজ্ঞেস করলো,,
"কি করছো তুমি?"
"তোমাকে জ্বালাতে আসছি!"
"কিন্তু, আমি জ্বলতে চাচ্ছি না!"
"কিন্তু, আমি জ্বালাতে চাইছি!"
"আমার অফিসে লেট হচ্ছে!"
"আমার রোমাঞ্চে তীব্র তাড়া দিচ্ছে!"
রুদ্র ভ্রু কুঁচকে হিয়ার মুখের দিকে তাকাতেই, হিয়া রুদ্রর কাঁধে স্লাইড করতে করতে বলল,,
"প্রমিস! একটা চু*মু দিলেই তোমার রাস্তা থেকে সরে যাবো।"
রুদ্র কিছু না বলে আরেকটু ঝুঁকে পড়লো তার দিকে। হিয়া আবার বলল,,
"সত্যি বলছি। পিংকি প্রমিস! জাস্ট ওয়ান কিস, ঔর ম্যায় হাট যাওঙ্গি তেরে রাসতে সে!"
"তোমার মতলব ভালো ঠেকছে না। তুমি ঠিক কি চাইছো বলোতো??"
হিয়া কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল, "একটা চু*মুই তো চাইছি! তাই এভাবে বলছো? তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো না নাকি অফিসে যেতে চাও না??"
"ওকে! ক্লোজ ইউর আইজ!"
হিয়া 'ওকেহ!' বলে চোখ বন্ধ করতেই, রুদ্র তার ঠোঁটের দিকে এগিয়ে গেলো। কিন্তু, যখনই সে তার ঠোঁট স্পর্শ করবে! ঠিক তখনই হিয়া দক্ষ হাতে, রুদ্রর তোয়ালে'টা খুলে নিয়ে উল্টো দিকে দৌড় দিতে দিতল বলল,,
"আমাকে ফালতু বলার শাস্তি। দেখলে তো আমি কতোটা ফালতু হতে পারি!"
পরিস্থিতি বুঝে আসতেই রুদ্র হাত দিয়ে নিজের ইজ্জত বাঁচানোর চেষ্টা করে। চিৎকার করে উঠলো,, "হিয়াহ......!"
-
শোয়া থেকে হঠাৎ ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো রুদ্র। খুব জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো সে। অনুভব করলো, তার বুকটা এখনো ধকধক করছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। কিছুটা সময় নিয়ে সে আপনমনে বিড়বিড় করলো,,
"তার মানল এটা স্বপ্ন ছিলো? সত্যি না?"
ঠিক এমন সময় টি-টেবিলের ওপরে রাখা রুদ্রর ফোনটা ভাইব্রেট হতে লাগলো। নিজেকে স্বাভাবিক করে রুদ্র ফোন হাতে নিতেই দেখলো- লারার ৯মিসড কল সামনে ভেসে উঠেছে। সে লারাকে কল ব্যাক করতে নিলো। তবে হুট করে কিছু মাথায় আসায় কলটা কেটে দিয়ে ওয়াশরুমের উদ্দেশ্য উঠে পড়লো।
-
নিজের কেবিনে বসে কিছু ফাইল ঘাটাঘাটি করছিলো রুদ্র। ঠিক সেই সময়ে লারা নক করে তার কেবিনে ঢুকলো। সামনের চেয়ারে বসতে বসতে রুদ্রকে প্রশ্ন করলো,,
"সকালে কতোগুলো কল করলাম তোকে! কলটা ধরলি না কেন?"
"ঘুমে ছিলাম!"
কিছু সময় নিরবতা। তারপর আবার লারা জিজ্ঞেস করলো,, "তোর বাসার সবাই কেমন আছে?"
"ভালো!"
"স্পেশালি আন্টি!"
"স্পেশালি আন্টির খবর আমি জানি না।"
"কেন? কথা হয়নি আজ?"
"হয়েছিলো মেইবি দু-তিন দিন আগে!"
লারা অবাক হয়ে কথাটা রিপিট করলো, 'দু-তিন আগে?' তবে রুদ্র কোনো রেসপন্স না করায় সে এই টপিকটা বাদ দিলো।
-
কিছু সময় ধরে লারাকে বেশ ইতস্ততবোধ করতে দেখে, রুদ্র নিজেই ফাইল ঘাটতে ঘাটতে তার উদ্দেশ্য বলল,,
"এতো নড়াচড়া করছিস কেন? কিছু বলবি?"
লারা রোবটের মতো উপর-নীচ মাথা নেড়ে বলল 'হুম'।
রুদ্র আর কিছু না বলায়, কিছুসময় পর লারা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো,, "উমম, বলছিলাম যে...
'হিয়ার কোনো খোঁজ পেয়েছিস?"
ব্যাস, লারার এই কথাটা কানে যেতেই রুদ্র ধুপ করে হাতে থাকাটা ফাইলটা বন্ধ করে দিলো। বেচারী লারা কিছুটা কেঁপে উঠলো। রুদ্র কঠিন স্বরে জবাব দিলো,
"নাহ..!"
#চলবে~